নিয়ম ভেঙে গাড়ি ক্রয়, বেতনভাতা ছাড়াও ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণের অভিযোগে জরিমানার কবলে পড়েছেন উত্তরা বাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রবিউল ইসলাম। পাশাপাশি বাসার বাবুর্চি, গার্ড, সার্ভিস চার্জ, লিভ ফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্স ইত্যাদি বাবদ ব্যাংক থেকে নেওয়া টাকার বিপরীতে কোনো রাজস্ব দেননি এই এমডি। এতসব অভিযোগের বিপরীতে তাকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উত্তরা ব্যাংকের একজন পরিচালককে সুবিধা দিতে টয়োটা করোলা ১.৬ এল গাড়িটি ক্রয় করেন উত্তরা ব্যাংকের এমডি। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত না করেই স্পেশাল বোনাস ও বৈশাখী ভাতা গ্রহণ করেছেন তিনি। সম্প্রতি এ জন্য তাকে ১২ লাখ ৯০ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে সেই টাকা ফেরতও দিয়েছেন রবিউল ইসলাম। কিন্তু রাজস্বের বাকি টাকা পরিশোধ করেছেন কি না তার জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে উত্তরা ব্যাংকের এমডির মাসিক বেতন ১৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে মূল বেতন, বাসা ভাড়া, বাবুর্চি, গার্ড, সার্ভিস চার্জ, পুনঃভরণ ভাতা, বাসা মেরামত, আসবাবপত্র, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, টেলিফোন বিল, ঈদের ভাতা এবং জিপ গাড়ির খরচ অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এর বাইরেও তিনি ২০১৮, ’১৯, ’২০, ’২১ ও ’২২ সালে করোনাকালীন ভাতা, স্পেশাল বোনাস এবং বৈশাখী বোনাস গ্রহণ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাননি। এ ছাড়া ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত চিকিৎসা বাবদ তিনি ২৪ লাখ ২৯ হাজার ৪৫৩ টাকা ব্যাংক থেকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী যত টাকা রাজস্ব দেওয়ার কথা তা পরিশোধ করেননি। শুধু তাই নয়, বাসায় কুক, গার্ড, সার্ভিস ইত্যাদির জন্য ব্যাংক থেকে নেওয়া ২ লাখ ৬৩ হাজার ৫৩৮ কোটি এবং লিভ ফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্স বাবদ নেওয়া ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার বিপরীতে কোনো রাজস্ব দেননি এমডি।
এদিকে ব্যবস্থাপনার পরিচালকের পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য গাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও হয়েছে অনিয়ম। ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতিমালা অনুযায়ী, একজন পরিচালক, তার একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, অংশীদারিতে পরিচালিত ফার্ম, পরিচালক হিসেবে আছেন এমন প্রাইভেট ও পাবলিক কোম্পানি, জামিনদাতা হিসেবে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং পরিচালকের স্ত্রী, স্বামী, পিতা, মাতা, সন্তান, ভাই, বোন এবং পরিচালকের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তির অনুকূলে সকল প্রকার ঋণ সুবিধা, গ্যারান্টি এবং অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠের পূর্বানুমোদন গ্রহণ করার বিধান রয়েছে। কারণ নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে ব্যাংকের ব্যবহার করা জিনিসপত্র কিনলে অনিয়ম হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু উত্তরা ব্যাংকের এমডি রবিউল ইসলাম নাভানা লিমিটেড থেকে পরিবারের ব্যবহারের জন্য টয়োটা করোলা ১.৬ এল গাড়িটি ক্রয় করেছেন। নাভানা লিমিটেডের পরিচালক শফিউল ইসলাম হচ্ছেন উত্তরা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইফতেখারুল ইসলামের ভাই। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, এমন ক্রয়ে ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের কার্যবিবরণীতে এ বিষয়ক কোনো এজেন্ডা থাকার কথা। কিন্তু কার্যবিবরণীতে তা দেখা যায়নি।
একই ঘটনা ঘটেছে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিজের জন্য কেনা গাড়ির ক্ষেত্রেও। চেয়ারম্যানের ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান থেকে গাড়িটি কেনা হয়েছে। চেয়ারম্যানের টয়োটা ল্যান্ড কুইজার প্রাডো টিএক্সেল ২০১৯ কেনার সময়ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গাড়ির স্পেসিফিকেশনসহ কোটেশন দাখিল করার জন্য কোনো পত্র, চূড়ান্ত ক্রয় আদেশ এবং ডেলিভারি প্রত্যয়ন দিতে পারেনি। অর্থাৎ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কারও গাড়ি কেনার আগে বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রথমে চাহিদাপত্র পাঠাতে হয়। সেই চাহিদা ভিত্তেতে তারা ব্যাংকের কাছে গাড়ির দাম প্রস্তাব করে। সেই দাম পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদন হলেই গাড়ি কেনার বৈধতা পায় ব্যাংক। কিন্তু এখানে প্রক্রিয়ার অনুসরণ হয়নি এবং প্রক্রিয়াসংশ্লিষ্ট কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি উত্তরা ব্যাংক।
সার্বিক বিষয়ে উত্তরা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগ করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লিখে পাঠালে তা দেখেও (সিন) কোনো উত্তর দেননি।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ও নীতি বিভাগের পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র সারওয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংকের এমডিদের তাদের বেতনভাতাসহ যাবতীয় ভাতা নির্ধারিত থাকে। এর বাইরে তাদের কোনো ভাতা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। যদি কেউ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত না করে কোনো ভাতা নেন তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ছাড়া এমডি বা তার পরিবারের গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা রয়েছে। যদি কেউ তা লঙ্ঘন করেন তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।’
