দেশের জুতার বাজারে সুপরিচিত ব্র্যান্ড ‘লোটো বাংলাদেশ’। ইতালি ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এক্সপ্রেস লেদার প্রডাক্ট লিমিটেডের অধীনে গড়ে ওঠে ব্র্যান্ডটি। বর্তমানে ডলার সংকটের কারণে বিরূপ পরিস্থিতিতে থাকা দেশের ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ে কথা বলেছেন এক্সপ্রেস লেদার প্রডাক্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জামিল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার ফারজানা লাবনী
২০২২ সালের শুরুতে করোনার প্রাদুর্ভাব কিছুটা কমে আসায় হঠাৎ করে বিশ^বাজারে কাঁচামালের চাহিদা বেড়ে যায়। সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। এই সংকট আরও প্রকট করে তোলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। আমদানি ঘাটতি ব্যাপক হারে বাড়তে থাকায় ডলারের তীব্র চাহিদা তৈরি হয়। পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ না থাকায় প্রায় ২৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয় টাকার। বৈদেশিক মুদ্রার অপ্রতুলতায় সরকার আমদানি সীমিত করার উদ্যোগ নেয়। এতে করে অনেক কোম্পানি কাঁচামাল আমদানি করতে না পারায় উৎপাদন টিকিয়ে রাখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে।
অন্যান্য কোম্পানির মতো দেশের জুতার বাজারে অন্যতম ব্র্যান্ড লোটো বাংলাদেশও বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে লোটো বাংলাদেশের মালিকানাধীন কোম্পানি এক্সপ্রেস লেদার প্রডাক্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী জামিল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের বাজার। এদেশের ব্যবসার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে এটা সত্য। এসব সমস্যার মধ্যেই এতদিন ব্যবসা চালিয়ে এসেছি। কিন্তু এখন! আমার তো মনে হয় প্রকৃত সংকটের চেয়ে প্রচার বেশি হচ্ছে। ব্যাংকে টাকা নেই, সঞ্চয়পত্র ভেঙে খাচ্ছে সকলে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে না এসব কথাবার্তার সবটা কি সঠিক? আমি মনে করি সব ঠিক নয়। এর অনেক কিছুই অপপ্রচার। খতিয়ে দেখা উচিত এসব প্রচারে কে বা কারা লাভবান হচ্ছে।
জামিল বলেন, আমরা প্রকৃত ব্যবসায়ী। খেটে ব্যবসা করি। আমরা চাই, দেশে ব্যবসাবাণিজ্যের বিকাশ হোক। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারাই লাভবান হচ্ছে যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে পারছে। এসব ব্যক্তিই দেশ থেকে আয় করে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখুন এদের কানাডার বেগমপাড়ায় কয়টা বাড়ি আছে, গোপনে অর্থ পাঠিয়ে কোন দেশে কী পরিমাণ জমিয়েছে!
সাক্ষাৎকারে কাজী জামিল ইসলাম জানান, গত এক যুগ থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন। এ দেশের চামড়ার গুণগত মানের জন্য বিশ্ববাজারে চাহিদা রয়েছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে চামড়া সংগ্রহ করে কারখানায় জুতা বানানো শুরু করেছেন। স্বল্প পরিসরে একটি শোরুম দিয়ে যাত্রা হয় প্রতিষ্ঠানটির। ক্রেতাদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় দেশব্যাপী ছড়িয়ে যায় এ ব্যবসা। একসময় ইতালিয়ান কোম্পানি লোটো বাংলাদেশে ব্যবসায়ে আগ্রহী হয়। ব্যবসায়িক আলোচনার পর উভয়পক্ষের সম্মতিতে এক্সপ্রেস লেদার প্রডাক্ট লিমিটেড এবং লোটো কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে নতুন যাত্রা শুরু হয়। গড়ে ওঠে লোটো বাংলাদেশ ব্র্যান্ড। একে একে রাজধানীতে ছয়টি, খুলনায় দুটি, সিলেটে দুটি ও চট্টগ্রামে দুটি শোরুম গড়ে তোলা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে লোটো ব্র্যান্ডের পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে।
তিনি বলেন, ভালোই বিক্রি হচ্ছিল। গত বছর সারা দেশে লোটো ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রির জন্য এক্সপ্রেস লেদার প্রডাক্ট লিমিটেডের ২০০টি নিজস্ব শোরুম ছিল। এ বছর তা বেড়ে ২২০টি হয়েছে। এত দিন যা উৎপাদন করেছি তা দিয়েই চলেছি। কিন্তু পণ্যের মজুদ শেষের দিকে। এবার নতুন পণ্য উৎপাদনে যেতে হবে। কাঁচামাল প্রয়োজন। কিন্তু এলসির অনুমতি না পাওয়ার কারণে কাঁচামাল আনতে পারছি না। কাঁচামাল ছাড়া কীভাবে নতুন পণ্য উৎপাদন করব? প্রশ্ন এই ব্যবসায়ীর।
কাজী জামিল ইসলাম বলেন, পণ্য উৎপাদন না করতে পারলে ব্যবসায়ের খরচ কীভাবে চালাব? কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কীভাবে দেব? পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে, মানে এলসি খুলতে না পারলে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।
তিনি জানান, বিভিন্ন ধরনের জুতা, বিশেষভাবে স্পোর্টস সু ব্যাগ, পোশাকসহ চামড়াজাত বিভিন্ন ধরনের পণ্য লোটোর শোরুমে পাওয়া যায়। বর্তমানে এক হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো থাকলে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে ব্যবসা এগিয়ে যেত। কিন্তু বর্তমান ধারা চলতে থাকলে কী হবে বলা যাচ্ছে না জানান তিনি। বর্তমানে জুতা-স্যান্ডেলের বাজারের ২০ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠানটির আওতায় রয়েছে বলে দাবি করেন এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে অনেক ডিজাইনার কাজ করলেও কাজী জামিল ইসলাম নিজেই লোটো বাংলাদেশের অনেক পণ্যের ডিজাইন তৈরি করেন জানিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের হালচাল বিবেচনায় পণ্যের ডিজাইন করি। আবার দেশীয় সংস্কৃতি যাতে হারিয়ে না যায়, সে বিষয়টিও মাথায় রাখি। বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। ইন্টারনেটে সারা দুনিয়ার হালচাল জানা যায়।
মীনা বাজার, আগোরা, স্বপ্ন, বাটাসহ একাধিক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ কাজী জামিল ইসলাম গড়ে তোলেন জুতা খাতের এ প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠানটি লোটো বাংলাদেশ ব্র্যান্ডে জুতা ও স্পোর্টস পণ্যসহ চামড়াজাত বিভিন্ন পণ্যের বাজারে খ্যাতি অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, ব্যবসায় এগিয়ে যেতে হলে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্রেতা টার্গেট করে পণ্য বিক্রি করতে হবে। এতে সফলতা আসবে। লোটো বাংলাদেশ এ দেশের তরুণ সমাজকে সামনে রেখে গড়ে তোলা হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পণ্যের গুণগত মানে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় প্রচার তার পণ্যের মান। রুচিশীল ও টেকসই পণ্য হলে ক্রেতা বাড়বে। এভাবেই নিজের প্রতিষ্ঠানের অবস্থান তুলে ধরেন কাজী জামিল ইসলাম।
এই ব্যবসায়ী বলেন, পণ্যের গুণগত মানের বিকল্প নেই। তাই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্রেতার জন্যও গুণগত মানের আধুনিক রুচিশীল পণ্যটি তৈরির চেষ্টা করি। এ দেশের তরুণ-তরুণীরা বেশিরভাগই সচেতন। গুণগত মানের পণ্য না হলে ক্রেতা পাওয়া যাবে না। সফল এ ব্যবসায়ী বলেন, যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে প্রয়োজন মানবসম্পদ। এ দেশে শ্রমিকের অভাব নেই, তবে দক্ষ শ্রমশক্তির অভাব রয়েছে। দেশকে এগিয়ে নিতে এ বিষয়ে নজর দিতে হবে সরকারকে।
