ভাইরাল কিংবা সেলিব্রিটি হয়ে ওঠা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:০৪ এএম

‘আপনি তো ভাইরাল হয়ে গেছেন’ কিংবা ‘আপনি তো সেলিব্রিটি হয়ে গেলেন’এমন প্রশস্তি বা কটূক্তি যেভাবেই বলা হয়ে থাকুক না কেন নেটিজেনদের মধ্যে পরস্পরকে এসব কথা প্রচলিত আছে। ভাইরাল শব্দটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে আর সেলিব্রিটি শব্দবন্ধটা ব্যবহৃত হয় মূলত তারকাখ্যাতি বোঝাতে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কের জগৎটা যেহেতু একেবারেই একবিংশ শতকে শুরু হয়েছে, তাই সভ্যতার বিভিন্ন সময়ে তৈরি হওয়া নানা তকমার ব্যবহার করেই চলছে মানুষের যোগাযোগ।

যোগাযোগের শুরুটা হয়েছিল নানা প্ল্যাটফর্মে কথা বলার মধ্য দিয়ে। তবে এমন ব্যক্তিগত যোগাযোগের বলয়কে টপকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে দিলেন একদল তরুণ। যাদের নেতৃত্বে ছিলেন এক প্রবাসী বাঙালি জাওয়াদ করিম। তারা তৈরি করলেন ভিডিও কনটেন্ট শেয়ার করার আন্তর্জালিক প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব। যাত্রার শুরুতে ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম হিসেবে একটু জটিল ঠেকলেও ২০০৬ সালে নানা ডেভেলপমেন্টের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী এই প্ল্যাটফর্ম ছড়িয়ে যায়।

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশে যার প্রচারণা শুরু হয় পরের বছর। তথ্য সংরক্ষণে দুর্বলতা থাকায় কে প্রথম ইউটিউবে ভিডিও কনটেন্ট আপলোড করেছিল তার সমর্থিত কোনো সূত্র না থাকলেও জনৈক শুভ্র কাজী নামের এক মিউজিশিয়ান তরুণ একটি মিউজিক ভিডিও আপলোড করেছিলেন বলে জানা যায়। এরপরের বছর ২০০৮ সালে সে সময়ের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চমক হাসান তার নিজের নামেই ইউটিউব চ্যানেল খোলেন।

তবে ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশিদের ব্যাপক অংশগ্রহণ শুরু হয় পরের দশকে। নিয়মিত ভিডিও কনটেন্ট বানাতে শুরু করে কিছু শহুরে উচ্চমধ্যবিত্ত তরুণ, যাদের মধ্যে সালমান মুক্তাদির অন্যতম। তিনি দেশে থাকতে কিছু কনটেন্ট আপলোড করলেও উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়া গিয়ে সেখানকার বাঙালি কমিউনিটিকে সঙ্গে নিয়ে নিয়মিত হন। তার কনটেন্টগুলো প্রবাসী বাঙালিরা ছাড়াও দেশের আপটাউন তরুণরা ফলো করতে শুরু করে। তার সাবস্ক্রাইবার বাড়তে থাকে। ইতোমধ্যে ২০০৮ সালে ইউটিউব কর্র্তৃপক্ষ তার ব্যবহারকারী বা কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য টাকা উপার্জনের সুযোগ তৈরি করে। যদিও সাবস্ক্রিপশন তেমন না বাড়ায় সে সময় বাংলাদেশের কনটেন্টে তেমন আয়-রোজগার হতো না। সালমান মুক্তাদিরের চ্যানেল সালতানাত দ্য ব্রাউন ফিশ কিছুদিনের মধ্যেই অল্পস্বল্প টাকা পেতে শুরু করে। যে কারণে সালমান তার ডিগ্রি সম্পন্ন না করেই দেশে ফিরে এসে কনটেন্ট নির্মাণ করতে শুরু করেন। ইউটিউব কর্র্তৃপক্ষও তাকে পরে সম্মাননা দেওয়ায় এই তরুণকেই ভিডিও কনটেন্ট আপলোডে পুরোধা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।

তবে ভিডিও কনটেন্ট ভাইরাল হতে বা তার প্রচারণায় অন্য সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম মানে ফেইসবুক কিংবা ইয়াহু গ্রুপগুলোও ব্যবহার করা হয়েছে এ সময়। এর মধ্যে পাশের দেশ ইন্ডিয়ায় কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ইউটিউবের প্রসার বাড়লে আমাদের দেশেও বেশ কিছু ব্যবহারকারী যাদের বেশির ভাগ জেড জেনারেশনের প্রতিনিধি কিশোর ও তরুণ ভিডিও কনটেন্ট বানাতে শুরু করেন। এই তরুণদের শুরুর দিককার কনটেন্টগুলোতে মূলত প্র্যাংক ভিডিও বানাতে দেখা যায়। যার মূল বিষয় ছিল অন্যদের বোকা বানানো। এ সময় প্র্যাংক কিং, মাসনুন সূর্য, ছোট আজাদএমন বেশ কয়েকজন রীতিমতো সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন ভিডিও কনটেন্ট বানানোর আন্তর্জালিক সাম্রাজ্যে।

২০১৫ সাল সোশ্যাল নেটওয়ার্ক-নির্ভর কনটেন্ট নির্মাণের স্বর্ণসময়। এ সময়টাতেই সালমান মুক্তাদিরের দেখাদেখি অনেক তরুণ ভিডিও কনটেন্ট নির্মাণকেই তাদের পেশা হিসেবে গ্রহণ করার সাহস দেখাতে শুরু করেন। এই তরুণদের বেশির ভাগের বয়স তখন আঠারো থেকে বাইশের মধ্যে। অনেকে টাকাপয়সা বিনিয়োগ করতেও শুরু করেন তাদের কনটেন্টের চেহারা সুন্দর করতে। যে আগে শুধু মানুষকে বোকা বানানোর ভিডিও তৈরি করত তার ইউটিউব চ্যানেলে ভ্রমণের কনটেন্ট আপলোড করে। নতুন একটা শব্দ যুক্ত হয় আন্তর্জালিক অভিধানে। মানুষ লাইফস্টাইল কিংবা ট্রাভেল ভিডিওকে ভøগ ডাকতে শুরু করেছে। এই তরুণরা তখন ছোট নাটিকাও তৈরি করত। হয়তো ফেইসবুকে কেউ ভাইরাল হয়েছে ভুল সুরে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে তাকে ইউটিউব কনটেন্টে অতিথি হিসেবে ডেকে আনা হতো। এই নেমন্তন্নে তারা সেই অযাচিত শিল্পীকে সম্মানীও দিতেন।

তারপরের বছর ভিডিও কনটেন্ট বানানোর ধরন একেবারেই অন্যরূপ ধারণ করে। টেলিভিশন অনুষ্ঠানের বিকল্প হিসেবে নিজেরা স্যাটায়ার নাটক তৈরি করে, ভ্রমণের কাহিনীগুলোতেও ক্যামেরার কারসাজি যুক্ত হয়। এই যে ভিডিও কনটেন্ট বানানো ও দেখার উৎসব শুরু হলো তার পেছনে দুটো খুব সিগনিফিকেন্ট কারণ উল্লেখ করা যায়। প্রথমত, নিজেরা অন্যের মুখাপেক্ষী না থেকে তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো দেশের টেলিভিশনশিল্প নির্ভরযোগ্যতা হারিয়ে প্রায় মৃত্যুর পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। ভ্লগ নির্মাতারা কনটেন্টেও বৈচিত্র্য খুঁজতে শুরু করতে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন। তারা রূপচর্চা, রান্নাবান্না, বাজার-সদাই নানা কিছু নিয়ে ভিডিও কনটেন্ট হাজির করেন।

এ সময় অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে অনেকে শোবিজ তারকাদের চেয়েও পরিচিত ও চর্চিত হতে শুরু করেন। তৌহিদ আফ্রিদি, মাসনুন সূর্য, প্রত্যয় হিরণরা তখন জনতার সেলিব্রিটি হিসেবে পরিগণিত। ছোট আজাদরা তখন বড়ভাই হিসেবে মানুষকে ভিডিও বানাতে পরামর্শ দেন। এমন এক পরিস্থিতিতে সামাজিক পরিমণ্ডলে মোটামুটি সফল ব্যক্তির ভিডিও কনটেন্ট নির্মাণে আগ্রহ দেখান। সোলায়মান সুখন, ডন সামদানীরা মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে নিজেদের ভিডিও আপলোড করেন। পুরনো ইউটিউবারদের অনেককে নিয়ে তখন অডিটোরিয়াম ভাড়া করে দর্শনীর বিনিময়ে মোটিভেশনাল বক্তব্য দেওয়ার অনুষ্ঠান হয়।

ভিডিও কনটেন্ট জগতে অবশ্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় রান্নাবান্না। কনটেন্ট হিসেবে রান্নার গ্রহণযোগ্যতা সব বয়সী নারী-পুরুষের কাছে প্রায় কাছাকাছি মাত্রার। মিলেনিয়াল সংসারগুলোতে ব্যাপারটা আরও প্রকট। ইউটিউবে রেসিপি দেখা ছাড়া কোনো বেলার রান্না হয় না বাড়িতে। রান্নার কনটেন্ট আপলোড করে পরিচিত হয়েছেন এমন কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যাক। রুমানা আজাদ, মুক্তি আফরোজ, জান্নাত বৃষ্টি, ইকবাল হোসেনরা একসময় রান্নার ভিডিও আপলোড করতে শুরু করেন।

অনলাইন ভিডিও কনটেন্ট নির্মাণের ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগের পরিমাণ এখন দেশের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির কাছাকাছি হলে অবাক হব না। মানুষ ভাইরাল আর সেলিব্রিটি হতে স্বপ্ন লালন করেন। সেই স্বপ্ন দাবিয়ে রাখাটা মনে হচ্ছে বেশ কঠিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত