ইবিতে ছাত্রলীগের নির্যাতন

ক্যাম্পাসে ফিরতে চান, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় সেই ছাত্রী

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৪:১২ এএম

ভ্যানচালক বাবার স্বপ্নপূরণে ভর্তি হন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি)। কিন্তু স্বপ্নপূরণের শুরুতেই ছাত্রলীগের নেত্রীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে আতঙ্কে ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছে নবীন এ ছাত্রীকে। সহপাঠীদের সঙ্গে ক্লাস করার পরিবর্তে অসুস্থ অবস্থায় বর্তমানে অবস্থান করতে হচ্ছে পাবনার গ্রামের বাড়িতে। ভ্যানচালক বাবার পক্ষে যা মেনে নেওয়া কষ্টসাধ্য।

গত রবিবার ইবির দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সানজিদা চৌধুরী অন্তরা ও তার সহযোগীরা তাকে রাতভর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে বলে অভিযোগ প্রথম বর্ষের ওই ছাত্রীর। এ ঘটনার পর আতঙ্কে হল ছেড়ে বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তবে সুস্থ হয়ে আবারও ক্যাম্পাসে ফিরতে চান তিনি। কিন্তু ভুগছেন নিরাপত্তাহীনতায়।

এদিকে ইবির এই ছাত্রীকে নির্যাতন করে ভিডিও ধারণের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন হয়েছে। এতে জড়িতদের হাইকোর্টে তলব করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার এ আবেদনের পর বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চে আবেদনটি শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হয়। আদালত শুনানির জন্য আজ বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করে।

জনস্বার্থে রিট আবেদনটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মোহসীন। স্বরাষ্ট্র সচিব, শিক্ষা সচিব, ইবির ভিসি, রেজিস্ট্রার, প্রক্টরসহ সংশ্লিষ্টদের রিটে বিবাদী করা হয়েছে।

এর আগে সকালে ইবি ছাত্রীকে রাতভর মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করে ভিডিও ধারণের ঘটনা হাইকোর্টের নজরে আনা হয়। ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী গাজী মো. মহসীন ও আইনজীবী আজগর হোসেন তুহিন। তখন আদালত আইনজীবীদের লিখিত আবেদন নিয়ে আসতে বলে। এ ছাড়াও ওই ছাত্রীকে নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে আলাদা আলাদা সংবাদ বিবৃতি দিয়েছে ইবি ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী ও ছাত্রদল। একই ইস্যুতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্র ইউনিয়ন ইবি সংসদ।

অন্যদিকে নির্যাতনের এ ঘটনা তদন্তে অধ্যাপক ড. রেবা ম-লকে আহ্বায়ক ও উপ-রেজিস্ট্রার আলীবর্দী খানকে সদস্য সচিব করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেনÑ অধ্যাপক ড. দেবাশীষ শর্মা, অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন আরা সাথী ও অধ্যাপক ড. মুর্শিদ আলম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে এ কমিটিকে। এ ছাড়াও ঘটনার তদন্তে ইবি ছাত্রলীগ চার সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

নির্যাতনের শিকার ওই ছাত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ। আমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা নির্মম। এ ঘটনার বিচার চাই আমি। যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে এমন ঘটনা না হয়। তবে সুস্থ হয়ে আমি ক্যাম্পাসে ফিরতে চাই। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশরতœ শেখ হাসিনা হলে নবীন এই ছাত্রীকে বিবস্ত্র করে রাতভর নির্যাতনের অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগ নেত্রী সানজিদা চৌধুরী অন্তরা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ওই ছাত্রী। এতে তিনি বলেন, ‘ওই রাতে আমাকে বিবস্ত্র করে মারধর করেন। এতে আমি কান্না করে তাদের পা ধরে মাফ চাইতে গেলে তারা আমাকে লাথি মারেন। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন, গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে ধরে রাখেন, একটা ময়লা গ্লাস চেটে পরিষ্কার করিয়ে নেন এবং আমাকে বিবস্ত্র করে সেটার ভিডিও ধারণ করেন। এ ছাড়া আমাকে বলতে থাকেন যাতে এ বিষয়টা কোনোভাবেই বাইরে না যায় আর যদি বলিস তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল করে দেব। ভিডিওগুলো তাদের সংরক্ষণে আছে। এ সময় অন্তরা বলেন, “যদি তুই প্রশাসনের কাছে কোনো প্রকার অভিযোগ দিস, তাহলে মেরে কুত্তা দিয়ে খাওয়াব”। এরপর আমাকে রাত সাড়ে ৩টায় ছেড়ে দেন। এ কারণে পরদিন প্রাণের ভয়ে আমি ক্যাম্পাস ছেড়ে গ্রামের বাড়ি পাবনাতে চলে যাই।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইবি ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাত বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আমরা চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছি। তদন্ত প্রতিবেদনে কেউ দোষীসাব্যস্ত হলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ বরাবর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন করব।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের গঠন করা তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. রেবা ম-ল বলেন, ‘আমি তদন্ত কমিটি গঠনসংক্রান্ত চিঠি পেয়েছি। যত দ্রুত সম্ভব সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রদান করার চেষ্টা করব।’

ইবি উপাচার্য অধ্যাপক ড শেখ আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘র‌্যাগিংয়ের (ছাত্রীকে নির্যাতন) বিষয়টি আমি শুনেছি। ঘটনার বর্ণনা গা শিউরে ওঠার মতো। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। রিপোর্ট পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত