দেখা থেকে লেখা

হাত ধরে হাঁটে জীবন-মৃত্যু

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫:৪৩ এএম

এক তরুণ অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের দিকের দরজা খুলে হতবিহ্বল এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। দায়িত্বরত আনসার সদস্য বললেন স্ট্রেচার লাগবে। তরুণটি স্ট্রেচারের খোঁজে অনির্দিষ্টভাবে কয়েক গজ যেতেই কেউ একজন তাকে সঙ্গে নিয়ে গেল। আমি উঁকি দিয়ে রোগীকে দেখার চেষ্টা করলাম। পায়ের দিকে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মারা গেছে না বেঁচে আছে বুঝলাম না। স্ট্রেচারসহ তরুণটি ফিরে এলো। সঙ্গে আরও দুজন। তারা ধরাধরি করে নামিয়ে স্ট্রেচারে উঠিয়ে রোগী নিয়ে গেল জরুরি বিভাগের দিকে। আমি যার কাছে এসেছি, তিনি আমার সহকর্মী। তাকে যে রোগীটি মাত্র জরুরি বিভাগে ঢুকল তার কথা বললাম। জানলাম যে স্ট্রেচারের জন্য যারা এসেছিলেন, যাদের এগিয়ে আসার পরার্থপরতা নিয়ে ভাবছিলাম, তারা আসলে এ জন্য টাকা নেন। পেশাদার সহায়তাকারী। আমরা জরুরি বিভাগ থেকে বের হয়ে ডিএমসির গেটের উল্টো দিকের চায়ের দোকানে গিয়ে বসি। সেখান থেকে ডিএমসির গেটের দিকে তাকিয়ে দেখি বিছানা, বালিশ থেকে শুরু করে রাইস কুকার, হিটারসহ নানান জরুরি তৈজস, ফলমূল, রান্নার উপকরণ, মনিহারি দ্রব্যের জমজমাট পসরা। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে আমার সহকর্মী হেসে জানালেন, ‘ভাই হাসপাতালে ভর্তি হইলে সেখানে স্বজনদের ছোটখাটো সংসার পাতা লাগে।’

সহকর্মীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কী করা যায় বা কোন দিকে যাব ভাবতে ভাবতে জরুরি বিভাগেই ফেরত এলাম। রাত ৮টা। লাইন ধরে রোগীর স্বজনরা টিকিট কাটছেন। ফটক দিয়ে ঢুকতে গেলে নিরাপত্তারক্ষীর সঙ্গে কিছুটা তর্কবিতর্ক হচ্ছে রোগীর সঙ্গে কোনোভাবেই একজনের বেশি ঢোকা যাবে না; তবু একাধিক লোক ঢুকছে। আমিও ঢুকে গেলাম। ভেতরে চিকিৎসক ও নার্সরা ব্যস্ত রোগী নিয়ে। অজ্ঞান হয়ে পড়া এক রোগীকে দেখলাম। সাত থেকে আটজন লোক তার বেড ঘিরে দাঁড়িয়ে। চিকিৎসক নানা প্রশ্ন করে বোঝার চেষ্টা করছেন কীভাবে রোগী অজ্ঞান হয়েছেন। কেউ উত্তর দিতে পারছেন না। ১৫-২০ মিনিট ধরে জরুরি বিভাগের এক কোনায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম। এখানে আগে এলেই আগে চিকিৎসা পাওয়া যাবে, বিষয়টা তেমন নয়। রোগীর অবস্থা খারাপ হলে তার সিরিয়াল অনেক পরে হলেও ওই রোগী অগ্রাধিকারভিত্তিতে সেবা পাচ্ছেন। ইতিমধ্যে অজ্ঞান রোগীর জ্ঞান ফিরে এসেছে। চিকিৎসক বেড ঘিরে থাকাদের ভিড় কমাতে বললেন আর গেটের নিরাপত্তারক্ষীকে ধমক দিলেন এত লোক ঢুকেছে বলে। নিরাপত্তারক্ষী দরজায় দাঁড়িয়েই গলা চড়িয়ে ভিড় কমাতে বললেন। বুঝলাম চিকিৎসকের ধমক ও নিরাপত্তাকর্মীর গলা চড়ানো যেমন নিয়মিত ঘটনা এবং অযাচিত ভিড়ও তেমন।

বের হয়ে জরুরি বিভাগের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অজ্ঞান ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন যিনি, দেখি তিনিও বের হয়ে যাচ্ছেন। তার পিছু পিছু গিয়ে তাকে পরিচয় দিয়ে বললাম, ভাই দুই মিনিট কথা বলা যাবে। তিনি হেসে বললেন, আপনাকে তো ভেতরে দেখলাম। কোনো রোগী নিয়ে এসেছি কি না জানতে চাইলেন। না জানিয়ে বললাম, ওই রোগীর জ্ঞান ফিরল কীভাবে। তিনি আমাকে অবাক করে বললেন, ‘এমনিই ফিরেছে, কিছু করা লাগেনি। মনে হয় বাসাবাড়ির সুইচ পয়েন্ট থেকে শক খেয়েছিলেন।’ জানতে চাইলাম যে, তাহলে এতক্ষণ আপনি রোগীর সঙ্গের লোকদের এত প্রশ্ন করছিলেন যে! তিনি বললেন, ‘চিকিৎসা দিতে আমার জানা দরকার ছিল যে কী ধরনের বৈদ্যুতিক লাইন থেকে সে শক খেয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, জরুরি বিভাগে রোগীর সঙ্গে যারা আসেন তারা বেশিরভাগ সময় দরকারি তথ্য জানাতে পারেন না। এতে আমাদের চিকিৎসা দিতে বেগ পেতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা সাধারণ ধারণা ও রোগীর অবস্থা দেখে সাপোর্টিং চিকিৎসা শুরু করে দিই। আপনি দেখলেন, সেখানে সাত-আটজন আমাকে ঘিরে আছে, কিন্তু তারা কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারছে না। এ ধরনের স্বজনরা আবার সহজেই উত্তেজিত হয়ে যান। আমি আসলে তাদের বোঝাচ্ছিলাম যে চিকিৎসা হচ্ছে বা তাদের ব্যস্ত রাখছিলাম। আল্লাহর রহমতে লোকটির জ্ঞান ইতিমধ্যেই ফিরে এসেছে।’ কোন ধরনের রোগী বেশি আসে জানতে চাইলে তিনি জানালেন, বাইক অ্যাকসিডেন্ট। এ ছাড়া বিষ খাওয়া, শক খাওয়া, হার্ট অ্যাটাক হওয়া, ট্রেনে কাটা রোগী বেশি। তিনি জানান, এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে (জরুরি বিভাগ) আসা রোগীর প্রাণ কীভাবে বাঁচানো সম্ভব, এটাই তাদের চিন্তায় থাকে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত রোগীর সঙ্গে একজনের বেশি স্বজনকে ঢুকতে না দেওয়ার বিষয়টিই বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকেই বিষয়টি মানতে চান না। রোগীর স্বজনদের বুঝতে হবে, এটি রোগীর সর্বোচ্চ স্বার্থের দিক চিন্তা করেই করা হচ্ছে।

হঠাৎ শোরগোল শুনে ফের জরুরি বিভাগে ঢুকলাম। দেখি এক বৃদ্ধ তোয়ালে প্যাঁচানো একটি শিশুকে বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছেন, তাকে ঘিরে আছে আটজন বোরকা পরিহিত নারী ও অন্তত সাতজন পুরুষ। বৃদ্ধটি বিলাপ করতে করতে কোনো এক বোরকা পরিহিতাকে বকছেন ‘যাও আরও ঘুরতে যাও, যাও বেড়াও, শিক্ষা হইছে...’। সঙ্গের পুরুষ সদস্যরা এক আনসার সদস্যের ওপর রাগ ঝাড়ছেন আপনারা মানুষ? কিচ্ছু বলতে পারব না..., দেখি কী করেন... ইত্যাদি। আনসারটিও অনড় দাঁড়িয়ে বলছেন এটা নিয়ম...। এক পুলিশ সদস্য এগিয়ে এসে আনসার সদস্যকে মৃদু ভর্ৎসনা করে সব থেকে কাতর ও উত্তেজিত যুবকটির পিঠে হাত দিয়ে সান্ত¡নার ভঙ্গিতে বললেন, ভাই বুঝতে পারছি, আপনি আসেন আমার সঙ্গে। যা বুঝলাম, দেড় বছরের শিশুটি বাসার সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে খেলতে খেলতে বাথরুমে রাখা বড় বালতিতে পড়ে যায়। অন্যরা যখন টের পান ততক্ষণে সব শেষ।

দুই-তিন মিনিট পর পুলিশ সদস্য ওই যুবককে নিয়ে ফেরত এলেন শিশুটিকে পর্যবেক্ষণ রুমে নিয়ে গেলেন। পুলিশ সদস্যটিকে একা পেয়ে বললাম, ভাই আপনি তো ভালোই সামলালেন, সমস্যা কী? তিনি জানান, শিশুটি আগেই মারা গেছে, এখানে আনার পর ডাক্তার দেখেও তাই বলেছেন। তারা লাশ নিয়ে যেতে গেলে আনসার সদস্যরা বাধা দিয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যু তাই পুলিশ কেস হবে, তারপর লাশ নিতে হবে এ নিয়ে উত্তেজনা। তিনি বললেন, নিয়ম যেহেতু, আনসার বা আমরা কী করতে পারি। এমন পরিস্থিতিতে স্বজনরা খুব উত্তেজিত থাকেন, বুদ্ধি করে সামলাতে হয়। জরুরি বিভাগের সামনে এ পুলিশ সদস্যকে ভালো লাগল।

পর্যবেক্ষণ রুমের দরজা থেকে একটু দূরে জরুরি বিভাগের করিডরে দুজন বোরকা পরা নারী ভঙ্গুর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। মনে হলো পানিতে ডুবে যাওয়া শিশুর স্বজনদের মধ্যে তারা ছিলেন। একটু দ্বিধা নিয়েই তাদের একজনের কাছে জানতে চাইলাম, বাচ্চাটা আপনার কী হয়? তিনি চোখ তুলে রাজ্যের হাহাকার ভরা কান্নাসিক্ত রক্তিম দৃষ্টি তুলে সব হারানো কণ্ঠে বললেন ‘আমার ছেলে’। আর কিছু জানতে চাওয়ার বা সান্ত¡না দেওয়ার সাহস পেলাম না, এক পা দুই পা করে সরে এলাম। সন্তান হারানো রক্তিম দৃষ্টির শূন্যতার রোদন বিধ্বস্ত ইরাক, সিরিয়া বা ইয়েমেনের বোরকা পরা মায়েদের চাহনি ছবিতে দেখেছি। কিন্তু ডিএমসির জরুরি বিভাগের সামনে তার মুখোমুখি হব ভাবিনি। মায়েদের এ বেদনার অব্যক্ত ভাষা তবে সর্বজনীন, যা দেশ-কাল ঘটনার সীমানা পার হয়ে যায়!

ইতিমধ্যে আরেকটি লাশ ঢুকেছে, ট্রেনে কাটা পড়া ব্যক্তির। কিন্তু তার সঙ্গে স্বজন বলতে কেউ নেই, রোদনও নেই। যিনি আছেন তিনিও নিহতের কেউ নন। ওই পুলিশ সদস্যকে দেখলাম তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে লাশের শরীরের আঘাতের দিকে চোখ বোলাচ্ছেন, সুরতহাল লিখবেন হয়তো। হঠাৎ আমার দিকে পুলিশ সদস্যটির চোখ পড়লে ঈষৎ হাসলেন, আমিও। বের হওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। জরুরি বিভাগের ফটক পার হতে হতেই তিন-চারজনের একটি দলকে অতিক্রম করতে হলো, যাদের একজন শব্দহীন কাঁদছিলেন। স্বজন হারানোর চূড়ান্ত ক্ষতির সেই নীরব কান্না। সঙ্গের নারীটি একটু পিছিয়ে পড়েছেন, হাতে একটি বালিশ ধরে পা টেনে টেনে চলেছেন। শোকের ওজনে বালিশটিও অনেক ভারী হয়ে উঠেছে তার হাতে।

শয্যাসংকট ও অপর্যাপ্ত জনবলের পাশাপাশি পাহাড়সম বিভিন্ন অনিয়ম-সংকটের পরও ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এ দেশের সাধারণ মানুষের ভরসার স্থল। ডিএমসি সাধারণত কাউকে ফেরায় না। সবারই আশ্রয় হয় বেডে না হলে, ফ্লোরে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত