রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আজ মঙ্গলবার। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ২২৯টি কেন্দ্রে চলবে টানা ভোটগ্রহণ। এদিন ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৭০ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোটাররা ৯ জন মেয়রপ্রার্থীর মধ্য থেকে নির্বাচিত করবেন আগামীর নগরপ্রধান। এবার নির্বাচনে ৩৩টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে লড়ছেন ১৮৩ প্রার্থী আর ১১টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদের বিপরীতে লড়ছেন ৬৮ জন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবার সব কেন্দ্রে ইলেক্ট্রনিক্স ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ২২৯টি কেন্দ্রে ২২৯ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ১৩৪৯ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও ২৬৯৮ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচন কমিশন বলছে, ২২৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ৮৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকি বিবেচনায় গতকাল দুপুর ১২টার পর পুলিশ লাইনস স্কুল মাঠ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে ইভিএমসহ নির্বাচনী আনুষঙ্গিক মালামাল। ভোটকেন্দ্রে ও কক্ষে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নেওয়া হয়েছে ছয় স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
তবে এরপরও যদি অপ্রত্যাশিত কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তবে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ দপ্তরে তিনি এসব কথা বলেন। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৮৬টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে এসব কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হবে। এসব কেন্দ্রে গাইবান্ধার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আমরা সিসিটিভির মাধ্যমে এই কেন্দ্রগুলোকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করব। গাইবান্ধার মতো কোনো সমস্যা দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমরা গাইবান্ধা নির্বাচনে অনিয়মের ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। রংপুরেও নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।
রাশেদা সুলতানা জানান, রংপুর সিটির ভোটে ৪৯ জন নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম নিয়োগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে নির্বাহী হাকিম ৩৩ জন ও বিচারিক হাকিম রয়েছেন ১৬ জন। তারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও সংক্ষিপ্ত বিচারকাজ করবেন। আর র্যাব, বিজিবির একাধিক টিম রয়েছে ভ্রাম্যমাণ ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে।
এদিকে গতকাল দুপুরে বিভিন্ন কেন্দ্রে সরঞ্জামাদি পাঠানোর সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক আব্দুল বাতেন, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার, উপ-পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার, সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় পুলিশ কমিশনার বলেন, এ নির্বাচনী এলাকায় পুলিশের দৃষ্টিতে সব কেন্দ্রই গুরুত্বপূর্ণ, তারপরও কিছু কেন্দ্র আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়। সেই চিহ্নিত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো নিয়ে কয়েকদিন থেকে কাজ করা হয়েছে এবং আলাদাভাবে মনিটরিং করা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা তৎপর রয়েছি। আশা করি রসিক নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে আমরা উপহার দিতে পারব।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র :
২২৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ৮৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কোতোয়ালি থানায় ৩৭টি, তাজহাট থানায় ৮টি, মাহিগঞ্জ থানায় ৯টি, হারাগাছ থানায় ৯টি, পরশুরাম থানায় ১৩টি ও হাজিরহাট থানা এলাকায় রয়েছে ১০টি।
কারা লড়ছেন :
মেয়র পদে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী লতিফুর রহমান মিলন হাতি প্রতীক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আমিরুজ্জামান পিয়ল হাতপাখা, বাংলাদেশ কংগ্রেসের আবু রায়হান ডাব প্রতীক, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী তৌহিদুর রহমান ম-ল রাজু দেয়াল ঘড়ি, জাসদের প্রার্থী শফিয়ার রহমান মশাল প্রতীক, জাকের পার্টির খোরশেদ আলম খোকন গোলাপ ফুল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মেহেদী হাসান বনি হরিণ প্রতীক নিয়ে ভোটে লড়ছেন।
২০১২ সালের ২৮ জুন পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ডের সঙ্গে বর্ধিত এলাকার (সাবেক সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়সহ) আরও ১৮টি ওয়ার্ডযুক্ত করে মোট ৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত হয় রংপুর সিটি করপোরেশন। এরপর ওই বছরের ২০ ডিসেম্বর নির্বাচনে প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু। দ্বিতীয় নির্বাচন ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। এতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা মেয়র নির্বাচিত হন।
ভুয়া প্রিসাইডিং অফিসার আটক :
গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে নগরীর ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের এক কাউন্সিলর প্রার্থীকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে জিতিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া এক ব্যক্তিকে আটক করেছেন স্থানীয়রা। লালটু ইসলাম রানা (৪০) নামের ওই ব্যক্তি নিজেকে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে পরিচয় দেন। বলেন, ১০ লাখ টাকা দিলে কাউন্সিলর প্রার্থীকে ২ হাজার ভোটে জিতিয়ে দেবেন। তবে স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তারা মাহিগঞ্জ থানায় খবর দেন। মাহিগঞ্জ থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রিসাইডিং অফিসার পরিচয়দানকারী লালটু ইসলাম রানাকে আটক করি। এ-সময় তার সঙ্গে থাকা ভুয়া পরিচয়পত্র, নির্বাচন কমিশনের সিল এবং অন্যান্য কিছু ভুয়া কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। তার বাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ধুপাউলা গ্রামে।
