অতীতেও জানুয়ারি মাস এলেই পাঠ্যপুস্তক নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু সেই সমালোচনাগুলোর মোটাদাগে বিষয় ছিলঅশুদ্ধ বানান, ছাপার মান, টুকটাক তথ্যগত ভুল, প্রধানমন্ত্রীর বাণী ও ছবি ব্যবহার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে নির্দিষ্ট কিছু লেখকের লেখা বাদ দেওয়া প্রভৃতি। ২৩ সালে নতুন ও পুরাতন শিক্ষাক্রমে আগের সব সমালোচনা করার মতো বিষয় বর্তমান আছে। কিন্তু এবার সব আলোচনা আর সমালোচনা গিয়ে ঠেকেছে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান অনুশীলন ও ইতিহাস এবং সামাজিক বিজ্ঞান বই দুটি নিয়ে। বিশেষ করে বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ে ‘চৌর্যবৃত্তি’ এবং ‘বিবর্তন তত্ত্ব’কে কেন্দ্র করে। আর এদিকে, চৌর্যবৃত্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মূলধারার গণমাধ্যম সরগরম আলোচনায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও হাসিনা খান ভুল স্বীকার করে বিবৃতি পর্যন্ত দেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দেশে পাঠ্যপুস্তক ‘রচনার’ এযাবৎকালের প্রক্রিয়া কেমন ছিল? পাঠ্যপুস্তক কি সম্পূর্ণ লেখকরা রচনা করে থাকেন? পাঠ্যপুস্তক কতটুকু রচনা আর কতটুকু সংকলিত ও সম্পাদিত ছিল, তা আমরা কখনোই ভেবে দেখিনি। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণির বাংলা বই পুরোটাই সংকলিত ও সম্পাদিত। বইয়ের শুরুতে যে ‘লেখক’দের নাম দেওয়া থাকে তাদের কারও কবিতা, গদ্য, গল্প লেখা থাকে না। যাদের লেখা থাকে তারা হলেন বাংলা ভাষাসহ অন্য ভাষার প্রধানতম কবি, সাহিত্যিকের। কিন্তু কবিতা-গদ্য-গল্প-নাটক না লিখেই এসব লেখক পাঠ্যপুস্তক রচয়িতার মর্যাদা ভোগ করছেন দিনের পর দিন! কই স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে কাউকেই তো এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখিনি! কেউ তো বলেনি তারা সংকলনকারী ও সম্পাদক, রচয়িতা নন! আর আমাদের সংকলনকারী সম্পাদকদেরও নৈতিকতা বা সততার বালাই নেই। তারা নিজেরাও সংকলনকারী-সম্পাদক পরিচয় না দিয়ে রচনাকারী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে থাকেন। অনেকে তো পাঠ্যপুস্তকে নিজের নাম লেখা পৃষ্ঠা বা লেখক হিসেবে সরকারি চিঠির ছবি তুলে ফেইসবুকে দিয়ে আত্মশ্লাঘা প্রকাশ করেন।
বছরের পর বছর ধরে যেখানে সংকলিত বিষয় চলছে সেখানে, নতুন শিক্ষাক্রমে হুট করে বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ের কিছু অংশ ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ডট ওআরজি’ থেকে নিয়ে গুগল ট্রান্সলেটরে ভাষান্তর করে হুবহু ছাপিয়ে দেওয়াকে চৌর্যবৃত্তি বলা যায় কি? আমরা সদ্য শেখা প্লেইজারিজম শব্দটির যত্রতত্র ব্যবহার করছি না তো? প্রশ্ন দুটি উত্থাপন করার কারণ হচ্ছেআমরা আসলে রচনা, সংকলন ও সম্পাদনাকে এক করে দেখছি।
ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোর স্থানিক রূপ থাকে। প্রতিটি জনপদের ভিন্ন ভিন্ন গল্পগাথা, জন্মের ইতিহাস, নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। এগুলো প্রতিনিয়ত নির্মাণ হতে থাকে। বাংলাদেশে তো সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস নতুন করে লেখা হতে থাকে! কিন্তু প্রকৃতি বিজ্ঞান বা ন্যাচারাল সায়েন্সের ইতিহাস সাহিত্য বা সমাজবিজ্ঞানের পথে হাঁটে না। এদের থেকে উল্টো রথে চলে প্রকৃতি বিজ্ঞান। এর সৌন্দর্যই হলো এর কোনো স্থানিক রূপ নেই। মৌলিক পরমাণুর সংখ্যা, মাধ্যাকর্ষণ, জীবের বৃদ্ধি ও বংশগতি প্রভৃতি বিষয় দেশ, ব্যক্তিবিশেষ বা সময়ের হাতের ইশারায় চলে না। প্রকৃতি বিজ্ঞান চলে তার নিজস্ব নিয়মে। সমগ্র বিশ্বের বিদ্যালয়েই যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানে একই বিষয় পড়ানো হয়। চৌর্যবৃত্তি বলার আগে আর একটি বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন তা হলোপ্রতিটি মাধ্যমের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে, যা তাকে অন্য মাধ্যম থেকে পৃথক করে। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, গবেষণা নিবন্ধ, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এসবে লেখক তার সৃষ্টিকে নিজের বলে দাবি করতে পারেন। কিন্তু পাঠ্যপুস্তক রচয়িতাদের সেই সুযোগ নেই। এখানে সম্পূর্ণটাই দলগত কাজ। আর তা ছাড়া গবেষণা নিবন্ধে যেমন তথ্যসূত্র উল্লেখ করার সুযোগ আছে এবং আর সে কারণেই গবেষণা নিবন্ধে তথ্যসূত্র উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে তথ্যসূত্র উল্লেখ করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কেন তথ্যের উৎসের উল্লেখ করার সুযোগ নেই এবং তথ্যের উৎস প্রবর্তনের দাবি করার যৌক্তিকতা নেই সেই নিয়ে আলাপ জারি রাখা যায়। কিন্তু একে সরাসরি চৌর্যবৃত্তি কি বলার সুযোগ আছে?
বিগত বছরগুলোতে আমাদের দেশে বিশেষ করে বাংলা, সমাজ, বিজ্ঞান বইগুলো কতটুকু লেখক রচনা করেন? প্রায় সবই তো সংকলন করা। বরং ২০২৩ সালের নতুন শিক্ষাক্রমে পাঠ্যপুস্তক রচয়িতাদের খানিকটা খাটাখাটুনি গেছে। কিছু অংশ তারা নিজেরা মাথা খাঁটিয়ে লিখেছেন। এর আগ পর্যন্ত শিক্ষার ‘মান’ বাড়ানো বলতে আমাদের শিক্ষাবিদরা বুঝেছেন, উঁচু শ্রেণির বিষয়বস্তুকে খানিকটা আকারে ছোট করে নিচের শ্রেণিতে ঢুকিয়ে দেওয়া। গরুর সাইজ ছোট করে আঁকলেই বাছুর হয়ে যায় না, এটা তারা এত দিন বোঝেননি। বাছুরের অবয়ব স্পষ্ট করতে গেলে অপরিপক্ব দৈহিক গঠন, চকিত চাহনি, চপলতা সবকিছুই ফুটিয়ে তুলতে হয়; অনেক বিলম্বে হলেও শিক্ষাবিদরা তা বিবেচনায় নিয়েছেন। নতুন শিক্ষাক্রমে দেখলাম শিক্ষাবিদরা শিক্ষার্থীদের ধারণ ক্ষমতাকে বুঝতে আন্তরিক হচ্ছেন। আমার কাছে মনে হচ্ছে, সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান অনুশীলন বইয়ে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগকারীরা নিজেদের অজান্তেই লেখকদের পুরস্কৃত করে ফেলছে! কারণ, আমাদের দেশের পাঠ্যপুস্তক সংকলনকারী ও সম্পাদনকারীকে যদি পাঠ্যপুস্তক রচনাকারীর মর্যাদা দেওয়া হয় তবে; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা তলস্তয়কে কোথায় ঠাঁই দেব? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতীর ছাত্রদের জন্য নিজে পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছেন এবং অন্য সহযোগীদের দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একের পর এক পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছেন। এই পাঠ্যপুস্তক রচনার জন্য তাকে তৎকালীন সাহিত্যসমাজ থেকে কম তিরস্কার শুনতে হয়নি! বঙ্কিমচন্দ্র ঈশ্বরচন্দ্রকে নিছক জ্ঞান করতেন পাঠ্যপুস্তক প্রণেতা হিসেবে। আর আমাদের পাঠ্যপুস্তক সংকলনকারীরা কোনো কিছু রচনা না করেই রচনাকারীর মর্যাদা পায়! সৌভাগ্যবান আমাদের লেখকরা আর দুর্ভাগা দেশের শিক্ষার্থীরা।
লেখক : পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
