রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মিলছে ফল বাড়ছে সংখ্যা

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ০৬:১৮ এএম

১৯৯৮ সালের ২৩ জুলাই রাজধানীর মিন্টো রোডের মহানগর গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) কার্যালয়ে নির্যাতনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শামীম রেজা রুবেল মারা যান। এর জেরে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল যুগান্তকারী এক রায়ে ফৌজদারি কার্যবিধির বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার সংক্রান্ত ৫৪ ধারা এবং রিমান্ডে নিয়ে ১৬৭ ধারার অপ্রয়োগ রোধে ১৫টি নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা পরে আপিল বিভাগেও বহাল থাকে।

ধর্ষণ প্রমাণ করতে ভুক্তভোগীর ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ বিষয়ে জোরালো আপত্তি ছিল নারী অধিকারকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীদের। ২০১৩ সালে কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষে আইনজীবীরা হাইকোর্টে রিট করেন। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল এ পরীক্ষা নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট বলে, ধর্ষণ-প্রমাণে অযৌক্তিক এ শারীরিক পরীক্ষার কোনো বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি নেই।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ৫৪ ও ১৬৭ ধারার অপপ্রয়োগ হয়তো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে জনস্বার্থের এসব মামলার ফলে নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার বিষয়ে সুফল মিলেছে। ধর্ষণের ক্ষেত্রেও নিবর্তনমূলক শারীরিক পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে না ভুক্তভোগীকে।

রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ বা প্রশাসনের নীরবতা-নিষ্ক্রিয়তার পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বার্থের মামলার গুরুত্ব রয়েছে সারা বিশ্বে। জনমানুষেরও স্বার্থ, আগ্রহ রয়েছে। তারা বলেন, এ ধরনের মামলা এমন এক আইনি পদক্ষেপ, যা রাষ্ট্র বা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হলে, কার্যকরী না হলে ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার পথ তৈরি করে। নিখরচায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত হয় আদালতের রায়ে বা আদেশে।

উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে মামলা পরিচালনা করেন এমন আটজনের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদক। তারা বলেন, রিট মামলা ও জনস্বার্থের মামলা ভিন্ন কিছু না হলেও বিষয়বস্তুতে পার্থক্য রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, শ্রমিকের অধিকার, সাংবিধানিক ও আইনি ইস্যু, নারী অধিকার, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, নিরাপদ খাদ্য, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জলবায়ুর ক্ষতি, নদীদখল, শিক্ষা, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের দৈনন্দিন প্রয়োজন প্রভৃতি বিষয়ে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের নীরবতা-উদাসীনতার প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে। এসব বিষয়ে প্রায়ই প্রভাবশালীরা হস্তক্ষেপ করেন। তখন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠীর একমাত্র আশ্রয় উচ্চ আদালত।

জনস্বার্থবিষয়ক মামলার পরিসংখ্যান রাখার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এ দেশে নেই। দেশ রূপান্তরের চেষ্টায় গত ২৫ বছরে ১০টির মতো আইনি সংগঠন, মানবাধিকার ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠন এবং অন্যান্য সংগঠনের ৯১০টির মতো মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগতভাবে আইনজীবীরাও প্রায়ই মামলা করেন। বেশিরভাগ মামলায় উচ্চ আদালতের রায়, অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ ও রুল হয়েছে বলে আইনজীবীরা জানান। মামলা চালাতে গিয়ে প্রভাবশালীদের হুমকিতেও পড়তে হয়। দ্রুত প্রচার পেতে অনেক মামলার ‘মেরিট’ বা প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হয় না। তবে জনস্বার্থের মামলা বেড়েছে। এ নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।

বাংলাদেশে জনস্বার্থের মামলা : প্রবীণ আইনবিদরা জানান, বাংলাদেশে জনস্বার্থের মামলার ধারণা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে আলোচিত ‘বেরুবাড়ি’ মামলা দিয়ে। এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য রায় হয় ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) মহাসচিব ড. মহিউদ্দিনের করা ফ্যাপ-২০ (ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান) বিষয়ক মামলায়। বন্যা ঠেকাতে টাঙ্গাইল জেলায় বাঁধ নির্মাণ এবং এর ফলে এলাকার কৃষি, মৎস্যচাষ, গবাদিপশু ও পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে ১৯৯৪ সালের জুনে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। রিটকারীর লোকাস স্ট্যান্ডি (আবেদনের এখতিয়ার) নিয়ে আপত্তি তুলে হাইকোর্ট আবেদনটি খারিজ করে দেয়। তবে আপিল বিভাগ ১৯৯৬ সালের ২৫ জুলাই হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করে রায়ের পর্যবেক্ষণে সংবিধানে রিট-সংক্রান্ত ১০২(১) ও ১০২(২) (ক) অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় বলে, ‘যে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি’ কথাটি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সমষ্টিগত ও সংহত ব্যক্তিত্ব হিসেবে জনগণও এর আওতায় আসবে।

জনস্বার্থের মামলায় সরব আইনজীবী ও সংগঠন : দুই দশকের বেশি সময় ধরে মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জনস্বার্থের মামলা করছে নিয়মিত। ১৯৯৩ সাল থেকে নাগরিককে আইনি সহায়তা দিচ্ছে আইনি সহায়তা সংস্থা বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। দুটি সংগঠন প্রায় ২০০ মামলা করেছে। ফতোয়া বিষয়ে মামলা, শিক্ষার্থীর ফরমে মায়ের অধিকার নিশ্চিত করার মামলা, নিকাহনামায় ‘কুমারী’ শব্দ বাতিল, পুনর্বাসন না করে বস্তি উচ্ছেদ, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ অসংখ্য মামলা কখনো যৌথভাবে, কখনো পৃথকভাবে করছে সংগঠন দুটি।

সারা দেশের অন্তত দুই হাজার আইনজীবী নিয়মিত ব্লাস্ট ও আসকের পক্ষে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন। কেন জনস্বার্থে মামলা করেন এ প্রশ্নের জবাবে ব্লাস্টের ট্রাস্টি ও আসকের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশপ্রেম এখানে মুখ্য বিবেচনা। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এ রাষ্ট্র জনগণের। মানুষ অধিকার-বঞ্চিত হলে কষ্ট হয়। এ জন্যই আদালতে দাঁড়িয়ে মানুষের কথা বলি। এ জন্য কোনো ফি নেন না আইনজীবীরা। অনেক সময় বাধা ও হুমকির সম্মুখীন হয়েছি। পিছপা হইনি। তরুণ আইনজীবীরা এ ধরনের মামলায় আসছে। এটি খুবই আশাব্যঞ্জক। আদালত কিন্তু মানুষের জন্যই। খুব ব্যতিক্রম না হলে মানুষের অধিকার আদালতে অগ্রাহ্য হয় না।

৩০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি উচ্ছেদ মামলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জলাধার দখল, অবৈধ ইটভাটা, নদীদখল-দূষণ এবং পরিবেশ ও জলবায়ুসংক্রান্ত প্রায় ৩৫০টি জনস্বার্থের মামলা করেছে। ৫০টিরও বেশি মামলায় চূড়ান্ত রায় তারা পেয়েছে। বেলার প্রধান নির্বাহী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ পরিবেশগত বিপর্যয় ও দুর্যোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসে। মুষ্টিমেয় কিছু লোক নিজেদের স্বার্থে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটেপুটে খেতে চায়। তারা রাজনীতির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে। আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে জনস্বার্থমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে প্রাকৃতিক সম্পদের লুণ্ঠন ও ধ্বংস ত্বরান্বিত হচ্ছে। জনগোষ্ঠীর ও সামাজিক পশ্চাদপদতার কারণে স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া চালানো যাচ্ছে না। এ কারণে জনস্বার্থে আমরা মামলা করি। এতে জনস্বার্থমূলক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। তিনি বলেন, গণতন্ত্র যত বিকশিত হবে, জবাবদিহি যত বাড়বে, আদালতের রায় কার্যকর করা তত সহজ হবে। মামলার রায় হলে মানুষ মনে শক্তি পায়। জবাবদিহির ক্ষেত্র তৈরি করা, প্রশাসনকে প্রশ্ন করার মামলার সুফল একেবারে কম নয়।

২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)। দেড় দশকের বেশি সময়ে সংগঠনটি উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে মামলা করেছে ৩৩০টি। ৯৮ ভাগ মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ এসেছে। ৯০টি মামলায় রুলের ওপর চূড়ান্ত রায় এসেছে। ২৩০টি মামলায় রুল ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ এসেছে হাইকোর্ট থেকে। এসবের মধ্যে ঢাকার পাশের চার নদী রক্ষার মামলা, হাতিরঝিল নিয়ে মামলা, ঢাকায় পরিবেশ দূষণ, উচ্চশব্দের হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধের মামলা রয়েছে। এইচআরপিবির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনস্বার্থের মামলার পেছনের কারণ সুশাসনের ঘাটতি। যে কাজ প্রশাসনের করার কথা তা অনেক সময়ই হয় না। আইনজীবীদের পেশাগত মনোভাব হলো, মক্কেল ফি দেবে আর তারা মামলা পরিচালনা করবে। কিন্তু এর বাইরেও অনেক কিছু করা যায়। তিনি বলেন, স্বার্থান্বেষী মহল আদালতকে সামনে রেখে জনস্বার্থে মামলার নামে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে কাজ করে। সতর্ক না হলে মামলার মর্যাদা লঙ্ঘিত হবে।

গত সাত বছরে তেল, গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ইস্যুতে উচ্চ আদালতে অন্তত ২২টি মামলা করেছে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ক্যাব)। প্রায় সবগুলোতে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ হয়েছে বলে জানান ক্যাবের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, জনস্বার্থের মামলায় মানুষের অধিকার রক্ষার, আদালতে উপস্থাপন করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। ধরা যাক, থানা হেফাজতে কাউকে নির্যাতন করা হলো। তখনই উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। প্রমাণ করতে হয়, ওই ব্যক্তি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা মুখে বলি জনগণের রাষ্ট্র। কিন্তু জনগণের কল্যাণে রাষ্ট্র ভূমিকা কতটুকু? রাষ্ট্রীয় কাজে সীমাবদ্ধতা ও উদাসীনতা দুটোই আছে। আমাদের মতো দেশে এসব স্বাভাবিক বিষয়। প্রশাসন সব কাজ করবে না জেনেই মানুষকে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেন অনেক আইনজীবী।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (বিএনডব্লিউএলএ), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), ল লাইফ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ল ল্যাব ফাউন্ডেশন, চিলড্রেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশন প্রভৃতি সংগঠন জনস্বার্থে মামলা করছে নিয়মিত। বিএনডব্লিউএলএ নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা, যৌন হয়রানি, ইভটিজিং, পারিবারিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ রোধ প্রভৃতি ইস্যুতে ৫০টি মামলা করেছে গত দুই দশকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রায় ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে এসেছে বলে জানান সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংবিধান আমাকে যে অধিকার দিয়েছে তা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। অনেক ক্ষেত্রেই তা পালিত হয় না। তখনই আমরা মামলা করি, সাংবিধানিক অধিকার পূরণে সরকারকে বাধ্য করার জন্য।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত