মনোমালিন্যের জেরে দম্পতির ঘটেছিল বিচ্ছেদ। পরে স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুকের একটি মামলাও করেছিলেন স্ত্রী। সেই মামলার শুনানি চলাকালে তাদের একমাত্র শিশু সন্তানের কান্নায় তার দিকে চোখ আটকে যায় বিচারকসহ আদালত কক্ষে উপস্থিত সবার। শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করেন বিচারক নিজেই। আদালতের একটি মানবিক উদ্যোগের পর ভেঙে যাওয়া সংসার আবারও জোড়া লেগেছে। আদালত কক্ষেই তাদের পুনঃবিয়ের আয়োজন করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজশাহী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এ ঘটেছে এই ঘটনা।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের কর্মচারী শিমুল পারভেজের সঙ্গে ২০২১ সালের ২ এপ্রিল জান্নাত ফেরদৌসের বিয়ে হয়। তাদের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার কাঁটাখালি এলাকায়। তবে নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্যের জেরে গত বছরের অক্টোবর মাসে তাদের সংসার ভেঙে যায়। গত ১২ অক্টোবর শিমুলের বিরুদ্ধে জান্নাত ফেরদৌস আদালতে মামলা করেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদুজজামানের আদালতে সেই মামলার জামিন শুনানি চলছিল। সাক্ষীর কাঠগড়ায় মামলার বাদী জান্নাত ফেরদৌসের কোলে তার ৬ মাসের শিশু কাঁদছিল। আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ২২/২৩ বছর বয়সী শিমুল। আদালতে জান্নাতের বাবা-মা এবং শিমুলের বাবা উপস্থিত ছিলেন। শুনানিকালে জান্নাতের কোলে কাঁদছিল তার ছোট্ট সন্তান। জান্নাতের চোখ গড়িয়েও পড়ছিল পানি। মাথা নিচু করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন শিমুল। দুই পক্ষের আইনজীবী পক্ষে-বিপক্ষে তাদের বক্তব্য রাখছিলেন। ঐ সময়ই আদালতের দৃষ্টি পড়ে ছোট্ট শিশুটির ওপর। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদুজজামানের চোখ এড়ায়নি ছোট্ট শিশুকে কোলে জান্নাতের কান্নাও। আদালত তাদের কাছে জানতে চান শিশুটির ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বাদী ও আসামি আপস করতে চায় কি না। তখন জান্নাত ও শিমুল পরস্পরের বিপক্ষে অভিযোগ করতে শুরু করেন। কিছু দোষত্রুটি উল্লেখ করেন দুজনই। এ সময় আদালত তাদের উদ্দেশে কিছু উপদেশমূলক কথা বলে। তাদের ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যতের কথাও বলা হয়। একপর্যায়ে তারা দুজনই আপস করতে রাজি হন। এজন্য আদালতের মধ্যস্থতা চান। এ সময় দুপক্ষের আইনজীবীর অনুরোধে আদালত তার বিচারকাজ শেষে আদালত কক্ষের ভেতরেই উভয় পক্ষের আইনজীবী, অভিভাবক ও বার সমিতির নেতাদের উপস্থিতিতে কাজী ডাকেন। এরপর আদালতের ভেতরেই ১ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে ইসলামি বিধান অনুযায়ী পুনরায় তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। আদালত সবাইকে মিষ্টিমুখ করায়।
পরে আদালতের বিচারক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদুজজামান স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই তার খাস কামরায় ডেকে নিয়ে সুন্দর করে সংসার করার উপদেশ দিয়ে শিশুটিকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ আদর করেন। আদালতের এই মানবিক উদ্যোগে বাদী, আসামি, আইনজীবী, আদালতের পেশকার, পিয়ন ও ম্যাজিস্ট্রেট সবার চোখেই তখন আনন্দ অশ্রু দেখা যায়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী রেবেকা সুলতানা বলেন, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদুজ্জামান স্যার এ আদালতে যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন মামলায় তার মানবিক আচরণ এবং সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তরিক মধ্যস্থতায় অনেক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে যাচ্ছেন এবং মানবিক বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছেন।
