করোনাপরবর্তী সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট, চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবসহ নানা কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভুগছে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব। আমদানি পণ্যে লাগামহীন ব্যয় বাড়ায় দেশে বিদেশি মুদ্রার সংকট সামাল দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও সুদহার বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বিরোধিতায় তা বাড়ছে না।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়ে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের (জানুয়ারি-জুন) সময়ের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরি পলিসি নির্ধারণকারী কমিটির সঙ্গে তফসিলি ব্যাংক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এই বিষয়টির কড়া বিরোধিতা করেন। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর কোনো সিদ্ধান্ত না জানালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র বলছে, ঋণে সুদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মতকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন গভর্নর। সেক্ষেত্রে আপাতত ঋণের বিপরীতে সুদের যে হার নির্ধারিত আছে তা ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এ বিষয়ে বৈঠকে উপস্থিত থাকা একজন ব্যাংকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মুদ্রানীতির আলোচনায় সুদের হার বৃদ্ধির পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি এসেছে। এ সময় ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে এবিবির ও বাফেদার চেয়ারম্যান সুদের হার তুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তার বিরোধিতা করেছেন।
মূলত সরকারের উচ্চ মহল ব্যবসায়ীদের পক্ষে থাকায় সুদ হার বাড়ানোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। সরকার থেকে কোনো নির্দেশনা আসার পরই এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদ্যোগ নিতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বৈঠক সূত্র বলছে, এবিবির চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন ও বাফেদার চেয়ারম্যান আফজাল করিম সম্প্রতি বেড়ে যাওয়া মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের পক্ষে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান সুদের হার তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করে বৈঠকে জানান যে, বাংলাদেশে যে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে তা দেশীয় কারণে নয়। মূলত বিশ^বাজারে পণ্যমূল্য বাড়ায় দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এই মুহূর্তে বাজারভিত্তিক সুদের হার করলে ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। সে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা বড় অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র বলছে, ঋণের বিপরীতে সুদের যে হার নির্ধারণ করা আছে তা এখনই পরিবর্তনের পক্ষে নন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। তিনি মনে করেন, বর্তমান যে মূল্যস্ফীতি তা নিয়ন্ত্রণে সুদের হার তুলে দেওয়াই সমাধান নয়। বরং সুদের হার ধরে রেখেই মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।
মুদ্রানীতি প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো আগামী মুদ্রানীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে। একই সঙ্গে পদক্ষেপগুলো নির্ণয় করা হবে। আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী সুদের হারের সীমা তুলে দেওয়ার বিষয়টি এখন বিবেচনায় নাও আসতে পারে। বর্তমান গভর্নরের জন্য প্রথম নতুন মুদ্রানীতিতে একটু ব্যতিক্রম হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। অর্থ বিভাগের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি মুদ্রানীতির খোলনলচে পরিবর্তন করতে চান। যেন সবার জন্য নতুন মুদ্রানীতি সহায়ক হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র বলছে, সুদের হার ছাড়াও বৈঠকে শরিয়া পরিচালিত ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের আমানতের অবস্থা, ডলারের একক রেট চালুকরণ, খেলাপি ঋণ হ্রাস, মূল্যস্ফীতি এবং পণ্য আমদানি ও রপ্তানির আড়ালে পাচার বন্ধে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। পাশাপাশি মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান আইন, নীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কেও নিজস্ব মতামত তুলে ধরেছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দেশের বর্তমান অবস্থায় মুদ্রানীতির সহায়তায় মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ও প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির সুব্যবস্থাপনা একটি চ্যালেঞ্জ। বিষয়টি মাথায় রেখে কীভাবে সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় সে জন্য স্টেক হোল্ডারদের পরামর্শ নেওয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’
সাধারণত মুদ্রার গতিবিধি প্রক্ষেপণ করে এই মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতির অন্যতম কাজগুলো হলো, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা, ঋণের প্রক্ষেপণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি ঋণের জোগান ধার্য করা এবং মুদ্রার প্রচলন নিয়ন্ত্রণ করা। এদিকে নতুন মুদ্রানীতি আসার আগেই তিনবার নীতি সুদহার বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে রেপো সুদহার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে রেপো সুদহার বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
রেপো সুদহার বাড়ানোর ফলে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার করতে বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে মূলত টাকার প্রবাহ কমাতে, যাতে ব্যাংকগুলো বেশি সুদের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কম টাকা ধার করে, এটাই এ সিদ্ধান্তের মূল কারণ।
সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি ভঙ্গি অনুসরণ ও কিছুটা সংকোচনমুখী ঠিক করে ২০২২-২৩ অর্থবছরের ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেখানে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ জোগানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তাতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যা এর আগের বার ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল। আর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ, যা আগের বার ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। সব মিলিয়ে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৮ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। জাতীয় বাজেটে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে ধরে রাখার পরিকল্পনার নির্ধারণ করে সরকার।
