মামুনুর রশীদ। বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনে যে কজন মানুষ নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের অন্যতম তিনি। অংশগ্রহণ করেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। তিনি একাধারে নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা ও সংগঠক। নানা প্রসঙ্গ নিয়ে এই বরেণ্যজনের সঙ্গে কথা বলেছেন কবি, নাট্যকার ও নির্দেশক অপু মেহেদী
আপনি তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন?
আমার বাড়ি টাঙ্গাইলে। লতিফ সিদ্দিকীর সঙ্গে আগে পরিচয় ছিল। যুদ্ধের সময় পাশের গ্রামের কুম্ভকাররা এসে আমাদের কিছু অস্ত্রের সন্ধান দিল। আমরা অস্ত্রগুলো এনে কাদের সিদ্দিকীকে দিলাম, ওর সঙ্গে কিছুদিন ছিলামও। দু-একটা অপারেশনেও ছিলাম। পরে আগরতলা হয়ে কলকাতায় চলে যাই এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিই। সেখানে গিয়ে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, সৈয়দ হাসান ইমাম, আশরাফুল আলম, শহীদুল ইসলাম, মুস্তাফা আনোয়ার, আবদুল্লাহ আল ফারুক, আবদুল জব্বার, জামিল চৌধুরী, বাদল রহমানসহ অনেককেই পেলাম।
দেশ স্বাধীনের পরপরই ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘আরণ্যক নাট্যদল’?
কলকাতায় নিয়মিত নাট্যচর্চা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২-এ ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ মঞ্চস্থ করলাম। আমি অভিনয়ও করেছিলাম কবর নাটকে। তখন বিশ^বিদ্যালয়কেন্দ্রিক নাট্যচর্চা শুরু হয়েছে। পশ্চিমে ‘সিঁড়ি’ করলাম ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, রেসকোর্সের বিজয় দিবসের মঞ্চে। ১৯৭২ সালে আমরা বেশ কিছু নাট্য অভিযাত্রা করেছিলাম, সে সময় তা ছিল বেশ দুঃসাহসিক। কিন্তু ১৯৭৩ সালে থেকে নানা কারণে ভাটা পড়ে। এরপর ১৯৭৬ সালে ‘ওরা কদম আলী’ দিয়ে আবার মঞ্চে জায়গা তৈরি হলো। তারপর থেকে কখনো মঞ্চ থেকে বিচ্যুত হইনি।
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন আন্দোলনে আপনার অনন্য ভূমিকা, সে বিষয়ে বলুন?
১৯৮১ সালে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন গঠিত হলো, আমি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রথম প্রেসিডেন্ট রামেন্দু মজুমদার, আমি সবচেয়ে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি চার বছর ছিলেন, তারপর আমি প্রেসিডেন্ট হলাম। সেবার এক টার্ম ছিলাম, ২০০৫ সালে আবার প্রেসিডেন্ট হয়েছি। এটি সারা দেশের নাট্যকর্মীদের প্ল্যাটফর্ম। আমরা অনেক কাজ করতে পেরেছি। নাটকের ওপর সেন্সরশিপ ছিল, আন্দোলন করে ২০০১ সালে সেটি ওঠাতে পেরেছি। এই যে শিল্পকলা একাডেমির ভবন হয়েছে, এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ চালু হয়েছেএসব আমাদের আন্দোলনের ফসল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নাট্যকলা বিভাগগুলো কতখানি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে?
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে শুরু হয়েছিল প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যচর্চা। বিভাগটি আবার চালু হয়েছে। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয় ও কবি নজরুল বিশ^বিদ্যালয়ে নাটক বিভাগ চালু আছে। কিন্তু কোথায় যেন প্র্যাকটিশনারদের সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে উঠছে না। আমি বহু আগে ইন্টার্নশিপ চালু করার কথা বলেছিলাম। সেটাও কেন যেন চালু হলো না।
বাংলাদেশে রেপার্টরি থিয়েটার চর্চা শুরু করলেন আপনি ‘বাঙলা থিয়েটার’ দিয়ে। যে ভাবনা নিয়ে শুরু করলেন পরে কী ধরনের সংকটের কারণে নিয়মিত করতে পারলেন না?
ঢাকা শহরে ১০-১২টার বেশি রেপার্টরি রয়েছে। কিন্তু আমি যে সময় শুরু করেছিলাম তখন আমার গলা টিপে ধরা অবস্থা। কিন্তু সে পথে এখন অনেকেই হাঁটছে। আগামী ৫-৭ বছরের মধ্যে রেপার্টরি ও গ্রুপ থিয়েটার প্যারালাল জায়গায় থাকবে। রেপার্টরি ভালো গল্প নিয়ে প্রযোজনা মঞ্চে আনে। আর গ্রুপ থিয়েটারের তো নানা প্রসেস থাকে। দলের সিনিয়রদের ভালো একটা চরিত্র দিতে হবে, মাথায় কিছু না থাকলেও তাদের নেতৃত্বে রাখতে হবে।
বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে মুক্ত নাটক আন্দোলন একটা মাইলফলক। কিন্তু একটা সময় এসে সেটা বন্ধ করে দিলেন বা বন্ধ হয়ে গেল। কেন?
এনজিওরা মুক্ত নাটককে পপুলার থিয়েটার নাম দিয়ে করা শুরু করেছিল। তাদের সঙ্গে তখন অর্থেবিত্তে পেরে উঠি নাই। এমনকি আমার অনেক ভালো কর্মীকে ভালো বেতন দিয়ে নিয়ে যায়। তবে মুক্ত নাটক থেকে আমাদের প্রাপ্তি অনেক। শত শত গ্রামে আমরা মুক্ত নাটক করেছি। অনেক মানুষের সঙ্গে মিশতে পেরেছি, তাদের কাছ থেকে সত্যকে জেনেছি। এটা একটা বড় ব্যাপার। তবে মুক্ত নাটক এখনো শেষ হয়নি। অনেক জায়গায় এর চর্চা হচ্ছে।
মুক্ত নাটককে নতুন আঙ্গিক হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার অনুপ্রেরণা কী ছিল?
চীনে মাও সে তুঙের লংমার্চের সময় সঙ্গে সঙ্গে থাকত। একটি করে সাংস্কৃতিক দল। এরা প্রতিদিনের প্রতিটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাকে নাটকের আঙ্গিকে তুলে ধরত, তাদেরই ভাষায় এবং তাদেরই অভিনয়ের মাধ্যমে। এ থেকে মুক্ত নাটকের কনসেপ্ট আমার মাথায় আসে। পরে মানিকগঞ্জে গিয়ে মাটিকাটার শ্রমিকদের নিয়ে, তাদেরই একটি বাস্তব ঘটনাকে অবলম্বন করে তাদের দিয়ে এ ধরনের একটি পরীক্ষা চালাই। বলাবাহুল্য, নয়া আঙ্গিকের এ নাটক অধিকতর জীবন ও সমস্যা ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে বিপুল নিরক্ষর মানুষের মধ্যে সাড়া জাগায়। এগুলো অবশ্যই অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। আর একটি তাগিদ ছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাস নেই; অন্তত লিখিত। যেটুকু রয়েছে তা রাজা-উজিরের সিংহাসন কাহিনীতে সীমাবদ্ধ। টুকরো টুকরো বিদ্রোহ, আন্দোলন, বিশাল জনগোষ্ঠীর শোষকের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের বহু খ- ঘটনা বেঁচে আছে মুখে মুখে। একে বলা যেতে পারে আমাদের কথা ঐতিহ্য। যথা ওই তথ্যগুলোতেও আমি মুক্ত নাটকের উপাদান প্রত্যক্ষ করি।
বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের নাট্যচর্চা নিয়ে মূল্যায়ন শুনতে চাই?
রেপার্টরি চর্চা আরও বাড়ানো উচিত, গ্রুপ থিয়েটার চর্চার দিন ফুরিয়ে আসছে। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর যে দিন, সেটা তো আর নেই। আমাদের এখন পেশাদার থিয়েটার চর্চার দিকে হাঁটতে হবে। একসময় নিজের খেয়ে যে আবেগ উত্তেজনা নিয়ে আমরা গ্রুপ থিয়েটার চর্চা করেছি। এখনকার অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেটা করা কঠিন। রেপার্টরি চর্চার মধ্য দিয়ে এক ধরনের যে পেশাদার থিয়েটার চর্চার স্বপ্ন দেখছে কেউ কেউ, আমি সেটাকে সাধুবাদ জানাই।
টেলিভিশনের শুরু থেকে আপনি নাটক লিখছেন, সে অভিজ্ঞতা জানাবেন?
১৯৬৪ সালে তৎকালীন পিটিভি (বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি) এলো, ৬৫ সালে আমি সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। মনে মনে স্বপ্ন দেখতাম, যদি বিটিভিতে নাটক লিখতে পারতাম। ১৯৬৬-৬৭ সালে বিটিভিতে ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। ১৯৬৭ সালে আবদুল্লাহ আল মামুনের পেছনে ঘুরি। শেষে আবদুল্লাহ ইউছুফ ইমাম-টিভির প্রযোজক, ফিল্মেও কাজ করেছেনতিনি বললেন, নাটক লেখো। তিনিই আমার শুরু। যে নাটকটি লিখে দিলাম, তার পছন্দ হলো না। বাসায় ডাকলেন। কীভাবে স্ক্রিপ্ট লিখতে হয় শেখালেন। তারপর লিখলাম নাটক ‘চেনা মুখ’। ‘চেনা মুখ’ দেখে অন্য প্রযোজকরাও আকৃষ্ট হলেন। তারপর তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি হয়ে চলে গেলেন। তখন আবদুল্লাহ আল মামুন আমাকে ডাকলেন। তারপর শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ নাট্যরূপ দিলাম, এটি ১৯৬৯ সাল, আমার বয়স তখন একুশ। নাটকটি বেশ আলোচিত হয়েছিল।
সার্বিকভাবে আমাদের টেলিভিশন নাটকের অবস্থা এখন কেমন?
সব চ্যানেলই চায় হাসির নাটক প্রচার করতে। তার মানে মজার নাটক। এই মজা খুঁজতে গিয়ে আমাদের সমস্যা বাড়ছে। সব জায়গায় একটা হুড়াহুড়ি। এর মধ্যে কি ভালো কোনো কাজ হয়? এই হুড়াহুড়িটা কী করে যে আমদানি হয়ে গেল বিশ্বায়নের বদৌলতে বুঝতে পারলাম না এবং হঠাৎ করে আমরা ওয়েস্টার্ন হয়ে গেলাম। সামনের বাসায় কী হচ্ছে আমরা জানি না, খবরও রাখি না। এখন শত সিকিউরিটির মধ্যে হাজারো সমস্যা। টেলিভিশন মিডিয়ায় যারা কাজ করে তারা তো মহাব্যস্ত। সারা দিন-রাতে অবসর নেই। একেকজন তিন-চারটি সিরিয়ালের কাজ করেন প্রতিদিন। এই ব্যস্ত শিল্পীদের মাস হয় চল্লিশ দিনে।
আপনি মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা কেমন?
চলচ্চিত্রের একটা সময় স্বর্ণযুগ ছিল। তখন হিন্দি, উর্দু, কলকাতার বাংলা ছবি আসত। তার মধ্য থেকে একজন জহির রায়হান, ফতেহ লোহানী, মহিউদ্দিন ভাইয়ের জন্ম। তারপর নারায়ণ ঘোষ মিতা, খান আতাউর রহমান এলেন। খান আতার নবাব সিরাজউদ্দৌলা তো ওই সময় পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। শুধু এ ধরনের সৃজনশীল শিক্ষিত পরিচালকেরই জন্ম হয়নি একের পর এক অভিনেতা তৈরি হয়েছে। টেকনিশিয়ান তৈরি হয়েছে। বেবী ইসলাম, আবদুস সামাদ, সাধন রায়, অরুণ রায় ও আবদুল লতিফ বাচ্চু। এ ধরনের গুণী ক্যামেরাম্যান চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। বশির ভাই ও এনামুল হক নামে চলচ্চিত্রের নামকরা এডিটর ছিলেন। তারা অসাধারণ কাজ করেছেন। এসব অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের কারণে আমরা জীবন থেকে নেয়া, কাঁচের দেয়াল, কখনো আসিনির মতো অসংখ্য কালজয়ী ছবি পেয়েছি। আশির দশকে এসে চলচ্চিত্রের অধঃপতন শুরু হয়। গল্পের ছবি, কাটপিস, অশ্লীলতা এখন যৌথ প্রযোজনার নামে বিদেশি ছবি আমদানি হচ্ছে। জানি না চলচ্চিত্রের আগামী ভবিষ্যৎ কী?
