হিন্ডেনবার্গ প্রতিবেদনের জেরে গত ১১ দিনের ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির সাম্রাজ্য। ওই প্রতিবেদনে তার গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠায় এই সময়ে শেয়ারের দর হারিয়ে প্রায় অর্ধেক সম্পদ হারিয়েছেন আদানি। অনেকে তার প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তও প্রত্যাহার করেছেন ইতিমধ্যে। আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাগুলোও তাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে আশঙ্কা করেছে, ভবিষ্যতে আদানি গ্রুপের মূল্যায়ন হ্রাস পেতে পারে। কমবে তাদের পুঁজি সংগ্রহের সক্ষমতাও। এ অবস্থায় নিজের ব্যবসায় অডিট করানোর তোড়জোড় শুরু করেছেন গৌতম আদানি। আদানি গ্রুপের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী সংস্থা টোটাল এনার্জিসের (টিওটি) এক বিবৃতির বরাতে এমনটাই দাবি করেছে ভারতের সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা।
আনন্দবাজার বলছে, টিওটি-র দাবি, আদানি গ্রুপের ব্যবসায় অডিট করানোর দায়িত্ব পেতে পারে কোনো একটি ‘বিগ ফোর’খ্যাত বহুজাতিক সংস্থা। যদিও ফ্রান্সের ওই সংস্থার বিবৃতি প্রকাশের পরেই এ নিয়েও প্রতিক্রিয়া জানায়নি আদানি গোষ্ঠী। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কারচুপির অভিযোগ মুছে ফেলতেই কি অডিট করানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন গৌতম আদানি? ওই অডিট রিপোর্টকেই হাতিয়ার করে এগোবেন তিনি?
হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের দাবি ছিল, আদানি গ্রুপ নিজেদের সংস্থার শেয়ারদর ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বেশি করে দেখিয়েছে। সেই ভুয়া দরের শেয়ার বন্ধক রেখেই বিপুল অর্থ ঋণ নিয়েছে তারা। অথচ এই মুহূর্তে আদানি গ্রুপের মোট দেনার পরিমাণ ২ লাখ কোটি রুপির বেশি।
অবশ্য তিন দিন পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি গৌতম আদানির প্রতিষ্ঠান হিন্ডেনবার্গ রিসার্চকে ৪১৩ পাতার উত্তর দেয়। তাতে তারা দাবি করে, সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং মিথ্যা। আদানি গ্রুপের আরও দাবি ছিল, ভারতের অখণ্ডতাকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এহেন রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনেছে হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ।
হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ অবশ্য চুপ করে থাকেনি। তারাও বলেছে, মূল অভিযোগগুলো থেকে নজর ঘোরানোর জন্যই জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গ টেনে এনেছে আদানি গ্রুপ। তবে তাতে কারচুপি লুকিয়ে রাখতে পারবে না তারা।
আনন্দবাজার বলছে, কারচুপির অভিযোগ নস্যাৎ করলেও একাধিক সংস্থার শেয়ারদরে পড়তি রুখতে পারেনি আদানি গ্রুপ। ১১ দিনের মধ্যে আদানি এন্টারপ্রাইজেসে শেয়ারদর ৫১ শতাংশ পড়ে গিয়েছে। আদানি গ্রুপের মালিকানাধীন আদানি পোর্টস, আদানি গ্রিন এনার্জি, আদানি পাওয়ার, আদানি টোটাল গ্যাস, আদানি উইলমার, আদানি ট্রান্সমিশন-সহ বেশ কিছু সংস্থার শেয়ার অনেকটাই পড়েছে। ফলে ওই সংস্থাগুলোরও সম্পদহানি হয়েছে। অব্যাহতভাবে শেয়ারদর পড়তে থাকায় গত বুধবার রাতে আদানি এন্টারপ্রাইজেসের ২০ হাজার কোটি রুপির দ্বিতীয় দফার শেয়ার (এফপিও) ছাড়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। পরের দিন এক বিবৃতিতে আদানি গ্রুপ জানায়, শেয়ার বাজারের অস্থিরতার কারণে অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষার জন্যই এফপিওর অর্থ ফেরত দিচ্ছেন তারা। একটি ভিডিওবার্তায় স্বয়ং গৌতম আদানি দাবি করেন, শেয়ারবাজারে দর এভাবে পড়ে যাওয়ায় এফপিও প্রক্রিয়া নিয়ে এগোনোকে উচিত বলে মনে করেনি তার গোষ্ঠীর বোর্ড। এ ধরনের অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে তা নৈতিকভাবে ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
আদানি গ্রুপকে কেন্দ্র করে শেয়ারবাজারে এই ডামাডোলের মধ্যে সংসদের উভয় কক্ষেই সরব হয়েছেন বিরোধীরা। সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি তুলেছেন তারা। সেই সঙ্গে, যৌথ সংসদীয় কমিটি (জেপিসি) গড়ে অভিযোগ খতিয়ে দেখার দাবিও করেছে বিরোধীরা।
আনন্দবাজার বলছে, বিগ ফোরের একটি সংস্থাকে অডিটের জন্য নিয়োগের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে আদানি গ্রুপ। ডিলইট, আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়াং (ইওয়াই), কেপিএমজি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এবং প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপার (পিডব্লিউসি) একত্রে বিগ ফোর নামে পরিচিত।
যদিও আদানি গ্রুপের মূল সংস্থা আদানি এন্টারপ্রাইজেস তাদের বার্ষিক রিপোর্টে জানিয়েছিল, শাহ ধনধারিয়া অ্যান্ড কোম্পানি নামে একটি সংস্থাকে দিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থার অ্যাকাউন্ট অডিট করা হয়েছিল। তবে হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে, ওই অডিট সংস্থাটির মাত্র ১১ জন কর্মী এবং ৪টি অংশীদার রয়েছে।
