পাহাড় ও সমতল মিলে এ দেশে আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৭৮টি বলে তথ্য উপস্থাপন করলেন ‘গবেষণা ও উন্নয়ন কালেকটিভ’ (আরডিসি)-এর সাধারণ সম্পাদক জান্নাত-এ ফেরদৌসী গত ১৩ ডিসেম্বর-২০২২ তারিখ সুদূর ঠাকুরগাঁওয়ের ‘লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর’-এর মুক্তমঞ্চে। এই ঘোষণার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্যসূত্রে এর সংখ্যা কোথাও ৪৫, কোথাও ৭৩টি বলে জানা গেছে; আর সরকারিভাবে এ যাবৎ ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে গেজেটে। অর্থাৎ গত একান্ন বছরেও আমরা বাংলাদেশে বসবাসকারী আদিবাসী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর সঠিক সংখ্যা নিরূপণে ব্যর্থ হয়েছি।
তার পরও থেমে নেই আদিবাসীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা। যদিও তা দেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর তুলনায় অতি নগণ্য। কারণ আমাদের সামাজিক উন্নয়নের মূল স্রোতোধারায় তারা এখনো শামিল হতে পারেনি। এ দোষ তাদের নয়, সংখ্যাগুরু সমাজের। সংখ্যাগরিষ্ঠদের দ্বারা আদিবাসীরা সেই অনাদিকাল ধরে শুধু অবহেলা, শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। এর কারণ একদিকে তাদের সরলতা, অশিক্ষা এবং দীর্ঘদিন আঁকড়ে থাকা মালিকানাধীন ভূসম্পত্তি; অন্যদিকে প্রতিপক্ষের লোভ, লালসা ও সবলের শক্তিমত্ততা। এ ছাড়া রয়েছে তাদের ঐশ^র্যময় সংস্কৃতি ও জীবনধারা সম্পর্কে সাধারণের সঠিক ও ঘনিষ্ঠ ধারণার অভাব। যদিও এ ধারণা অবশ্যই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চেতনাগত।
ধারণা করা হয়, পৃথিবীতে প্রায় পাঁচ হাজার আদিবাসী জাতিসত্তার বসবাস নব্বইটি দেশে, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশে^র প্রায় চল্লিশ কোটি আদিবাসীর মধ্যে বাংলাদেশে বসবাস প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষের, যারা আনুমানিক ত্রিশটি ভাষায় কথা বলে। এদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, ভাষা ও ইতিহাস-ঐতিহ্য পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল এবং বহুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে তা বাংলাদেশের এক অমূল্য প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ। কিন্তু এই অমূল্য সম্পদ সম্পর্কে আমাদের ধারণা অনেকটা ভাসা-ভাসা। কারণ এদের ব্যাপারে কিছু বাদে আমাদের প্রায় সবারই জ্ঞান ও ধ্যান-ধারণা কিছু বই ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিবরণ এবং তথ্য-উপাত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ভালোবেসে কাছে না গেলে কাউকে বোঝা যায় না। তেমনি আদিবাসীদের জীবন প্রবাহের সঙ্গে না মিশলে তাদের বোঝা যাবে না। কিন্তু তাদের সঙ্গে সংখ্যাগুরু সমাজের এই দূরত্ব ঘোচাবে কে?
এই দূরত্ব ঘোচানোর মহতী উদ্যোগ হিসেবে কিছুদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে ‘ইকো- সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)’ নামক একটি বেসরকারি সংস্থা। আমার জানা মতে, উত্তরবঙ্গের সমতলের আদিবাসীদের সামাজিক জীবন উন্নয়নের জন্য তারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর দুদিনব্যাপী ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ন্যাশনাল কনভেনশন ও সাংস্কৃতিক উৎসব’। হেক্স/ইপার নামক আরেকটি বেসরকারি সংগঠনের সহায়তায় এই বর্ণাঢ্য, বৈচিত্র্যময় ও ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানমালার নান্দনিক উপস্থাপনার প্রধান কৃতিত্ব ইএসডিওর তথা এর কর্ণধার প্রধান নির্বাহী ড. মুহম্মদ শহীদ-উজ-জামানের। তিনি ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর থেকে বাংলাদেশের প্রথিতযশা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধি, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, সরকারি কর্মকর্তা ও আদিবাসীসহ গ্রাহ্য গুণিজনদের নিয়ে সমন্বিত একটি সমাবেশ উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। সর্বোপরি বৃহত্তর দিনাজপুরের সমতলের আদিবাসীদের যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, তা সমগ্র অনুষ্ঠানমালাকে অপার আনন্দ, শ্রী ও সৌন্দর্য এবং পূর্ণতা দিয়েছে।
প্রথম দিনের জন বক্তৃতায় প্রদত্ত সুপারিশমালা ও আলোচনা, কর্ম-অধিবেশন এবং তৃণমূল সংলাপে অংশগ্রহণকারী আদিবাসীদের প্রাণখোলা মতামত; পরের দিন ঠাকুরগাঁও শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ইএসডিওর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘরে’ একদম গ্রামীণ পরিবেশে ১০টি নৃ-তাত্ত্বিক জনজাতির পৃথক পৃথক স্টল প্রদর্শনী ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এসব কিছু পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের সমতলের আদিবাসীদের চলমান জীবনধারা, হালের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা এবং তাদের বক্তব্যে চাওয়া-পাওয়ার যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তা সচেতন মহলের সঙ্গে ভাগাভাগি করা প্রয়োজন বলে আমার মনে হয়েছে। যেমন :
১. ভূমি ও সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কায় তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত। এ সমস্যা নিরসনে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের কাছে তাদের বেদনার আর্তি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
২. রাষ্ট্রের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং সব নাগরিক অধিকারসহ উন্নয়নের মূল স্রোতোধারায় অংশীদার হওয়া।
৩. ঐতিহ্যগতভাবে নিজেদের হাতে তৈরি ‘হাড়িয়া’ বা দেশি মদ উৎপাদন ও গ্রহণ থেকে সচেতন আদিবাসীরা মুক্তি চায়। কিন্তু সমাজের কিছু অর্থলোভী স্বার্থান্বেষী মানুষ এই ব্যবস্থাকে টিকে রাখতে তৎপর। এ ব্যাপারে তারা প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক সমাজের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে প্রকাশ্যে; বিশেষত নারীরা।
৪. আদিবাসীরা তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় লেখাপড়া শিখতে চায়।
৫. এই আদিবাসী উৎসবে অংশগ্রহণকারী সমতলের পৃথক পৃথক নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর প্রদর্শিত দৈনন্দিন যাপিত জীবনের বিভিন্ন উপাদান, ব্যবহৃত দ্রব্যাদি, খাদ্যবস্তু এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় যথেষ্ট মিল পরিলক্ষিত হলো যেন একই সুর, একই ভঙ্গি, একই মুদ্রা। মিল রয়েছে তাদের নৃ-তাত্ত্বিক অবয়বেও, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। একই এলাকায় পাশাপাশি বসবাস, ধর্মান্তকরণ, সংখ্যাগুরুর ভাষা ও সংস্কৃতির প্রবল চাপ, নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চায় পোষকতার অভাব এবং আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব ইত্যাদি নানান কারণে এসব নৃ-তাত্ত্বিক জাতিসত্তার পৃথক পৃথক নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলোর পার্থক্য দিন দিন কমে আসছে এবং একটি সমজাতীয় আদিবাসী সংস্কৃতির কৃত্রিম রূপরেখা যেন ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
৬. আদিবাসী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার পৃথক জাতিসত্তার বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের জাতীয় সম্পদ। এ দেশে তাদের বিচিত্র জীবনধারা ও সৌন্দর্যম-িত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে ‘পর্যটন আকর্ষণ’ হিসেবে ব্যবহার করার অমিত সম্ভাবনা বিদ্যমান। তাই এদের সাংস্কৃতিক জীবনধারার এসব বৈশিষ্ট্যকে পোষকতা ও প্রণোদনার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। এজন্য সরকারি সহায়তা ও আনুকূল্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বেসরকারি সংস্থাগুলোর এ ধরনের নিয়মিত উদ্যোগ ও আয়োজনের। তবে এ কথা সত্য যে, ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের পরই শুধু এমন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের চর্চা বা পরিচর্যা সম্ভব।
উৎসবের দুদিন এদের মলিন মুখগুলোতে যে অকৃত্রিম হাসির উজ্জ্বলতা দেখছি তাতে মনে হয়েছে এমন একটি বা দুটি দিনের জন্য তারা যেন দীর্ঘকাল প্রতীক্ষায় ছিল। তাদের অকৃত্রিম সরলতার জয় হোক।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা
