সাবেকদের সক্রিয় করার কৌশল

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৫:৩৬ এএম

কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত সরকারবিরোধী আন্দোলন ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি একতালে রাখতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে এবার ২০০১ সাল থেকে বিএনপির পদধারী অথবা সমর্থিত বর্তমান ও সাবেক উপজেলা, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান থেকে শুরু সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করতে চান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে দল থেকে বহিষ্কার হওয়া নেতাকর্মীদের বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়ার জন্য মহাসচিব বরাবর আবেদনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

এসব নেতার কাছ থেকে দলের চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন ও আগামী নির্বাচন নিয়ে কী করণীয় তা জানতে চাইবেন তারেক। এ লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক কাজও শুরু হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি চিঠি ১০টি বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে গত সোমবার।

ওই চিঠিতে সারা দেশের তথ্য সংগ্রহ করে গত ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দিতে বলা হয়। নেতাদের পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে প্রাপ্ত তথ্য দপ্তরে জমা হওয়ার পর সমন্বয় করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘২০০১ সাল-পরবর্তী বিএনপির পদধারী/সমর্থিত সাবেক ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ ও মহিলা), পৌরসভার মেয়র ও ইউপি চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের তথ্যাবলি’ সংগ্রহ করে জমা দিতে হবে। এ প্রক্রিয়ার সমন্বয় করছেন দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু।

প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, সম্প্রতি আওয়ামী লীগের এক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতাদের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা বলেছেন। বিএনপিও মনে করছে, নির্বাচন নিয়ে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তেমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে এ ধরনের পদক্ষেপ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়েছেন। ওই নেতা জানান, এর আগে দলের ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক ও সহসম্পাদকসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কয়েকবার লন্ডন থেকে স্কাইপে বৈঠক করেছেন তারেক রহমান। কিন্তু দলের প্রাণ তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বসা হয়নি। তারা কী চান সেটিও জানা হয়নি। তাদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি বৈঠক করে আন্দোলন ও নির্বাচনের সার্বিক চিত্রটি জানতে চান তিনি। কবে এবং কীভাবে এ বৈঠক হবে সেটি চূড়ান্ত হয়নি।

জানা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের পরামর্শ থাকবে, রাজধানীতে না এনে এসব নেতাকে বিভাগওয়ারি মতামত দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে। সাংগঠনিক জটিলতা বা সরকারের অসহযোগিতার কারণে সেটি সম্ভব না হলে অন্তত ব্যক্তিগতভাবে হলেও তাদের সঙ্গে কথা বলবেন তারেক রহমান।

বিএনপির সাংগঠনিক বিভাগ রয়েছে ১০টি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও ফরিদপুর। এসব বিভাগে প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, ৫৫০ উপজেলা পরিষদ (চেয়ারম্যান, পুরুষ ও মহিলা সদস্য মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০), ১০ জন সিটি মেয়র, প্রায় ৪৫০ কাউন্সিলর রয়েছেন, ৫৫০ পৌর মেয়র রয়েছেন। ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গুলশানে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনিপর স্থায়ী কমিটির এক সিদ্ধান্তের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, আগামীতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনসহ স্থানীয় কোনো নির্বাচনে দলগতভাবে বিএনপি অংশ নেবে না।

সে হিসেবে ২০০১ সাল থেকে প্রায় তিনটি স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে দলটি। এ ছাড়াও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী যারা নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হয়েছেন তারাও রয়েছেন। তাই কমবেশি বর্তমান ও সাবেক মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ হাজারের মতো বিএনপি জনপ্রতিনিধি রয়েছেন বলে দলটির এক নেতা জানান।

ওই নেতা আরও জানান, একসঙ্গে বসা অনেকটা দুরূহ। তবে ভাগে ভাগে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা যায়। কীভাবে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে সেটি হাইকমান্ড ভালো বলতে পারবেন।

সূত্রগুলো বলছে, আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া-না নেওয়া, নির্বাচন সামনে রেখে আন্দোলনের প্রস্তুতি ও করণীয় সম্পর্কে মতামত, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার কীভাবে আদায় করা যায় সে বিষয়ে প্রস্তাব আসতে পারে তৃণমূলের এ বৈঠক থেকে। পাশাপাশি তৃণমূল বিএনপিকে উজ্জীবিত করার কৌশল হিসেবেও এ পদক্ষেপ নিতে পারেন বিএনপির হাইকমান্ড। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে বিএনপির নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। এ জন্য তারা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। সব দলকে ঐক্যবদ্ধ করে এবার অলআউট মাঠে নামতে চায় রাজপথের প্রধান বিরোধী দলটি।

এদিকে দলের বহিষ্কৃত প্রায় অর্ধশতাধিক নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে তারেক রহমান দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এদের অনেককে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বরাবর বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়ার আবেদন করতেও বলেছেন। পরিস্থিতি বুঝে ওই নেতাদের বহিষ্কারাদেশ তুলে নিয়ে কাউকে কাউকে ইতিমধ্যে পদও দেওয়া হয়েছে। এমনি একজন স্বেচ্ছাসেবক দল দক্ষিণের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন। ছাত্রদলের যে ১২ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল তিনি তাদেরই একজন। এ তালিকায় আরও রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন, ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম আহ্বায়ক মমিনুল হক জিসান প্রমুখ নেতা। যুবদলের বহিষ্কৃত সাবেক এক সহসভাপতিকে সম্প্রতি ফোন দিয়ে কথা বলেছেন তারেক রহমান। তাকে দলের মহাসচিব বরাবর আবেদন করতে বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ নাসির, ঢাকা কলেজের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এ ই এম রাশেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক তৈমূর আলম খন্দকার, নির্বাহী কমিটির সদস্য ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন থেকে নির্বাচন করা মনিরুল হক সাক্কু প্রমুখ বহিষ্কারাদেশ তুলে নিতে আবেদন করেছেন।

এমন সংখ্যা কত জানাতে চাইলে তাইফুল ইসলাম টিপু জানান, দলে প্রায় শতাধিক বহিষ্কৃত নেতা রয়েছেন। অনেকেই আবেদন করছেন বহিষ্কারাদেশ তুলে নেওয়া জন্য। এদের মধ্যে সাবেক ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ ও মহিলা), পৌরসভার মেয়র ও ইউপি চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিল মিলিয়ে অর্ধশতাধিক হবে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে যাওয়ার মতো প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। তবে আমরা চাই সেই নির্বাচনটা হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। এই মুহূর্তে আমাদের একমাত্র চাওয়া হচ্ছে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। শুধু বিএনপি নয়, দেশের প্রতিটি মানুষের চাওয়াও তাই। সে লক্ষ্যে আমরা বৃহত্তর ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েছি। সাংগঠনিকভাবেও আমরা নিজেদের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি রাখছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত