ভয়াবহ ভূমিকম্পে তুরস্ক ও সিরিয়ার মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছেছে ৪৩ হাজার ৮৫৮ জনে। দুই দেশের অনেক এলাকায় স্থগিত করা হয়েছে উদ্ধারকাজ। স্বজনরাও ছেড়ে দিয়েছেন কাউকে জীবিত উদ্ধারের আশা। ভূমিকম্পের ১১ দিন পর এমন পরিস্থিতিতেও কোনো কোনো এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার হচ্ছে কেউ কেউ। গত বৃহস্পতিবার তুরস্কের কাহরামানমারাস প্রদেশে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের ধ্বংস্তূপ থেকে ১৭ বছর বয়সের এক কিশোরীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তার ঠিক ১০ ঘণ্টা পর ওই ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৪২ বছর বয়সী এক নারীকে। তবে তার দুই সন্তান ও স্বামী এখনো নিখোঁজ। গতকাল শুক্রবার নেসলিহান কিলিচ নামের ওই নারীকে উদ্ধারের পর তার স্বজনরা আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, তাকে জীবিত উদ্ধারের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার জন্য কবরও খুঁড়ে রাখা হয়েছিল।
কিলিচের দেবর সাংবাদিকদের বলেন, আমরা তাদের জীবিত উদ্ধারের আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। উদ্ধারকারীদেরও কাজ বন্ধ করতে বলেছিলাম। কিন্তু তার ঠিক কিছু সময় পরেই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তার আর্তনাদ শোনা যায়। পরে দীর্ঘ চেষ্টায় উদ্ধার করা হয় তাকে। কিন্তু আমার ভাই ও তার দুই সন্তান এখনো নিখোঁজ।
গত বুধবারও কাহরামানমারাস থেকে উদ্ধার পেয়েছেন দুই নারী। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরও মানুষকে জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে। বহু পরিবার এখনো তাদের নিখোঁজ স্বজনদের লাশ উদ্ধারের অপেক্ষায় আছে। ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের নির্মাণকাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণভাবে ভবন নির্মাণের কারণে ভূমিকম্পে হাজারো মানুষের মৃত্যুতে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
তুরস্কের আনতাকিয়া নগরীতে এক বাসিন্দা বলেন, আমার দুই সন্তান আছে। তারা দুজনই ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছে। ভূমিকম্পে ভবন ধসে ওই শহরে প্রায় ৬৫০ জন মানুষ মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ভূমিকম্প থেকে বেঁচে গেলেও তুরস্কের কোনিয়ার শহরে আগুন লেগে মারা গেছে এক সিরীয় পরিবারের সাত সদস্য। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে পাঁচজনই শিশু। আগুনে পুড়ে মৃত্যু হওয়া ওই শিশুদের বয়স ৪ থেকে ১৩ বছর।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, সিরীয় ওই পরিবারটি তুরস্কের গাজিয়ানটেত প্রদেশের নুরদাগিতে থাকত। ভূমিকম্পে তুরস্কে যে কয়েকটি শহর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নুরদাগি সেগুলোর একটি। কয়েক দিন আগেই ওই পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করে মধ্যাঞ্চলীয় শহর কোনিয়ায় স্থানান্তর করা হয়েছিল। একতলা ভবনটিতে ১৪ জন ছিল।
খবরে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর তদন্ত করা হয়েছে এবং একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় একজন বাসিন্দা মুহসিন চাকির আনাদোলুকে বলেন, আমরা আগুন দেখেছি কিন্তু কিছু করতে পারিনি। জানালা দিয়ে একটি মেয়েকে উদ্ধার করা হয়।
এদিকে ১১ দিন আগের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতভর প্রথমবার সিরীয় সেনাদের সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘর্ষ হয়েছে বলে জানিয়েছে সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স সংস্থাটির বরাতে বলছে, প্রাণঘাতী ওই ভূমিকম্পের পর সেখানে তারা বলেছে, সরকারি বাহিনী বিদ্রোহী অধ্যুষিত শহর আতারেবের উপকণ্ঠে গোলা ছুড়েছে। কাছাকাছি যুদ্ধক্ষেত্রে দুপক্ষের মধ্যে ভারী অস্ত্রশস্ত্র দিয়েও যুদ্ধ চলছে।
সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সরকারি বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সারাকেবের কাছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আরেক এলাকায়ও তুমুল লড়াই হয়েছে; আসাদ বাহিনী হামা প্রদেশের দুটি গ্রামের উপকণ্ঠে গোলা ছুড়েছে বলেও দাবি করেছে সিরিয়ান অবজারভেটরি। তবে রয়টার্স এসব দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
দেশটিতে ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া সংঘাত এরই মধ্যে লাখো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, জনসংখ্যার অর্ধেককে পরিণত করেছে উদ্বাস্তুতে, লাখ লাখ মানুষকে বাধ্য করেছে অন্য দেশে শরণার্থী হতে। ভূমিকম্পের আগেই সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ৪০ লাখের বেশি মানুষ ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ভূমিকম্পের পর পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে, সেখানে ঠিকভাবে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না অভিযোগ অনেক দাতা সংস্থার।
