বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মায়ের চেয়ে ছেলে বড় অবশ্যই সম্ভব

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০৯ পিএম

সিনেমাতে ও বাংলাদেশের এনআইডিতে মায়ের চেয়ে ছেলে বড় অবশ্যই সম্ভব।

১০৬টি অ্যাপিসোডে সমাপ্ত আমেরিকার এনবিসি টেলিভিশনের ফ্যামিলি ড্রামা ‘দিস ইজ আস’। পিয়ারসন পরিবারের বড় বড় তিনটি সন্তান কেভিন, কেইট এবং র‌্যান্ডেল; তাদের বাবা জ্যাক পিয়ারসন এবং মা রেবেকা পিয়ারসন। রেবেকা আসলে অভিনয় এবং সংগীতে খ্যাত ম্যান্ডি মুর। তার জন্ম ১০ এপ্রিল ১৯৮৪। তার ব্যক্তি জীবনে দুটি ছেলে। ছোটটির জন্ম হয়েছে ২১ অক্টোবর ২০২২। আর সিনেমার ছেলে কেভিন আসলে জাস্টিন হার্টলে, তার জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৭, মায়ের চেয়ে সাত বছরের বড়। কেইট একটু মোটাসোটা। বাস্তব জীবনে অভিনেত্রী ও গায়ক ক্রিস্টিন মিশেলের জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮০, ক্রিস্টিনও মায়ের চেয়ে ৪ বছরের বড়। আর র‌্যান্ডেলের প্রকৃত নাম র‌্যান্ডেল হিল, কালো আমেরিকান, জন্ম ৩০ আগস্ট ১৯৮০; পিয়ার্সন পরিবার তাকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে। র‌্যান্ডেলও মায়ের চেয়ে ৪ বছরের বড়।

জন্ম-তারিখ ধরে হিসাব করে দেখুন সিনেমার কেভিন কেইট ও র‌্যান্ডেল, রেবেকার গর্ভজাত পুত্র, গর্ভজাত কন্যা এবং দত্তক গৃহীত পুত্র তিনজনই মায়ের চেয়ে বয়সে বড়। সোজা কথা সিনেমায়, নাটকে সন্তান মায়ের চেয়ে বেশি বয়স্ক হতেই পারে। সিনেমার মায়ের বা বাবার সঙ্গে সন্তানের বয়সের হাস্যকর ব্যবধান থাকতেই পারে। এজন্যই তো সিনেমা আর নাটক।

‘রাইডিং ইন কারস উইথ বয়স’ সিনেমার মা ড্রু ব্যারিমুরের বয়স ২৬ বছর আর ছেলে অ্যাডাম গার্সিয়ার ২৮। ‘ব্লো’ সিনেমায় অভিনয়ের সময় মা র‌্যাচেল গ্রিফিথ ৩২ বছর বয়সী ছিলেন আর তার ছেলে জনি ডেপ তখন ৩৭। যখন বিখ্যাত সিনেমা হ্যামলেট মুক্তি পায় তখন হ্যামলেটের ভূমিকায় অভিনয় করা লরেন্স অলিভিয়ার ছিলেন ৪১ আর তার মা ডেনমার্কের রানি এইলিন হার্লের বয়স তখন ৩০ বছর। মাকে ছেলের চেয়ে বড় হতেই হবে সিনেমাতে এই বাধ্যবাধকতা নেই। আর একটি উদাহরণ না দিলেই নয়। ডাক ফাটানো সিনেমা আলেকজান্ডারে মা অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ২৯ বছর। এখানে জীববিজ্ঞানের আইন মেনে তার পুত্র কলিন ফ্যারেন মাকে ডিঙাতে চেষ্টা করেননি। তার বয়স ২৮ বছর। মা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান ১ বছর। সিনেমায় যতটুকু খোঁজ করেছি তাতে ছেলে মায়ের চেয়ে সর্বোচ্চ ১১ বছরের বড়। গঞ্জিকা সেবন করেই মাকে ছেলের চেয়ে কতটা বড় করা সম্ভব?

শিঙাড়া-সমুচা-চা-চপ সূচকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় যেমন পৃথিবীকে হারিয়ে দিয়েছে, তেমনি হারিয়েছে বয়সের মহামারপ্যাঁচে। রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে তৈরি করা জাতীয় পরিচয়পত্র ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ডে (এনআইডি) ছেলে তার মায়ের চেয়ে ১৩ বছরের বড়। শৈশবে পাকামি করার কারণেই হোক কি অতি স্নেহপ্রবণ হয়ে হোক বাবা-মা ছেলের নাম রেখেছেন পাকু। প্রকৃত বয়স এবং বেশি আই কিউজনিত মানসিক বয়সের কিছু তারতম্য হয়েই থাকে। নিজের প্রকৃত বয়স ৫ বছর বুদ্ধিমত্তা তাকে ১০-এর সমকক্ষ করে দিতে পারে। কোনো বিশেষ গুণের কারণে পাকু নিজেকে ছাড়িয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ভাইবোনদের ছাড়িয়ে এমনকি গর্ভদাত্রী মাকেও ছাড়িয়ে তার চেয়ে ১৩ বছর ৪ মাস এগিয়ে গেলেনতার জবাব দিতে পারে শুধু এনআইডি কর্তৃপক্ষ।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, পাকু দাসের মা রাধারানী দাশের জন্ম ৩ আগস্ট ১৯৬৮। আর তার গর্ভজাত পুত্র পাকু দাশের জন্ম ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড অনুযায়ী ২০ এপ্রিল ১৯৫৫, মায়ের জন্মেরও ১৩ বছর ৩ মাস ১৪ দিন আগে। শুধু যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি বলে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে বাংলাদেশের নাম ওঠার আর একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল। পাকু দাশ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ২০২২-এর ৩০ অক্টোবর আরও কিছুসংখ্যক কর্মচারীর সঙ্গে তিনি চাকরি হারান। তার চাকরি হারানোর কারণ সরকার বিরোধিতা বা ভিন্ন মতাবলম্বী হওয়া নয়, এমনকি অবৈধ অনুপস্থিতি বা ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিংসের সুপারিশের কারণেও নয়। চাকরি হারানোর কারণটি অত্যন্ত ন্যায়সংগত সুপার অ্যানুয়েশন। সময়মতো তার এনআইডি চেক করা হলে আরও আগেই তাকে বিদায় হতে হতো। চাকরি করার বিধিবদ্ধ যে চূড়ান্ত বয়স অর্থাৎ ৫৯ তিনি তা পেরিয়ে গেছেন। সুতরাং আর কত! এবার বিদায় নিন। কিন্তু ৫৯ হলোই বা, বিদায় নিতে হবে কেন? বাংলাদেশে কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে চাকরিকাল তো ৬৭ বছর। পাকু দাশ যদি সে রকম পদে অধিষ্ঠিত থাকতেন তাহলেও তাকে আরও আগে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হতো। মায়ের আগে জন্ম নেওয়া পাকু দাশের বেলায় চাকরিচ্যুতি মানে শুধু বেতন হারানো নয়, চাকরির কারণে পাওয়া বাসাটিও হারানো। কিন্তু তাকে দেখলে কি ঊনষাট মানে ষাট ছুঁই ছুঁই মনে হয়। দেখে যা মনে হয় সেটা মেনে নিলেই ঝামেলা চুকে যেত। কিন্তু তা হওয়ার নয়।

এনআইডি পাওয়ার মতো মহাসম্মানজনক ঘটনা তখনো ভারতে ঘটেনি। ভারতে নিম্ন আদালতের একটি মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছায়। শ্যাম কিশোর ঘোষ ভারত কয়লা লিমিটেডের কর্মচারী। শ্যাম কিশোরের দাবি, তার সার্ভিস বইতে বয়স বেশি লেখা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট অনেক বিচার বিবেচনার পর রায় দিয়েছে বানান ভুল সংশোধন করার সুযোগ আছে, কিন্তু চাকরি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সার্ভিস রেকর্ডে লিখিত বয়স এমনকি যদি ভুলও হয়ে থাকে সংশোধনের আর সুযোগ নেই। আবেদনকারীকে যত তরুণই মনে হোক না কেন সার্ভিস রেকর্ডের বয়সই তার স্বীকৃত বয়স। বাংলাদেশে অবশ্য কোনো সচিবও নির্ধারিত মেয়াদের চেয়ে বছর দু-এক বেশি চাকরি করার সময় ধরা পড়ে যান। পাকু দাশ ভাগ্যবান, তার ওপর মিডিয়ার আলো পড়েছিল বলে এনআইডি কর্তৃপক্ষ তার বয়স কমিয়ে সংশোধিত এনআইডি ইস্যু করে দিয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও পাকু দাশকে পূর্ব পদে বহাল করেছে। কিন্তু কোন অবস্থায় তাকে মায়ের চেয়ে বড় বানানো হলো, আবার কেমন করে মায়ের চেয়ে ছোট হয়ে গেলেন এ নিয়ে কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি, পেলে ভালো হতো। পাকু দাশের কর্মজীবনে প্রত্যাবর্তনকে অবশ্যই স্বাগত। এ ধরনের পাকু দাশ কেইস আরও থাকার কথা। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার সংস্থায় যারা চাকরি করছেন নিঃসন্দেহে সবাই এনআইডিধারী। এনআইডির ভুল সংশোধনেরও সুযোগ রয়েছে। যদি পাকু দাশের বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে তো ১৯৫৫ সালের জন্ম-তারিখ নিয়ে তার চাকরিই পাওয়ার কথা নয়। তিনি কবে চাকরিতে ঢুকেছেন? ২০০০ সালেই তো তার বয়স ৪৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ার কথা। এনআইডি এসেছে আরও অনেক পরে সন্দেহ নেই। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রুলিং অনুসরণ করলে চাকরিজীবীর বেলায় আদালতের আদেশ ছাড়া বয়স বাড়ানো কিংবা কমানো কিংবা সংশোধনের সুযোগ নেই। জন্মের প্রকৃত তারিখ যাই হোক বয়সটাকে কমিয়ে রাখার প্রবণতাই বেশি। আমি বাড়িয়ে নেওয়ার বেশ কটা ঘটনার সঙ্গেও পরিচিত। যেসব প্রতিষ্ঠানে পৌষ্যের চাকরি পাওয়ার অগ্রাধিকার রয়েছে, সেখানে পড়াশোনায় অনাগ্রহী ১৬ বছরের ছেলে বা মেয়েকে ১৮ দেখিয়ে বাবার অফিসে ঢুকিয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টির জন্য স্কুল রেজিস্টারে বয়সটা বেশিই লেখা হয়। আবার দুবছর কম লেখা হলে সরকারি চাকরিতে দুবছর বেশি চাকরি করার সুযোগটাও নেওয়া যায়। দুটোরই কিছু লাভজনক দিক রয়েছে। ভারতে বয়স নিয়ে বেশ কটা মামলার সুনির্দিষ্ট রুলিং রয়েছে। একটি মামলা সুনীল কুমার বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া নামের বানান সংশোধন বিষয়ে, এতে সংশোধিত বানান গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বয়সের কারণে সুনির্দিষ্ট কোনো সুযোগ না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় বর্ণবাদের মতো বয়সবাদ (এজিজম)। ১৯৬৯ সালে রবাট নিল বাটলার বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি বৈষম্য বোঝাতে ‘এজিজম’ টার্মটি ব্যবহার করেন। বয়স্করা তরুণদের যে নিপীড়ন করে থাকে তাকেও এজিজম বলা হয়েছে। বয়সের কারণে পক্ষপাত বোঝাতে সর্বদাই যে তরুণ পছন্দনীয় তা নয়, বয়স্কের প্রাধিকার মেলে তবে তা তুলনামূলকভাবে কম। বয়স্করা এখন এমনকি ইউরোপ-আমেরিকাতেও ডিজিটাল এজিজমের শিকার। তরুণরা দক্ষতার সঙ্গে ডিজিটাল যুগে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে, বুড়োরা পারেনি। সুতরাং তারা মার খেয়ে যাচ্ছে। বয়স-বৈষম্যের কথা বেশি শোনা যায় হলিউডেসুন্দরী নায়িকা কিংবা স্মার্ট নায়কের বয়স বেড়ে গেছে, তাদের আর নায়িকা নায়ক ভূমিকায় রাখা যায় না। তিন ধরনের এজিজমের কথা বলা হয়; প্রাতিষ্ঠানিক বয়স-বৈষম্যবাদ নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে রাখা; আন্তব্যক্তিক বয়স-বৈষম্যবাদ : সমাজ জীবনে বয়স্করা প্রায়ই বৈষম্যের শিকার হন; আত্মীকৃত বয়স-বৈষম্যবাদ : এতে ব্যক্তি নিজেই বয়স-বৈষম্যবাদে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং নিজের ওপর তা প্রয়োগ করতে থাকেন।

একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনের জন্য বিতর্কিত হেনরি কিসিঞ্জার ২৭ মে ২০২৩ শতবর্ষ পূর্ণ করবেন। ৯৯ বছর বয়সে প্রকাশ করেছেন একটি বহুলালোচিত গ্রন্থ : লিডারশিপ : সিক্স স্টাডিজ ইন ওয়ার্ল্ড লিডারশিপ। বয়স-বৈষম্যবাদ তিনি অবলীলায় ডিঙিয়ে গেছেন। ৮৯ বছর বয়সে সোপোক্লেস রচনা করেছেন ইডিপাস অ্যাট কোলোনাস। ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যুর দিনই ভোরে গ্যালিলিও নতুন বৈজ্ঞানিক প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। বেনিয়ামিন ফ্রাঙ্কলিন পাবলিক সার্ভিস থেকে অবসর নেন ৮২ বছর বয়সে। রোলান্ড রেগান ৭০ বছর বয়সে যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, পত্রিকা শিরোনাম করেছিল লাইফ বিগিনস অ্যাট সেভিন্টি। তিনি আরও ৮ বছর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তিনি সবচেয়ে সফল প্রেসিডেন্টদের একজন। হেনরিক ইবসেন ৭১ বছর বয়সে নাটক লিখেছেন : যখন আমরা মৃতেরা জেগে উঠব; অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস ৯২ বছর বয়সে গ্রিক ভাষা শিখে প্লেটোর রচনাবলি পড়তে শুরু করেন। হোয়াট শি শুড নট জর্জ বার্নার্ড শ লিখেছেন ৯৪ বছর বয়সে। বয়স যখন প্রায় পঁচাশি আইজ্যাক নিউটন রয়াল মিন্টের ওয়ার্ডেনের দায়িত্ব পালন করছেন।

তাদের সবাই নিজ গুণে বয়স-বৈষম্যবাদকে ডিঙ্গিয়ে যেতে পেরেছেন। ব্রাজিলের ওয়াল্টার অর্থমান একই কোম্পানিতে ৮৪ বছর ৯ দিন চাকরি করে বিশ^রেকর্ড করেছেন, গিনেসের রেকর্ড বইতে তার নাম উঠেছে। তিনি শতবর্ষী। ১৫ বছর বয়সে চাকরিতে ঢুকেছিলেন। বুড়ো বয়স নিয়ে অস্বস্তি বোধ করার কারণ নেই। সিনিয়র সিটিজেনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫-এ পৃথিবীর ১৮ ভাগ মানুষ সিনিয়র সিটিজেন (৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব)। ২০৩০ নাগাদ এই সংখ্যা ৯৭৪ মিলিয়নে পৌঁছাবে। ওল্ড বয়স এবং ওল্ড গার্লস ক্লাবই হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাব।

গৌরবের ওল্ড বয়েস ক্লাব মায়ের চেয়ে বয়সে বড় একজন পাকু দাশকে ধরে রাখতে পারল না।

লেখক: সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত