১৬৯ সিকিউরিটিজের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:২৬ এএম

বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতিতে সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ-জ্বালানির স্বল্পতায় উৎপাদনমুখী শিল্পে বিরূপ প্রভাব পড়ে। এতে করে কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাওয়ার শঙ্কায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। এতে করে গত ২৮ জুলাই ফ্লোর প্রাইস আরোপের পর আগস্ট থেকে যে চাঙ্গাভাব শুরু হয়েছিল তা ক্রমেই মিইয়ে যেতে শুরু করে। বিনিয়োগকারীরা সাইড লাইনে ফিরে যাওয়ায় ধারাবাহিক পতনে অধিকাংশ শেয়ার ফের ফ্লোর প্রাইসে ফিরে যায়। লেনদেনও কমে ৩০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে। অর্থনীতিতে মন্দার শঙ্কা পুঁজিবাজারে অচলাবস্থা তৈরি করলেও লেনদেন কমে যাওয়ার নেপথ্যে ফ্লোর প্রাইসকে দায়ী করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

এমন পরিস্থিতিতে প্রায় পাঁচ মাস পর প্রাথমিকভাবে তালিকাভুক্ত ৩৯০ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১৬৯টির ফ্লোর প্রাইস তুলে নিয়েছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। গতকাল বুধবার বিকেলে এক আদেশে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে এসইসি। আদেশটি আজ বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হবে।

তবে সিকিউরিটিজগুলোর ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হলেও এগুলোর ক্ষেত্রে প্রচলিত সার্কিট ব্রেকারের নিয়ম কার্যকর হবে না। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এসব শেয়ারে নিচের সার্কিট ব্রেকার হবে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ। অর্থাৎ ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া ১৬৯ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড আগের দিনের ক্লোজিং প্রাইসের তুলনায় সর্বোচ্চ ১ শতাংশ কমে কেনাবেচা করা যাবে। এর ফলে যেগুলোর শেয়ারদর ১০ টাকার নিচে, সেগুলোর দাম আসলে কমতে পারবে না। তবে দরবৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সার্কিট ব্রেকারের হার কার্যকর হবে। অর্থাৎ শেয়ারের দর অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বেশিতে কেনাবেচা করা যাবে।

অব্যাহত দরপতনের প্রেক্ষাপটে গত ২৮ জুলাই সব শেয়ারের দরে দ্বিতীয় দফায় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি, যা কার্যকর হয় গত ৩১ জুলাই। ফ্লোর প্রাইস আরোপের পর সব শেয়ারের দরপতন বন্ধ হওয়ায় আগস্ট থেকে ফের চাঙ্গাভাব দেখা দেয় বাজারে। তবে ডলার সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির জেরে গত অক্টোবর থেকে আবারও মন্দাভাব দেখা দেয়। নিয়মিত সূচক পতনের পাশাপাশি লেনদেন ২ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ৩০০ কোটির ঘরে নেমে আসে। লেনদেন বাড়াতে এর আগে ব্লক মার্কেটে ফ্লোর প্রাইসের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ দেওয়া হলেও তা কোনো প্রভাব ফেলেনি।

ব্যাপক দরপতনের মুখে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো সব শেয়ারের দরে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছিল এসইসি। সে সময় ফ্লোর প্রাইস পুঁজিবাজারে প্রাণ ফেরাতে পারলেও এবারের চিত্রটি ভিন্ন। অল্প কিছু কোম্পানির শেয়ারদরে লাফ দিলেও তিন শরও বেশি কোম্পানির শেয়ারদর ফ্লোরে পড়ে ছিল। এক পর্যায়ে লেনদেন নেমে আসে করোনাকালের সমান।

প্রথমবার আরোপ করা ফ্লোর প্রাইস গত বছরের ১১ এপ্রিল ৬৬ শেয়ারের ওপর থেকে তুলে নেয় এসইসি। অবশ্য তখনো ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া শেয়ারের দরে নিচের সার্কিট ব্রেকার সর্বোচ্চ ২ শতাংশ বেঁধে দিয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় দফায় ৩ জুন ৩০টি এবং ১৭ জুন বাকি সব শেয়ারের দরের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়েছিল।

গতকাল যেসব শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়েছে, এর প্রায় সবই দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ার এবং বাজার মূল্য সূচকে এসব শেয়ারের প্রভাব খুবই কম। এসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম জানিয়েছেন, কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন সবচেয়ে কম, এমন কোম্পানি তারা বেছে নিয়েছেন। তাদের সম্মিলিত বাজার মূলধন পুঁজিবাজারের বাজার মূলধনের ৫ শতাংশের মতো।

দ্বিতীয় দফা ফ্লোর প্রাইস আরোপের প্রায় পাঁচ মাস পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি যেসব কোম্পানির শেয়ারের সর্বনিম্ন দর উঠিয়ে দিয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বীমা খাতের কোম্পানি। গতকালের নির্দেশনার ফলে তালিকাভুক্ত ৫৬ বীমা কোম্পানির মধ্যে ৩৭টির ফ্লোর প্রাইস উঠে গেছে। এরমধ্যে ৩১টি সাধারণ বীমা কোম্পানি। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মিউচুয়াল ফান্ড। মোট ৩৭টি ফান্ডের মধ্যে ৩৬টিরই ফ্লোর প্রাইস উঠে গেছে।

বস্ত্র খাতে তালিকাভুক্ত ৫৮টি কোম্পানির মধ্যে ফ্লোর প্রাইস উঠে গেছে ২৬টির। প্রকৌশল খাতের ৪২টি কোম্পানির মধ্যে ফ্লোর প্রাইস উঠে গেছে ১৬টির। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের ২১ কোম্পানির মধ্যে ফ্লোর প্রাইস উঠে গেছে ১০টির। আর্থিক খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা মোট ২৩টি। এর মধ্যে ফ্লোর প্রাইস উঠে গেছে ১০টির।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তালিকাভুক্ত ২৩ কোম্পানির মধ্যে ফ্লোর প্রাইস থাকছে না দুটির। বিবিধ খাতে ১৪ কোম্পানির মধ্যে ফ্লোর প্রাইস উঠেছে ৯টির। ওষুধ ও রসায়ন খাতে ৩৪ কোম্পানির মধ্যে ফ্লোর উঠে গেল পাঁচটির। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তালিকাভুক্ত ১১ কোম্পানির মধ্যে ফ্লোর প্রাইস থাকছে না চারটির। পাট খাতে তালিকাভুক্ত ৩ কোম্পানির কোনোটিরই ফ্লোর প্রাইস থাকছে না। এছাড়া চামড়া খাতে ৬ কোম্পানির মধ্যে ৩টি, কাগজ ও প্রকাশনা খাতের ৬ কোম্পানির মধ্যে ৩টি এবং সিমেন্ট খাতের ৭ কোম্পানির মধ্যে ২টির ফ্লোর থাকছে না। এছাড়া সেবা ও আবাসন, ভ্রমণ ও অবকাশ এবং সিরামিক খাতের একটি করে কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস উঠে গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত