শুধু বাংলাদেশ নয়, ২০২২ সাল ছিল পুরো বিশে্বর জন্যই অনিশ্চয়তার বছর। করোনার প্রভাব কাটিয়ে বিশ্বের দেশগুলো যখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ফিরে আসছিল, ঠিক তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সব হিসাব-নিকাশ ওলট-পালট করে দিয়েছে। সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের দরবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ, খাদ্যনিরাপত্তা, বৈশি্বক উঞ্চতাসহ নানাবিধ সমস্যায় গত ৫০ বছরে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে বিশ্ব। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দুশ্চিন্তাও ভর করছে বাংলাদেশ নিয়ে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিশে^র বিভিন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ২০২২ সালে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির উচ্চ মূল্য, সুদহার বৃদ্ধি ও মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ার বিষয়সহ নানা সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তাদের পূর্বাভাসকে সত্যে পরিণত করেছে। তবে এ ধরনের সংকটের কারণে বাংলাদেশ ও এর জনগণকে উচ্চ মূল্য দিতে হচ্ছে। আমদানিজনিত উচ্চ ব্যয়ের কারণে বিদেশি মুদ্রার সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠেছে জনগণের। আর সরকার বিদেশি মুদ্রার সংকট সামাল দিতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কঠিন শর্তের পরও ঋণের জোগান নিয়ে চিন্তিত।
সার, খাদ্য, জ্বালানির উচ্চমূল্য ছাড়াও ২০২২ সাল ছিল দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জের বছর; বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে একের পর এক সংকট দেশের অর্থনীতিকে বেশ ভুগিয়েছে। ডলার ও রিজার্ভ সংকটের পাশাপাশি আইএমএফের চাপ, ঋণ কেলেঙ্কারি, ব্যাংক থেকে আমানত তোলার হিড়িকসহ পুরো বছরই আলোচনায় ছিল এ খাত।
চলতি বছর তৈরি হওয়া সংকটগুলো সুষ্ঠুভাবে সমাধান করা না গেলে নতুন বছরে বড় ধরনের চাপে পড়বে দেশের অর্থনীতি। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার ও ব্যবসায়ীদের সময়োপযোগী কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
ডলার সংকট : চলতি বছর ব্যাংক খাতকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে ডলার সংকট। সংকটকে কেন্দ্র করে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ডলার বাণিজ্য পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে। রিজার্ভ নেমে আসে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে। আর আইএমএফের হিসাবে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দাঁড়ায় ২৬ বিলিয়নে। তবে রেমিট্যান্স-প্রবাহে কিছুটা ধারাবাহিকতা থাকা এবং আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করায় রিজার্ভ এখন কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। যদিও ডলার সংকট রয়েই গেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি থাকায় এক বছরের ব্যবধানে ডলারের মূল্য ৮৫ টাকা থেকে ১০৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এতে করে আমদানি ব্যয় বাড়ায় জ্বালানিসহ সব পণ্যের দাম ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। যদিও বিশে^ পণ্যমূল্য কমতে শুরু করেছে। কিন্তু ডলারের দাম বাড়ায় এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
আলোচনায় আইএমএফের ঋণ : দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ নিরাপদ রাখতে আইএমএফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার আবেদন জানায় বাংলাদেশ। এর মধ্যে আইএমএফের কাছে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। কারণ এই ঋণকে কেন্দ্র করে আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনা ও আইএমএফের শর্তের কারণে নানামুখী সংস্কার জনগণের ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে শঙ্কা তৈরি হয়। আইএমএফ সাত কিস্তিতে ঋণদানে প্রাথমিক সম্মতি দিলেও তা আসলে কতটা কাজে লাগবে, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।
আমদানি বৃদ্ধি ও রপ্তানি হ্রাস: রিজার্ভ ধরে রাখতে ব্যয় সংকোচন নীতি অবলম্বন করে সরকার। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বন্ধ করা হয় উন্নয়ন প্রকল্প। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, গাড়ি ক্রয়ে বিধিনিষেধসহ করপোরেট প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের ব্যয় সংকোচনের নির্দেশনা দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে। তবে আমদানি পণ্যে আরোপিত বিধিনিষেধ সাময়িক স্বস্তির কারণ হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিশাল জটিলতা দেখা দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হয় আমদানিনির্ভর ক্ষুদ্রশিল্প ও অনলাইন উদ্যোক্তারা। এলসি সংকট ও বেঁধে দেওয়া মার্জিনের কারণে সময়মতো পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে পথে বসেছেন। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টার মধ্যেই নাজেহাল দশা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের। বিনিময় মূল্যের বড় ব্যবধানের কারণে লোকসানে পড়েছে অনেক বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি
যদি বলা হয়, ২০২২ সালে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং তার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে এতে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এতে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব সংকট।
২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে সারা বিশে^ই কভিডজনিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়। তখন থেকেই বাজারে চাহিদা বাড়তে শুরু করে। জ্বালানির দামও বাড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ৮০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। সে সময় বাংলাদেশ সরকারও ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা নির্ধারণ করে। এর আগে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বাজারে গড়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ৪২ ডলার।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২৭ ডলারে ওঠে। এরপর তেলের দাম ১১০ থেকে ১১৫ ডলারের মধ্যে ছিল। চলতি বছরের আগস্টে জ্বালানির দর সর্বোচ্চ ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়, যদিও এরপর বিশ্ববাজারে দাম কিছুটা কমলে দেশের বাজারে ডিজেলের দাম লিটারে ৫ টাকা কমানো হয়। তবে কয়েক মাস ধরে জ্বালানির দর ধারাবাহিকভাবে কমলেও দেশের বাজারে তা সমন্বয় করা হয়নি। যদিও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা সে সময় জানিয়েছিলেন, বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশেও কমানো হবে।
মূল্যস্ফীতি : গত ৫ আগস্ট তেলের দাম বাড়ানোর পর দেশের মূল্যস্ফীতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আগস্টেই মূল্যস্ফীতি এক যুগের রেকর্ড ভেঙে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে। যদিও আগের মাস জুলাইয়ে তা ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এমনকি খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যায়। অবশ্য পরের মাস সেপ্টেম্বর থেকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১০ শতাংশে। একইভাবে অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৯১ শতাংশে। সর্বশেষ নভেম্বরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশে।ভভ
পুঁজিবাজারে অচলাবস্থা : দেশের অর্থনীতির সংকট পুঁজিবাজারে ভালোভাবেই পড়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির আয় কমে যাওয়া ও আগামীতে অর্থনীতির আরও বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়ার শঙ্কায় পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা সাইড লাইনে ফিরে গেছেন। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদেশিরা আগেই বাজার ছেড়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরও নিষ্ক্রিয়। এমন পরিস্থিতিতে অব্যাহত দরপতনে লেনদেন নেমে গেছে ২০০ কোটি টাকার ঘরে। তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের কোনো কেনাবেচা হচ্ছে না। ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের বড় অংশের পুঁজি আটকে গেছে। টানা পতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক নেমে গেছে ৬২০০ পয়েন্টের নিচে। সার্বিক পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন : বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে। কভিড-পরবর্তী হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাঘাত ছাড়াও জাহাজ ভাড়া ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। চাল, আটা, সয়াবিন তেল, শিশুখাদ্যসহ প্রায় সব পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এক বছরে চালের দাম ৪০-৫০ শতাংশ, সয়াবিন তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ, আটার দাম প্রতি কেজি ৩৫ থেকে ৮৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় যাতায়াত ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। খাবারের পেছনেই এখন আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে। ব্যয় সামলাতে অনেকেই পাত থেকে আমিষ কমিয়ে দিয়েছেন।
ঋণখেলাপিদের আরও সুবিধা : দায়িত্ব পেয়ে মাত্র ৫ দিনের মাথায় নিয়মিত ঋণকে খেলাপি করার প্রচলিত নীতিমালায় আরও বড় ছাড় দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর। নতুন এ সিদ্ধান্তের ফলে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে এখন আড়াই থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ অর্থ জমা দিলেই চলবে। আগে যা ছিল ১০ থেকে ৩০ শতাংশ। এসব ঋণ পরিশোধ করা যাবে ৫ থেকে ৮ বছরে। আগে এ ধরনের ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ দুই বছর সময় দেওয়া হতো। আবার নতুন করে ঋণও নিতে পারবেন ওই খেলাপি গ্রাহক। এমন সুবিধা দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এযাবৎকালে এটিই সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের অঙ্ক।
ব্যয় বৃদ্ধির চাপে কমছে আমানত : ব্যাংকে টাকা রাখলে ফেরত পাওয়া যাবে না এমন গুজবে আমানত তুলে নেন অনেক গ্রাহক। আবার কয়েকটি ব্যাংকে ঋণ অনিয়মের কারণে আস্থার সংকট তৈরি হলেও আমানত কমতে শুরু করে। তবে সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় অনেকেই সঞ্চয়ের টাকা ভেঙে ফেলছেন। এটিও আমানত কমে যাওয়ার একটি কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। গত অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে আমানত কমেছে ১৮ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। আমানত কমলেও ঋণ প্রবাহ বাড়ছে। এতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট বাড়ছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ : অর্থনীতির নানা সূচক অবনমিত হলেও রেমিট্যান্স এখনো স্বস্তির জায়গায় রয়েছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১ হাজার ৭ কোটি ৭৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। টানা দুই মাস বড় পতনের পর গত নভেম্বরে এই সূচক ইতিবাচক ধারায় ফেরে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেও সেই ধারা অব্যাহত আছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় বাড়াতে হুন্ডি বন্ধসহ নানা পদক্ষেপের পর চলতি মাসের প্রথম ২৩ দিনে ১২৮ কোটি ৪২ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
