নায়করাজের ৮২তম জন্মদিন তিন নায়িকার প্রথম স্মৃতি

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০৭:০৫ এএম

আজ ঢালিউডের সর্বকালের সেরা নায়ক রাজ্জাকের জন্মদিন। প্রায় অর্ধযুগ হয়ে গেল তিনি এই পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তার অসামান্য শিল্প সৃজন আজও তাকে অমর করে রেখেছে। নায়করাজের ৮২তম জন্মদিনে তার সঙ্গে প্রথম স্মৃতির ডালা মেলে ধরেছেন তার তিন জনপ্রিয় নায়িকা। কথা বলেছেন মাসিদ রণ

বেহুলা’ না হলে নায়করাজ

হতে সময় লাগত

সুচন্দা

আমার সঙ্গেই রাজ্জাক সাহেবের সিনেমার পথচলা। জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ সিনেমা দিয়ে তিনি নায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। আমি অবশ্য তার কয়েক বছর আগেই সিনেমা জগতে এসেছি। ততদিনে বেশ নামডাকও হয়েছে। এখনো মনে আছে, বেহুলার প্রথম দিনের শ্যুটিংয়ে যখন রাজ্জাক সাহেব সেটে এলেন, সেদিন তিনি খুব নার্ভাস ছিলেন। আমার সঙ্গে খুব একটা সহজ হতে পারছিলেন না। আমি সেটা বুঝতে পারি। একটা সময় আমিও তো নতুন ছিলাম। শুধু আমি কেন? প্রতিটি শিল্পীর ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে সিনিয়র শিল্পীদের সঙ্গে শ্যুটিং অভিজ্ঞতা এমনই হয়। যাই হোক, শ্যুটিংয়ের আগে উনাকে আমি কাছে ডাকি। এরপর আমরা এটা ওটা নিয়ে গল্প করি। একটা সময় তিনি কিছুটা সহজ হয়ে ওঠেন। এরপর আমরা শ্যুটিং করি। ‘বেহুলা’ মুক্তির পর তো বাকিটা ইতিহাস। সুজাতা আপার ‘রূপবান’, কবরীর ‘সুতরাং’, আমার ‘বেহুলা’ ও ‘আনোয়ারা’ ছবিগুলোর আকাশছোঁয়া সফলতাই তো বাংলা সিনেমার ভিত মজবুত করে। এসব ছবি দিয়ে আমরা রীতিমতো পাকিস্তানি শাসক ও উর্দু ছবির প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হয়েছিলাম। রাজ্জাক ভাইয়ের প্রসঙ্গে ফিরি। তার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ২০টির মতো সিনেমা করেছি। তবে বেহুলা না হলে নায়করাজ হতে সময় লাগত। দর্শকের মতে, আমার সঙ্গেই প্রথম সফল জুটি গড়ে ওঠে তার। দর্শকরা খুব চাইত যেন আমরা বিয়ে করি (হা হা হা)। আমার সেরা ছবি, ইনফ্যাক্ট বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সেরা ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’তেও আমি আর রাজ্জাক সাহেব একসঙ্গে কাজ করেছি। সেই ছবির জন্য প্রথম এবং একমাত্র অভিনেত্রী হিসেবে আমি মস্কো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাই। আজও মাঝেমধ্যে তাকে মনে পড়ে। তার স্ত্রী লক্ষী ভাবি ফোন করেন। আমরা সুখ-দুঃখের সঙ্গী।

একসঙ্গে ৩০টির বেশি ছবি করেছি

অঞ্জনা

রাজ্জাক ভাই সিনেমা জগতে আমার অন্যতম শিক্ষক। তবে দর্শক জানে আমরা রোমান্টিক জুটি। একসঙ্গে ৩০টি বেশি ছবি করেছি, ইটস নট এ ম্যাটার অব জোক। তারমধ্যে প্রথম সিনেমাটিই ছিল সুপার ডুপার বাম্পার হিট। প্রয়াত পরিচালক আজিজুর রহমানের ছবিটিরি নাম ‘অশিক্ষিত’। এর আগে আমি কয়েকটি ছবি করলেও প্রথম সারির নায়িকার দৌড়ে পিছিয়ে ছিলাম। রাজ্জাক ভাইয়ের বিপরীতে অশিক্ষিত ছবিতে আমাকে নির্বাচন করেন পরিচালক, মিউজিক ডিরেক্টর সত্য সাহা এবং গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার। পরে রাজ্জাক ভাইকে আমার কথা বলার পর তিনি বলেন, ‘ঠিক আছে, অঞ্জনাই আমার সঙ্গে ছবিটি করবে। শুনলাম সে সেতু ছবিতে ভালো কাজ করেছে।’ তিনি তখন সুপারস্টার। তার সঙ্গে কাজ করা মানে আর পেছনে ফিরতে হবে না। আমার ক্ষেত্রেও তাই হলো, আমি সৌভাগ্যবান। উল্লেখ করে রাখি, সেতু ছবিতেও রাজ্জাক ভাই ছিলেন, তবে তার নায়িকা ছিলেন শাবানা আপা। আমার বিপরীতে ছিলেন বুলবুল আহমেদ। রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় ওই অশিক্ষিত ছবিতেই। আর প্রথম শ্যুটিং ছিল কালজয়ী গান ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে’র। ফার্মগেটে শ্যুটিং শুরু হয় সন্ধ্যার পর। আমি তো ভয়ে কুঁকড়ে আছি। বিষয়টি জানতে পেরে রাজ্জাক ভাই আমাকে তার কাছে ডাকলেন। তার কাছে যেতেই আমাকে হাগ করলেন। সেই আলিঙ্গনের মধ্যে কী যে একটা নির্ভরতা ছিল বলতে পারব না। পরে বললেন, কী আমাকে দেখে মনে হচ্ছে যে আমি অনেক সিনিয়র নায়ক? তুমি নেচে বাংলাদেশ মাতিয়েছ, আর আমাকে ভয় পাচ্ছ? পেছনের সব ভুলে যাও। মনে করো আমি তোমার প্রেমিক। ব্যস ভয় কেটে গেল। ফজরের আজানের আগেই পুরো গানের শ্যুটিং শেষ করলাম। তার পরিচালনায় ‘অভিযান’ ছবিতেও কাজ করেছি। সেই ছবির ‘বাবা রে বাবা কই দিলা বিয়া’ গানটিও এখনো মানুষের মুখে ফেরে।

তিনি ছিলেন শিক্ষকের মতো

রোজিনা

শিল্পী হিসেবে রাজ্জাক ভাই কেমন সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাকে নিয়ে বলার ভাষাও খুঁজে পাচ্ছি না। তবে এটুকু বলতেই হয়, তিনি আমার একজন শিক্ষক। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের সত্যিকার কিংবদন্তি, নায়কদের রাজা। তার মতো মানুষের অবদানেই আজকের এই ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রি। যতদিন বাংলা সিনেমা থাকবে ততদিন তিনি থেকে যাবেন দর্শকের মনে। শাবানা-কবরীকে দেখেই নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন জাগে। স্কুল পালিয়ে সিনেমা হলে তাদের ছবি দেখতাম। আর সেই সব ছবিতে নায়ক থাকতেন রাজ্জাক ভাই। পরে যখন সিনেমা জগতের সঙ্গে যুক্ত হলাম তখন শুরুতে তার বোনের চরিত্রে কাজ করেছি। সব মিলিয়ে ১২টির মতো ছবি একসঙ্গে করেছি। এরমধ্যে তার পরিচালিত দুটি ছবিও রয়েছে ‘অভিযান’ আর ‘রাজা মিস্ত্রী’। এছাড়া সিদ্ধান্ত, আয়নাসহ বেশ কিছু ব্যবসাসফল সিনেমা রয়েছে। প্রথম যেদিন তার সঙ্গে শ্যুটিং করি, সেদিন কাজ হয়েছিল এফডিসির ১ নম্বর ফ্লোরে। একদিনেই তার সঙ্গে আমার চারটি সিকোয়েন্স ছিল। আমি নতুন শিল্পী হিসেবে সাধ্যমতো রিহার্সেল করেছি। কিন্তু যখনই তার সঙ্গে ক্যামারের সামনে দাঁড়ালাম সব সংলাপ ভুলে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। তখন রিলে শ্যুটিং হয়, অনেক খরচের ব্যাপার। তারমধ্যে রাজ্জাক ভাইয়ের মতো সুপারস্টারের সময়ের অনেক দাম। কিন্তু তিনি একটুও রাগ করলেন না, বিরক্তও হলেন না। আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে সাধারণ অনেক কথাবার্তা বললেন। আমাকে সহজ করে ফেললেন। এরপর আমরা কাজটি ভালোভাবে শেষ করি। এই যে তার শিক্ষকসুলভ আচরণ, এটা পরে আমিও নতুন শিল্পীদের সঙ্গে অ্যাপ্লাই করেছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত