হাজার বছর ধরে রাজতান্ত্রিক ক্ষমতার স্বীকৃত প্রতীকগুলোর একটি রাজকীয় মুকুট। যা সমাজে তাদের অবস্থানকে করে তুলেছে সুনির্দিষ্ট। প্রাচীন মিসর থেকে শুরু করে রোমান সম্রাজ্যের মুকুট নিয়ে লিখেছেন নাসরিন শওকত
প্রত্নতাত্ত্বিকদের কল্যাণে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শনের খোঁজ পাওয়া যায়। এসব নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম ‘প্রাচীন মুকুট’। যা রাজতান্ত্রিক ক্ষমতার সবচেয়ে স্বীকৃত প্রতীকগুলোর একটি। একাধারে ক্ষমতা, রাজপদ বা রাজ্যাধিকার এবং আভিজাত্য বহন করে থাকে। হাজার বছর ধরে বিভিন্ন রাজা, বাদশা , সম্রাটসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরা নিজেদের ক্ষমতা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে মুকুট পরে আসছেন। দেখা যায়, যার প্রভাব-প্রতিপত্তি যত বেশি হয়ে থাকে, তার মুকুট তত আভিজাত্যপূর্ণ ও আকর্ষণীয় হয়। প্রাচীনকাল থেকেই মুকুট পরার অনুষ্ঠান প্রচলিত ঐতিহ্য বা রীতি পালনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। কিছু মুকুট হাজার বছর ধরে টিকে আছে। প্রাচীন মিসর থেকে শুরু করে রোমান সম্রাটদের শাসনকালে মাথার অলংকার হিসেবে রাজা-রানীর মাথায় শোভা বাড়িয়েছে মুকুট। যদিও ইতিহাসের প্রথম যুগে মুকুট শুধুমাত্র রাজা বা সম্রাটরা মাথায় পরতেন। আব-ার বেশ ক’জন রানীকেও বিশেষ বিশেষ সময়ে মুকুট পরতে দেখা যেত। প্রাচীন ওই মুকুটগুলো সাধারণত সোনা বা রুপার ধাতু দিয়ে নির্মিত হতো। মানবজাতির ইতিহাসে নকশা ও নির্মাণশৈলীর ভিন্নতায় কালের ধারায় মুকুট পরিবর্তিত হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু মুকুট বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন দেশে এখনো অটুট রয়েছে। যা বিভিন্ন কোষাগার বা জাদুঘরে প্রদর্শনীতে রাখা আছে। রাজকুমারী ব্লাঞ্চের মুকুট ইংল্যান্ডের সবচেয়ে প্রাচীন ও রাজকীয় মুকুট হলো বোহেমিয়ান মুকুট। যাকে প্যালাটাইন মুকুটও বলা হয়ে থাকে। এখনো পর্যন্ত অক্ষত থাকা মুকুটটির সময়কাল ছিল সম্ভবত ১৩৭০ থেকে ১৩৮০ পর্যন্ত। ১৪০২ সাল থেকে হাউজ অব উইটেলবাখের সম্পত্তি ছিল।
প্রাচীন সেই সময়ে ব্রিটিশ রাজকীয় বিয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এই মুকুট, যা সর্বপ্রথম রাজা দ্বিতীয় রিচার্ডের নামে নথিভুক্ত করা হয়েছে। সম্ভবত এটি ছিল ইংরেজ রাজা দ্বিতীয় রিচার্ডের স্ত্রী বোহেমিয়ার রানী অ্যানের। এর আগে ইংল্যান্ডের রাজা হেনরি চতুর্থের কন্যা ব্লাঞ্চের সঙ্গে ইলেক্টর প্যালাটাইনের লুই তৃতীয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়। তখন ব্লাঞ্চকে যৌতুকের অংশ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এই মুকুট। মুকুটটির মূল কাঠামো সেনার তৈরি। উচ্চতা ও ব্যাস-উভয় দিক থেকে এটি ১৮ সেন্টিমিটার। ওজন ১ কিলোগ্রামের একটু কম। মূল কাঠামোর গায়ে ছয়টি খাঁজকাটা ১২টি গোলাপ ফুল নকশা করা ছিল, যা একটি করে সোনার ডালের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। যার মাথায় আবার একটি করে পদ্মফুল রাখা। কিন্তু এরই মধ্যে একটি গোলাপের সেখান থেকে খোয়াও গেছে। গোলাপগুলোর গায়ে ৩৩টি হীরা, ৬৩টি বালাস রুবি, পান্না, ৪৭টি নীলকান্তমণি, ৫টি পান্না, এনামেল ও মুক্তাখচিত। এর মধ্যে ৭টি মুক্তা ও ১টি পান্নার পাপড়ি খোয়া গেছে। ইতিহাসে এটিকে গথিক স্বর্ণকারদের হাতে তৈরি করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুকুট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৭৮২ সাল থেকে মুকুটটি জার্মানির মিউনিখের রেসিডেঞ্জ কোষাগারের প্রদর্শনীতে রয়েছে।
সেন্ট ওয়েন্সেসলাসের মুকুট এটিও বোহেমিয়ান মুকুটগুলোর একটি। মূল্যবান জহরত ও রত্নপাথর দিয়ে ১৩৪৭ সালে অলংকারটি তৈরি করা হয়েছিল। মুকুটটি মূলত পবিত্র রোমান সম্রাট চতুর্থ চার্লসের জন্য তৈরি করা হয় তখন। তিনি ১১ শতকের বোহেমিয়ান শাসক ছিলেন। চার্লস তার সময়ের হাউজ অব লুক্সেমবার্গের প্রথম পৃষ্ঠপোষক সন্ত সেন্ট ওয়েন্সেসলাসকে মুকুটটি দিয়েছিলেন। ওয়েন্সেসলাসকে মুকুটটি ২২ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি করা হয় তখন। যার ওপর ১৯টি নীলকান্তমণি, ৪৪টি স্পিনেল, ৩০টি পান্না এবং ১টি লাল এলবাইট খচিত ছিল। এর ওজন আড়াই কিলোগ্রাম। এর কাঠামোটিকে সঙ্গে থাকা দুটি লম্বা ক্রসকে গোলাকার পাতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। মুকুটটি সন্ত সেন্ট ওয়েন্সেসলাসের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল, যা শুধু পুরোপুরি বোহেমিয়ান কোনো রাজাই রাজ্যাভিষেকের মধ্য দিয়ে পড়তে পারবেন। তবে এর সঙ্গে একটি অদ্ভুত ঐতিহ্যও জুড়ে দেওয়া আছে। প্রাচীন চেক সেই ঐতিহ্য অনুসারে, যদি কোনো ব্যক্তি জোর করে মুকুটটি দখল করে নেন ও মাথায় পরেন, তাহলে পরের বছরই তার মৃত্যু হবে।
মনোমাখের মুকুট স্বর্ণের তৈরি এই মাথার মুকুটটি ক্রেমলিনে রাখা প্রাচীনতম মুকুট। একে আবার গোল্ডেন ক্যাপও বলা হয়। রাশিয়ার গ্রান্স প্রিন্স ও জারদের একটি প্রধান প্রত্ননিদর্শন। আবার একই সঙ্গে তা রামিয়ান স্বৈরশাসনেরও প্রতীক। মুকুটটি ১৩ শতকের শেষের দিকে বা ১৪ শতকের শুরুর দিকে তৈরি করা হয়েছিল। তখন সোনার তৈরি ৮টি বৃত্তকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে মুকুটটি তৈরি করা হয়। যার গায়ের চারপাশে পাকোনা তারার মতো গোল গোল সূক্ষ্ম কারুকাজ ও নকশা রয়েছে। তার ওপর বসানো হয়েছে মূল্যবান পাথর চুন্নি, পান্না ও মুক্তা। ক্যাপটির প্রতিটি বৃত্তে ৩টি করে মুক্তা বসানো রয়েছে। আর সবার ওপরে রয়েছে একটি সাধারণ ক্রস। যার তিন প্রান্তজুড়ে আছে ৩টি মুক্তা। সম্ভবত ১৬ শতকের সময় মুকুটটিকে ছাঁটাই করা পশম দিয়ে মোড়ানো হয়। এতে এর সৌন্দর্য্য আরও বৃদ্ধি পায়। শোনা যায়, মধ্যযুগীয় এই মুকুটটি কিয়েভের যুবরাজ ভøাদিমির মনোমাখকে দিয়েছিলেন বাইজেন্টাইন সম্রাট কনস্টানটাইন মনোমাকাস। আবার কেউ কেউ বলেন, এটি গোল্ডেন হোর্ডের উজবেগ খান মস্কোকে দিয়েছিলেন। শেষবার ১৬৮২ সালে ইভান পঞ্চম ও পিটার দ্য গ্রেটের দ্বৈত রাজ্যাভিষেকের সময় মনোমাখের মুকুটটি ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রাচীন এই মুকুটটি বর্তমানে ক্রেমলিনের ইম্পেরিয়াল কোষাগারের বিভাগে প্রদর্শনীতে রাখা আছে। হাঙ্গেরির পবিত্র মুকুট বর্তমানে টিকে থাকা দুটি বাইজেন্টাইন মুকুটের মধ্যে এটি একটি।
এটি সন্তস্টিফেনের মুকুট নামেও পরিচিত। হাঙ্গেরির সন্তস্টিফেন প্রথমের সম্মানার্থে মুকুটটির নামকরণ করা হয়েছিল সে সময়। ধারণা করা হয়ে থাকে, অলংকার করা মাথ ার সুন্দর এই মুকুটটি ১১ শতকের। পরের শতাব্দী থেকে রাজাদের মুকুটটি পরানো শুরু হয়। তখন এতে খিলান ও ওপরের রিম আলাদা করে বৃত্তাকার শীর্ষ ফলক যোগ করা হয়। মুকুটটি সে সময় কার্পাথিয়ান অববাহিকার ভূমির ওপর হাঙ্গেরির রাজার কর্তৃত্বের প্রতীক ছিল। একই সঙ্গে তা রাজার বৈধতারও নিশ্চিত করত। পবিত্র মুকুটটি প্রায় সব হাঙ্গেরিয়ান রাজ্যাভিষেকের মধ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এটি সর্বশেষ ১৯১৬ সালে ব্যবহার করেছিলেন রাজা চার্লস চতুর্থ। তাকেসহ ৫০ জন হাঙ্গেরীয় রাজা এই মুকুট পরেছিলেন। ‘পবিত্র মুকুট’ নামটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ১২৫৬ সালে। ১৪ শতকের মধ্যে এসে যা রাজকীয় ক্ষমতার অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠে। ২০০০ সাল থেকে পবিত্র মুকুটটি হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট ভবনের কেন্দ্রীয় গম্বুজ হলের প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে। ইম্পেরিয়াল মুকুট পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের এই মুকুটের ইতিহাস নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। এটি শার্লেমেনের মুকুট নামে পরিচিত। এটি ১০ শতকে অটো দ্য গ্রেটের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। পবিত্র রোমান সম্রাটের জন্য বাইজেন্টাইন শৈলীতে তৈরি এই মুকুটটি দেখতে খুব চাকচিক্যময় ও জাঁকজমকপূর্ণ। বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে গোলাকার এই মুকুটটি অষ্টভূজ আকৃতির। এটি ৮টি কবজাযুক্ত সোনার প্লেট দিয়ে তৈরি। সম্ভবত ৯৬২ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট অটো প্রথমের রাজ্যাভিষেকের জন্য মুকুটটি তৈরি করা হয়েছিল। পরে সম্রাট কনরাড দ্বিতীয় এটিতে আরও কিছু উপাদান সংযোজিত করেন। এটি সর্বপ্রথম ১২ শতকে নথিভুক্ত করা হয়। ১৮০৬ সালে রোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি আগ পর্যন্ত সম্রাটদের রাজ্যাভিষেকের সময় মুকুটটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন নতুন সম্রাট নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গেই রাজার উপাধি হিসেবে মুকুটটি পরানো হতো।
এটি ইম্পেরিয়াল রেগালিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। যার মধ্যে রয়েছে ইম্পেরিয়াল ক্রস, ইম্পেরিয়াল তলোয়ার এবং পবিত্র ল্যান্স। রাজ্যাভিষেকের সময় নতুন সম্রাটকে রাজদণ্ডের সঙ্গে ইম্পেরিয়াল গোলক (অর্ব) দেওয়া হতো। বর্তমানে ইম্পেরিয়াল মুকুটটি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার হফবার্গের ইম্পেরিয়াল কোষাগারে রাখা আছে। সিলার মুকুট মধ্যযুগের প্রথমদিকে কোরিয়ান উপদ্বীপের কিছু অংশ শাসন করত সিলা রাজ্যের রাজারা। এই রাজাদের প্রাচীনকাল থেকে টিকে থাকা সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুকুটগুলোর মধ্যে একটি হলো সিলার মুকুট।
এ ছাড়া সে সময়ের সোনালি ও ব্রোঞ্জের যে মুকুটগুলো রয়েছে তার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য এটি। সিলার মুকুট ৫ম থেকে ৭ম শতাব্দীর মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী মুকুটগুলো কবরস্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। ১৯২১ সালে ইউনিফায়েড সিলার সাবেক রাজধানী গিয়াংজুর তুমুলিতে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ চলে। তখন ঘটনাক্রমে বেশ কিছু মুকুট আবিষ্কার হয়। মুকুটটির পুরো কাঠামো সোনার তৈরি, যা সূক্ষ্মভাবে সোনার পাত কেটে তৈরি করা হয়েছিল।
নির্মাণশৈলীর জন্য মুকুটটি পরা খুব কঠিন। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, এটি কবরে সমাহিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। সিলার মুকুটের বাইরের অংশের নকশা ইউরেশিয়ান স্টেপ্পি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সিথো-ইরানীয় ও কোরীয়দের সংযোগের বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তোলে। এই মুকুগুলোকে কোরিয়ার ঐতিহ্যের সেরা শিল্পকর্ম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে চীনা কোনো বৈশিষ্ট্য দেখা যায় না। বায়েকজের মুকুট, গয়ার মুকুট ও গোগুরি রাজ্যের মুকুট থেকে বিশেষভাবে আলাদা। গাছের আদলে কাঠামো করা সিলা মুকুটটি সাধারণত ‘বিশ^ গাছের’ ধারণাকে প্রতিনিধিত্ব করে থাকে বলে বিশ্বাস করা হয়, যা সাইবেরিয়ান ও ইরানি শামানবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ছিল। টলেমাইক স্বর্ণ মুকুট আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পর গ্রিক টলেমাইক রাজবংশ মিসর শাসন করেছিল। স্বর্ণের কারুকার্য করা এই মুকুটটি সম্ভবত ওই শাসক রাজবংশের কোনো সম্ভ্রান্ত নারী ব্যবহার করেছিলেন। মুকুটটি ২২০ থেকে ১০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের মধ্যে আলেক্সান্দ্রিয়ায় তৈরি করা হয়। এটি সাধারণ গ্রিকশৈলীর একটি নির্দশন। এর কেন্দ্রবিন্দুতে একটি হেরাক্লেস গিঁটের মতো কারুকার্য করা হয়েছিল। ইউনেটের মুকুট প্রাচীনতম মুকুটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হলো ইউনেটের মুকুট। এটি প্রাচীন মিসরের ১২তম রাজবংশের (সম্ভবত দ্বিতীয় সেনুস্রেট) একজন রাজকন্যার ছিল। তিনি রাজকুমারী সিট-হাথর। তার সমাধিটি আগের শতাব্দীতে কবর ডাকাতরা ভেঙে ফেলেছিল। তবে তার কবরের কিছু অংশ সম্ভবত ডাকাতদের চোখে পড়েনি। এরপর ২০ শতকে প্রতœতাত্ত্বিকরা মুকুটসহ গহনা ভর্তি বাক্স আবিষ্কার করেছিলেন। এরপর ইউনেটের মুকুটটি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
