সংসদে প্রধানমন্ত্রী

নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস চাইলে আমদানি মূল্য দিতে হবে

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:৫২ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়লেও মূল্যস্ফীতি আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি। গ্যাস যে মূল্যে কেনা হবে, সেই মূল্য গ্রাহককে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে দাম বাড়তে পারে।’ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে বাংলাদেশ কোনো শর্ত দিয়ে ঋণ নিচ্ছে না বলেও জানান তিনি। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নুর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আইএমএফ কেবল তখনই (যেকোনো দেশকে) ঋণ দেয়, যখন দেশটি ঋণ পরিশোধের যোগ্যতা অর্জন করে। আমরা তো তেমন কোনো শর্ত দিয়ে ঋণ (আইএমএফ থেকে) নিচ্ছি না।’

তিনি বলেন, (রাশিয়া-ইউক্রেন) যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী দ্রব্যমূল্য বেড়েছে। তারপরও সব মানুষ খাদ্য যাতে কম দামে পায়, সে ব্যবস্থা করেছি আমরা। যারা কিছুই করতে পারে না, তাদের জন্য বিনা মূল্যে খাদ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষিতেও ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তো বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকি দিচ্ছি। আমার প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর কোন দেশ গ্যাস আর বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়? কেউ দেয় না।’

শিল্পকারখানার মালিকদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ চাইলে যে মূল্যে কিনে আনব, সেই মূল্য তাদের দিতে হবে। এখানে ভর্তুকি দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

সংসদ সদস্য এম আব্দুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে সরকার জোর দেওয়ার কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নয়নে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য টিসিবির ফেয়ার প্রাইস কার্ড দিয়ে দিয়েছি। যেখানে ৩০ টাকা কেজিতে চাল কিনতে পারে। তেল, চিনি, ডাল সীমিত আয়ের মানুষ ন্যায্যমূল্যে কিনতে পারে। সেই ব্যবস্থাটা করে দিয়েছি। এর থেকে যারা নিম্ন আয়ের, তাদের জন্য আমরা ১৫ টাকায় চাল দিচ্ছি। সেই সঙ্গে তেল, ডাল ও চিনিও দেওয়া হচ্ছে। আর একেবারে হতদরিদ্র যারা কিছুই করতে পারে না, তাদের বিনা পয়সায় খাদ্য সরবরাহ করছি। স্বল্প আয়ের মানুষ যাতে কষ্টে না পড়ে, সেদিকে দৃষ্টি রেখে এই ব্যবস্থা করছি। কৃষিতে আমরা ব্যাপকভাবে ভর্তুকি দিচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইংল্যান্ডের মতো জায়গায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ হচ্ছে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি। এটা একটা উন্নত দেশের কথা বললাম। পৃথিবীর সব দেশে এ অবস্থা বিরাজমান। বাংলাদেশ এখনো সেই অবস্থায় পড়েনি।’ ভর্তুকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণ; বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে যদি ৪০, ৫০ ও ৬০ হাজার কোটি টাকা আমাকে ভর্তুকি দিতে হয়, তাহলে সেটা কী করে দেব? এর ফলে দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার যে চেষ্টা, সেটা করে কিছুটা সফলতা দেখাতে পেরেছি। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে।’

সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনে বিদ্যুতের ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছি। এভাবে যদি সবাই উদ্যোগ নেয়, তাহলে বিদ্যুৎ ব্যবহার সাশ্রয়ী হতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর বাংলাদেশ সফরের প্রসঙ্গ টেনে জাপার এমপি চুন্নু বলেন, ‘ডোনাল্ড লু পাকিস্তান সফরের পর তেহরিক-ই-ইনসাফ ক্ষমতাচ্যুত হয়। তিনি বাংলাদেশে আসার পরে অনেকে মনে করেছিল সরকারের কিছু একটা হবে। জানি না, তিনি যাওয়ার পরে সরকারকে খুব খুশি খুশি লাগছে। আবার একটি দল মনে হয় খুবই অখুশি। আমরা জাতীয় পার্টি এটাকে ওভাবে নিচ্ছি না। এটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছি। রাজনৈতিকভাবে বর্তমান যে অবস্থাটা মানুষের মাঝে একটি গুঞ্জন আছে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার কারণে কিছু একটা যেন হয়। এ ধরনের কিছু আছে কি না?’ একপর্যায়ে তার বক্তব্য চলাকালেই মাইক বন্ধ হয়ে যায়। পরে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তার এসব প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি।

সর্দি-জ¦রে আক্রান্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সংসদে এম আব্দুল লতিফের মৌখিক প্রশ্নের দীর্ঘ ১৭ পৃষ্ঠার জবাব দেন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে উত্তর দিতে গিয়ে তিনি কিছুটা অসুস্থ বোধ করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমার অস্থির লাগছে।’ এরপর বসে উত্তর দেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে অনুরোধ করেন। তবে তিনি বসে তার বক্তব্যের বাকি অংশ পঠিত বলে গণ্য করার অনুরোধ করেন।

আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করার কাজ চলছে :  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তার সরকার সবার জন্য বিশ^মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। সবাই যাতে আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা পায় তার জন্য আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ সারা দেশের ১৩টি জেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরও ৪৫টি কমিউনিটি ভিশন সেন্টার উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি তৃতীয় ধাপে এই কমিউনিটি ভিশন সেন্টারগুলোর উদ্বোধন করেন। যার মাধ্যমে এর সংখ্যা ১৩৫-এ পৌঁছেছে।

সরকারপ্রধান রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে ভোলার চরফ্যাশন, বরগুনার আমতলী, চট্টগ্রামের বাঁশখালী এবং কক্সবাজারের পেকুয়ার কমিউনিটি ভিশন কেন্দ্রগুলোয় ভার্চুয়ালি সংযুক্ত ছিলেন। সেখানে তিনি উপকারভোগীদের সঙ্গে পরে মতবিনিময়ও করেন।

৪৫টি কমিউনিটি ভিশন সেন্টার উদ্বোধনের পর শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এর আগে দুই ধাপে ৯০টি কেন্দ্র উদ্বোধন করেছেন এবং সব মানুষকে বিনা মূল্যে আধুনিক ও উন্নত চক্ষু চিকিৎসার আওতায় আনার জন্য পর্যায়ক্রমে সারা দেশে কমিউনিটি ভিশন সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা তার সরকারের রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কমিউনিটি ভিশন সেন্টার থেকে চিকিৎসা নিয়ে অনেকেই অন্ধ হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন হাওলাদার।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা কমিউনিটি ভিশন সেন্টারের কার্যক্রম সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেন।

অনুষ্ঠানে কমিউনিটি আই ভিশন সেন্টার থেকে বিনা মূল্যে চোখের চিকিৎসা প্রদানসংক্রান্ত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

কমিউনিটি ভিশন সেন্টার থেকে এ পর্যন্ত ১৩ লাখ ৩১ হাজার ৫৭৭ ব্যক্তি চোখের চিকিৎসা নিয়েছে এবং ২ লাখ ১০ হাজার ৮৬৮ জন কেন্দ্র থেকে বিনা মূল্যে চশমা পেয়েছেন।

আ.লীগ নিজে কী পেল তা নিয়ে কখনো ভাবে না : প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণের জন্য কাজ করে তার দল কী পেল, তা নিয়ে কখনোই ভাবে না; বরং জনগণের কল্যাণে তারা কী করতে পারে, তাই বিবেচনা করে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় উদ্বোধনকালে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ ও এর জনগণের জন্য কী করতে পারলাম তা বিবেচনায় আমরা ১৪ বছরে দেশ ও এর জনগণের ভাগ্যের ব্যাপক পরিবর্তন করেছি।’ তিনি গতকাল সকালে তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি আওয়ামী লীগের এ কার্যালয় উদ্বোধন করেন।

আওয়ামী লীগকে গণমুখী দল হিসেবে আখ্যায়িত করে সরকারপ্রধান বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময় জনগণের পাশে থাকবে। তার সরকার ও দলের নেতা-কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ১৪ বছরে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে এবং জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবাসহ সব ধরনের পরিষেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। তার দলকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনায় দেশবাসী ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত