আইএমএফের ঋণে তৈরি হয় বোঝা!

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:২৯ পিএম

বাংলাদেশ সরকারের জন্য ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদের বৈঠকে এ ঋণ অনুমোদন করা হয়। অনুমোদনের পরই এই ঋণপ্রাপ্তিতে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ঋণের বিপরীতে সংস্থাটির শক্ত শর্ত মানতে গিয়ে অনেক দেশই বিপদে পড়েছে। তবে বিশ্লেষকরা অর্থনৈতিক সংস্কার ও আইএমএফের ঋণ ব্যবহারে সাবধানতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছেন।

আইএমএফ কোনো দেশকে স্বল্পমেয়াদে ও অর্থ-বাজারের থেকে কম সুদে মোটা অংকের ঋণ প্রদান করে, যাতে সেই দেশের সরকার তাদের বর্তমান দেনা-পাওনা মিটিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলতে পারে। আইএমএফকে বলা হয় ‘ল্যান্ডার অব লাস্ট রিসোর্স’ অর্থাৎ ঋণ পাওয়ার সর্বশেষ দরজা। কোনো দেশ আইএমএফের কাছে ঋণ চাইলে ধরে নেওয়া হয় তাদের কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। আইএমএফ ঋণ দেওয়ার সময় কিছু কঠিন ও অবশ্য পালনীয় শর্ত দেয়, যেগুলো যথাসম্ভব দ্রুত মেনে নিতে হয়। এ কারণে রাষ্ট্রগুলো সংস্থাটির কাছে হাত পাততে পছন্দ করে না।

আইএমএফ যে শর্তগুলো দেয় সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সরকারি খরচ কমানো, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পুঁজি প্রবাহে বাধা দূর করা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যবসাগুলোকে বেসরকারি খাতের অধিভুক্ত করা, ভর্তুকি হ্রাস, কর বৃদ্ধি ইত্যাদি। সমস্যা হলো, এই শর্তগুলো দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থাভেদে পরিবর্তন হয় না। ফলে কোনো দেশের অবস্থা যা-ই হোক না কেন, তাদের আইএমএফেএর ঋণ পেতে হলে এই শর্তগুলো মেনে নিতে হয়। ঋণ দেওয়া হয় গ্রহীতা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য, কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে দেশগুলো আরও গভীর সমস্যায় পড়ে যায়।

বাংলাদেশকে বিশেষ করে দেশের সাধারণ মানুষকে আইএমএফের ঋণের শর্তের চড়া মূল্য দিতে হবে। শর্তের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই জ¦ালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সব পণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিয়ে জনসাধারণ জীবনযাত্রায় অসহনীয় অবস্থা তৈরি করছে। কর সুবিধা কমিয়ে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। তবে আইএমএফের ঋণে সাময়িক স্বস্তি দিলেও সংকটের গভীরতা এত বেশি যে এ ঋণে তা মেটানো কঠিন।

মালয়েশিয়া

১৯৯৭ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল। তখন মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো বাজেট ঘাটতি ও মুদ্রার বিনিময়মূল্য শক্তিশালী করতে আইএমএফের শর্ত মেনে ঋণ নেয়। এ সময় তারা নিজেদের মুদ্রানীতি কঠোর করার পাশাপাশি রাজস্ব খাতেও কাটছাঁট করে। পরবর্তী সময়ে তা গুরুতর মন্দায় রূপ নেয় এবং বেকারত্ব অনেক বেড়ে যায়।

কেনিয়া

আইএমএফ ১৯৯০ সালে কেনিয়ায় হস্তক্ষেপ করে। তাদের চাপে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুঁজিপ্রবাহের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়। তখন ধারণা তৈরি হয়, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের টাকা পাচারে সহায়তা করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সমালোচকরা বলেন, আইএমএফ যে ঋণগ্রহীতা দেশের পরিপ্রেক্ষিত বা বাস্তবতা বুঝতে পারে না, এটা তার আরেকটি নজির ছিল।

পাকিস্তান

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানও আইএমএফের পরামর্শ মেনে বিপদে পড়েছে। জ্বালানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর কারণে দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে যায়। পরিণামে সেখানকার প্রধান খাবার নানরুটির দাম চলে যায় ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এরপর ২০১৯-২০ সালে পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে সে দেশের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ বা সাড়ে তিন কোটি মানুষ সহনীয় থেকে তীব্র মাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়ার কথা বলা হয়।

ভুগছে আর্জেন্টিনা

গেল বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইএমএফের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়ে বিপাকে থাকা দেশের নাম আর্জেন্টিনা। বর্তমানে দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ ৪২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। চলতি শতাব্দীর শুরুতে দেশটির অসুস্থ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে টেনে তুলতে আইএমএফ ৮৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়। এই ঋণ পরিশোধ নিয়ে আর্জেটিনার সঙ্গে আইএমএফের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ২০০৬ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নেস্টর কির্চনার পুরো ঋণ পরিশোধ করেন। কিন্তু ২০২২ সালে দেশটি আবারও ৪৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়।

বিপাকে আরও যারা

আইএমএফের দ্বিতীয় শীর্ষ ঋণগ্রহীতা দেশ মিসর। দেশটির বর্তমান ঋণের পরিমাণ ১৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১১ সালে মিসরীয় বিপ্লবের ফলে সুয়েজ খাল থেকে দেশটির রাজস্ব আয় কমে যায়। এতে অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে দেশটি আইএমএফ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়। ২০২০ করোনা মহামারী মোকাবিলা ২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন আর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আরও ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়। এছাড়া দেশটি গেল বছরের মার্চে আইএমএফ থেকে আরও ঋণ চেয়েছে, যা এখনো আলোচনায় রয়েছে।

আইএমএফ থেকে তৃতীয় বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা দেশ ইউক্রেন। দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ ৯ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। ইউক্রেন সর্বপ্রথম ১৯৯৮ সালে আইএমএফ থেকে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছিল। ২০১০ সালে দেশটিকে আরও ১৫ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়। কিন্তু সংস্কার ইস্যুতে মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় ২০১১ সালে ঋণচুক্তি বাতিল করে আইএমএফ। তবে রাশিয়া দেশটিতে হামলা করার পর ২০২২ সালে তাদের ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে আইএমএফ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানের ঋণের পরিমাণ ৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডর ও কলম্বিয়া যথাক্রমে ৭.২২ আর ৪.২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে পঞ্চম ও ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া শীর্ষ ১০-এ থাকা অপর চারটি আফ্রিকান দেশ হচ্ছে অ্যাঙ্গোলা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া এবং আইভরি কোট।

তবে আইএমএফের ঋণ নিয়ে উপকৃত হওয়ার উদাহরণও আছে। নিকট অতীতে অনেক আলোচনার পর গ্রিস আইএমএফের যে ঋণ নেয়, তাতে তারা উপকৃতই হয়েছে। তবে ঋণের শর্ত নির্ধারণে গ্রিসের বড় ভূমিকা ছিল সেখানে।

এদিকে দেশগুলোর সামনে আইএমএফের ঋণ পরিশোধের চাপও আছে। এ সম্পর্কে বোস্টন ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি সেন্টারের কেভিন গ্যালাঘের বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে ৫৫টি ২০২২ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ৪৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধের সম্মুখীন হবে। এর মধ্যে ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রায় ৬ হাজার ১০০ কোটি ডলার এবং ২০২৪ সালে আরও প্রায় সাত হাজার কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত