জহির রায়হানের অন্তর্ধানের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সূচনা। ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রির বাণিজ্যিক বা শিল্প; যেকোনো ধারায় তার নাম আসবে অগ্রপথিক হিসেবে। ছিলেন নির্মাতা তৈরির কারিগরও। তার হারিয়ে যাওয়ার পর শিষ্যদের অনেকেই নির্মাণ চালিয়ে গেছেন। তাদের হাত ধরে রাজনৈতিক বয়ান পর্দায় উঠে এসেছে। বাণিজ্যিক ছবিতে সফল ছিলেন তার শিষ্যদের অন্যতম আমজাদ হোসেন। নয়নমণি থেকে শুরু করে জন্ম থেকে জ্বলছি, ভাত দে বা দুই পয়সার আলতার মতো সিনেমায় উঠে এসেছে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া দেশের অবক্ষয় ও গণতন্ত্রহীনতা।
বরাবরই বাংলা সিনেমার বাণিজ্যিক ধারার প্রধান লড়াই ছিল সামন্তবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রীয় চরিত্রের মতো গণতন্ত্র বা ব্যক্তিমানুষের বিকাশ ততটা উঠে আসেনি। উল্টো দিকে প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে আত্মপরিচয়ের সন্ধানে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে অন্য ধারাটি। অবাক হওয়ার বিষয় নয় যে, প্রথাগত ছবির তুমুল সমালোচক হলেও জহির রায়হানের আরেক শিষ্য আলমগীর কবির মহানায়ক বা পরিণীতার মতো বাণিজ্যিক সিনেমায় সমর্পণ করেন নিজেকে।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ছবি ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ থেকে ‘বসুন্ধরা’র মতো সিনেমা উপহার দিয়েছেন সুভাষ। যুদ্ধের আগে তার অভিষেক, বরাবরই শৈল্পিক নির্মাণে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। আশির দশকে অ্যাকশনের রমরমা বাজারের মধ্যে যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতা ও সামাজিক ধারায় সফল ছিলেন ঢাকাই নির্মিত প্রথম সিনেমা ‘জাগো হুয়া সাভেরা’র নায়ক খান আতাউর রহমান। ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ও ‘সুজন সখী’ তার উল্লেখযোগ্য নির্মাণ। যুদ্ধের আগে নির্মাণ করেছিলেন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। সমসাময়িক মহিউদ্দিনের দয়াল মুরশিদ, ঈসা খাঁ বা বড় ভালো লোক ছিল বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। একই ধারায় সবচেয়ে সফল ছিলেন আজিজুর রহমান। তার উল্লেখযোগ্য ছবি ছুটির ঘণ্টা, জনতা এক্সপ্রেস ও অশিক্ষিত। আবার বিদেশের লোকেশনে সর্বাধিক সিনেমা করেন আজিজুর রহমান বুলি। একদম পারিবারিক সিনেমায় জনপ্রিয় ছিলেন নারায়ণ ঘোষ মিতা, যার অন্যরকম ‘আলোর মিছিল’। ছিলেন কাজী জহিরের মতো হৃদয়স্পর্শী নির্মাতারা।
বাণিজ্যিক সিনেমার বিকাশে আরেকজনের নাম না নিলে নয়, এহতেশাম। যিনি শুধু নির্মাতাই নন শবনম, শাবানা থেকে শাবনূর অনেক তারকা ও নির্মাতা এসেছেন তার হাত ধরে।
রাজনৈতিকভাবে ভঙ্গুর সমাজের একটি রূপ দেখা যায় জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ ছবিতে। একে শুধু প্রথম অ্যাকশন সিনেমা হিসেবে দেখলে চলবে না। সেই মারকুটে নায়কের পেছনে সম্ভবত এই প্রেরণা ছিল যে, যুদ্ধ করে যখন গণতন্ত্র আসেনি, আসো লড়াই করেই নিজের অধিকার কেড়ে নিই। জহিরুল হক পরে স্যারেন্ডার, বিজয়ের মতো সফল সিনেমা নির্মাণ করেছেন।
ফোক বা আরব্য রজনীর জনপ্রিয়তা যুদ্ধের আগেও ছিল। সত্তরের শেষ দিক ও আশির দশকে বাণিজ্যিক সফল সিনেমা নাটাই চলে যায় এ ধারায়। সঙ্গে যুক্ত হয় ওয়েস্টার্ন ঘরানা। ফোক ফ্যান্টাসির রাজা ইবনে মিজানের আবির্ভাব একাত্তরের আগে হলেও পরবর্তী দুই দশকে একের পর এক ব্লকবাস্টার উপহার দেন। তার আলোচিত ‘রাখাল বন্ধু’ ছিল উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেটের’ অনুকরণ। লাইলী মজনু, এক মুঠো ভাত বা চন্দন দ্বীপের রাজকন্যার মতো ছবি রয়েছে তার ঝুলিতে। সমান্তরালে ওয়েস্টার্ন ঘরানার সিনেমায় দারুণ জনপ্রিয়তা পান দেওয়ান নজরুল। হিন্দি শোলের রিমেক ‘দোস্ত দুশমন’ দিয়ে শুরু, এরপর আসামি হাজির, বারুদসহ একাধিক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দেন। একই সময় ফ্যান্টাসিকে নতুন ধাঁচে পরিবেশন করেন আরও দুই নির্মাতা এফ কবির ও এস এম শফি। যথাক্রমে ‘সওদাগর’ ও ২৬টি দেশে মুক্তি পাওয়া ‘দি রেইন’ তাদের তুমুল জনপ্রিয় সিনেমা।
স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ছবি ‘ওরা ১১ জন’-এর নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম পরবর্তী একাধিক বাণিজ্যসফল সিনেমা নির্মাণ করেছেন। ব্যতিক্রমভাবে সাহিত্যধর্মী সিনেমায় তিনি বেশ সফল ছিলেন। বিশেষ করে ‘দেবদাস’সহ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক কাহিনী তুলে এনেছেন।
বাংলাদেশের সিনেমার বাণিজ্যিক সফলতার চূড়ান্ত মাইলফলক তোজাম্মেল হক বকুলের ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ছবিটির বাঁধভাঙা জনপ্রিয়তা ভারত পর্যন্ত ছড়িয়েছে। বকুল পরে পাগল মন, বালিকা বধূসহ বেশ কয়েকটি সফল সিনেমা নির্মাণ করেছেন। তার হাত ধরে এ ধারায় জোয়ার এলেও স্তিমিত হতে সময় লাগেনি। নব্বই দশকে এ কে সোহেলের ‘খায়রুন সুন্দরী’ গ্রামীণ গল্প তুলে এনে বেশ সফল হলেও এই নির্মাতা পরে কোনো চমৎকারিত্ব দেখাতে পারেননি।
সামাজিক অ্যাকশন ধারার বেশ লম্বা সময় ধরে জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দিয়ে গেছেন এ জে মিন্টু ও শিবলী সাদিক। ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক ছিলেন মিন্টু। তার ঝুলিতে রয়েছে সত্যমিথ্যা, বাঁধনহারা, মান সম্মানসহ অনেক জনপ্রিয় ছবি। অন্যদিকে তিনকন্যা, ভেজাচোখ, দোলনা, আনন্দঅশ্রু নির্মাণ করেন শিবলি সাদিক। সম্ভবত নন্দন বিচারে এই ধারার সর্বশেষ সফল পরিচালক জাকির হোসেন রাজু। উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে জীবন সংসার, নিঃশ্বাসে তুমি বিশ্বাসে তুমি ও ভালোবাসা কারে কয়। আরও উল্লেখযোগ্য হলেন মতিন রহমান। রাঙাভাবি, নারীর মন, বিয়ের ফুল, অন্ধবিশ্বাসসহ অনেক হিট সিনেমা রয়েছে তার।
মালেক আফসারী ও মনতাজুর রহমান আকবর বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। আফসারী ক্ষতিপূরণ বা এই ঘর এই সংসার-এর মতো পারিবারিক সিনেমায় তুমুল প্রতিভা দেখালেও পরে অ্যাকশনে ঝুঁকে পড়েন। ছবিগুলো নানাভাবে সমালোচিত হয়। একই কথা প্রেম দিওয়ানা, ডিসকো ড্যান্সার সিনেমার পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ঢাকাই সিনেমায় সবচেয়ে বেশি নির্মাণের রেকর্ড এখন পর্যন্ত দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর। ৭৫টির মতো ছবি পরিচালনার পাশাপাশি অজস্র ছবির সঙ্গে বিভিন্ন ভূমিকায় জড়িত ছিলেন। মাটির কোলে, কন্যাদান, নীল দরিয়ার মতো সামাজিক সিনেমার পাশাপাশি সাপ বিষয়ক সিনেমায় রয়েছে তার ওস্তাদি। আবার রবিনহুড-টারজান থেকে শুরু করে সুপারহিরোধর্মী সিনেমার সঙ্গেও জড়িত।
কয়েক হাজার সিনেমা ঢাকায় নির্মিত হলেও ঢাকায় সেই অর্থে পুরোপুরি অ্যাকশন ধারা দেখা যায় না। সেই খামতি কিছুটা পূরণ করেছিলেন শহীদুল ইসলাম খোকন। রুবেলের সঙ্গে জুটি বেঁধে সফল সব সিনেমা উপহার দিয়েছেন। লড়াকু, বিপ্লব, সন্ত্রাস, বিশ্বপ্রেমিক, ভণ্ডসহ নামের সারি দীর্ঘ। তার হাত ধরেই বাণিজ্যিক সিনেমায় হুমায়ুন ফরীদির নবজন্ম ঘটে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বাণিজ্যিক সিনেমা অনেক সংস্কার ও জীবনধর্মী বিষয় তুলে এনেছে। সমান্তরালে নানান অনিয়মকে সামনে এনেছে। সেই প্রতিবাদ সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য আকারে খুব বেশি ছবিতে আসেনি। বরং স্থানীয় রাজনীতি বা প্রশাসন কেন্দ্রিক ছিল। কাজী হায়াৎ রাজনীতিসচেতন সিনেমার বড় নাম। আমজাদ হোসেন ও গুটিকয়েকদের মতো সরাসরি রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেছেন তিনি। আলমগীর কবিরের সঙ্গে সহকারী হিসেবে একটি সিনেমায় কাজ করেন কাজী হায়াৎ। প্রথম ছবি ‘দি ফাদার’ পারিবারিক ঘরানার। কাল্ট খেতাব জুটলেও তার সাফল্য মূলত রাজনৈতিকধর্মী সিনেমায়। দেশপ্রেমিক, সিপাহি, আম্মাজান, লুটতরাজ, ধর তার উল্লেখযোগ্য সিনেমা। নায়ক মান্নার সঙ্গে গড়েছিলেন তুমুল জনপ্রিয় জুটি। তার সাফল্যের পেছনে অন্যতম অনুঘটক ছিল প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে জনগণের অস্বস্তি।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ধারার জমজমাট একটি পরিভ্রমণ শেষ হয় নব্বই দশকে। ততদিনে দেশে ‘গণতন্ত্র’ চলে এসেছে। কিন্তু সেই গণতন্ত্র মূলত নতুন একটা লড়াই। সম্ভবত বাণিজ্যিক সিনেমা সেই দিকটি ততটা ধরতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে জনমানসকে ধরতে না পেরে রাজনীতিহীনতার অংশ হয়েছে বা জনপ্রিয় সিনেমার সংস্কারমূলক অংশ থেকে দূরে সরে গেছে। এ সময় একঝাঁক তারকা এসেছেন। তারা স্বভাবতই নির্দিষ্ট শ্রেণির নায়ক-নায়িকা হয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাদের পরিচিত ও লাইফস্টাইলজাত মোড়ক নতুন পরিচয় দিয়েছে। বিজ্ঞাপনী জগতের তাদের ছিল তুমুল চাহিদা। তাদের একাংশের আবিষ্কারক সোহানুর রহমান সোহান। এ নির্মাতার হিট অনেক সিনেমা থাকলেও সমাজকে কোনোভাবে ডিফাইন করতে পারেননি। যেভাবে আগের অনেকে হারিয়ে গেছেন, তিনিও তেমন হয়ে থাকলেন। এরপর বিংশ শতকের প্রায় সিকি শতাব্দীজুড়ে যে নামটি পুরো বাংলাদেশের সবাই জেনেছে, গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’। কিন্তু এই ছবিতে ‘নন্দন’ বহির্ভূত কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। ফলে দর্শক আর তার সিনেমা দেখেনি। মূলত বাংলা সিনেমা এরপর আর জমজমাট বাণিজ্য দেখেনি। সে আসলে সিনেমার মধ্যে ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন দেখেনি। কিন্তু আমরা বরাবরই বাণিজ্যিক সিনেমাকে অগ্রাহ্য করার ছলে এই দিকটাও অগ্রাহ্য করি।
স্বাধীন বাংলাদেশে তিন হাজারের বেশি সিনেমা নির্মিত হয়েছে। যেকোনো অর্থে এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে ও মানুষের সামনে জীবন জিজ্ঞাসাকে তুলে আনতে কয়েকশ’ নির্মাতার ভূমিকা রয়েছে। এর মধ্যে নির্মাণে সফল অনেক ছবি নির্মমভাবে বাণিজ্যে ব্যর্থ। ছোট এই লেখায় সফলদের একটি খণ্ডচিত্র তুলে ধরা হলো, নিঃসন্দেহে আরও অনেকেই বাদ পড়ে গেছেন।
