দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে জঙ্গি সংগঠন ও সদস্যদের এখনো মূলোৎপাটন করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গতকাল বুধবার রাজধানীর মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজে পুলিশ মেমোরিয়াল ডে উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি আদালত থেকে পালানো জঙ্গিদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। তাদের খোঁজা হচ্ছে। অতীতে জঙ্গি পালিয়েছে, তাদের ধরা হয়েছে। এ জঙ্গিদেরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে ফেলবে। বাংলা একাডেমির বইমেলায় হামলার হুমকির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এরকম উড়ো চিঠি আসে। তবে এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। জঙ্গিদের উত্থান ও তাৎপরতা নিয়ে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন। যখন যেখানে যে তথ্য পাচ্ছেন সে অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কিন্তু আমরা জঙ্গিদের মূলোৎপাটন করে নিঃশেষ করতে পারিনি। রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রতিটি দল তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করবে এটাই আমরা যুগ যুগ ধরে দেখে আসছি। নির্বাচন এলে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের মতাদর্শ প্রচার ও মতামত নিয়ে কাজ করে। সামনে নির্বাচন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়নি। সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার কোনো অবস্থা তৈরি হয়নি।
বর্তমান সরকার পুলিশের উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল থাকা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সরকারের ২০৪১ ভীষণ বাস্তবায়নে নিয়ামক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। ২০২২ সালে ২৯১ জন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। তার মধ্যে ১২১ জন কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। পুলিশ সদস্যরা সবসময় আন্তরিক, কর্তব্যনিষ্ঠ ও দেশের জন্য তারা কাজ করেন। কাজ সমাধান করতে তারা পিছপা হন না, জীবন গেলেও তারা তাদের কর্তব্যের কথা ভোলেন না। তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রইল। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জনমন স্থির রাখা পুলিশ বাহিনীর অন্যতম কাজ। জানমাল রক্ষায় পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সর্বদা সচেষ্ট নিবেদিত।
করোনাকালে পুলিশের ভূমিকা স্মরণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, করোনাকালে আমরা দেখেছি পুলিশের কর্তব্যবোধ। সে সময় হাসপাতালে নিকটাত্মীয়ের মরদেহ ফেলে যেতে দেখেছি স্বজনদের, সেখানে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা তার শেষ কাজটুকু করেছে পরম মমতা নিয়ে। বঙ্গবন্ধু যেই পুলিশ চেয়েছিলেন, আজকের সেই পুলিশ জনগণের পুলিশ হয়েছে। বাংলাদেশের সব কাজে তারা ভূমিকা রাখছেন। এরা তাদের সবকিছু ত্যাগের পরও দায়িত্বে থাকেন। সে জন্যই আমরা দেশকে নিরাপত্তা দিতে সমর্থ হয়েছি। অনুদানের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চাকরিরত অবস্থায় নিহত পুলিশের পরিবারের কল্যাণের দিকে লক্ষ্য রেখে, এককালীন আর্থিক অনুদানের ৫ লাখ টাকার প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ৮ লাখ টাকা করেছে। ২০২০ সালে ১ অক্টোবর এ অনুদানের পরিমাণ ৮ লাখ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়াও চাকরিরত অবস্থায় স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে অবসরে গেলে সাহায্যের পরিমাণ ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে।
২০০০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিএনপি জামায়াত-শিবির, হেফাজত ইসলাম ও দুর্বৃত্তের হামলায় কর্তব্যরত অবস্থায় বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে এককালীন ৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ২০২০ সাল থেকে পুলিশ সদস্যদের আজীবন রেশন সুবিধা প্রদান করছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল থাকা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা একান্ত অপরিহার্য। সরকারের প্রকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে অন্যতম নিয়ামক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে পুলিশের সব সদস্যকে সততা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।
এদিকে, কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত পুলিশ সদস্যদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২০২২ সালে ১২১ জন বীর পুলিশ সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। যতই বাধা আসুক না কেন, দেশের স্বার্থে মানুষের স্বার্থে আপনাদের কাজ করে যেতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে পুলিশপ্রধান আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ শতবর্ষের পুরনো একটা প্রতিষ্ঠান। দেশের সেবায়, মানুষের সেবায়, সরকারের নির্দেশনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সবসময় পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। এ দেশের মানুষকে নিরাপদে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের প্রতিটি সদস্য তাদের নিজে দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করছে। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গত বছর ১২১ জন সদস্যকে আমরা হারিয়েছি। আইজিপি বলেন, অন্য সংস্থার সদস্যরা কাজে যান, আবার সন্ধ্যায় ফিরে আসেন। কিন্তু পুলিশের কোনো কর্মঘণ্টা নেই, তারা ফিরে আসবে কি না সে নিশ্চয়তা নেই। তাদের আত্মত্যাগ আমাদের উজ্জীবিত করে। পেশাগত দায়িত্ব পালনে আরও শানিত করে। জীবন উৎসর্গকারী পুলিশ সদস্যের পরিবারে যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকার আশ্বস্ত করেন তিনি। পরে আইজিপি এসব পরিবারের স্ত্রী, সন্তান ও পিতা-মাতার খোঁজখবর নেন।
