হাওর-সংস্কৃতি

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৩, ১২:৪৬ এএম

উত্তরে বাতাস বইছে। ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছিল বাঁশের আড়ে। এর পাশেই প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে অর্ধভাঙা হয়ে পড়া উঠোনে বসে পদ্মপুরাণ গাইছিলেন জনাকয়েক নারী। শ্রাবণের সেই বিকেলে নারীরা একটু পরপর ধুয়া গাইছিলেন, ‘বাঁশিয়া নাগর কানাই তোর লাগি পোড়ে রাধার মন॥’ দুর্গম হাওরবেষ্টিত সেই নাইন্দা গ্রামে সেবার পদ্মপুরাণ শুনতে শুনতে বিকেলে গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, পরে রাত। ততক্ষণে ধুয়াও বদলে গেছে, ‘ধৈর্য না মানে প্রাণে নিষেধ না মানে/ ক্ষণে ক্ষণে দহে চিত্ত কালা কানু বিনে॥’

এক ধুয়া থেকে আরেক ধুয়ায় আসার আগে শত শত পয়ার, লাচাড়ি পাঠের ফাঁকে কথা হয় সেসব গ্রামীণ শিল্পীর সঙ্গে। তারাই জানান, ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে গ্রামের সাংস্কৃতিক পরিবেশ। প্রযুক্তির কারণে গ্রামের মানুষের মধ্যেও লেগেছে শহুরে ছোঁয়া। বিনোদনের এখন অবারিত সুযোগ। সবার হাতের মুঠোয় ইউটিউব-ফেইসবুক। ফলে পল্লীগানের আসর এখন কালেভদ্রে বসে। ধর্মীয় লোকাচারকেন্দ্রিক কিছু অনুষ্ঠান ছাড়া গান, যাত্রা, পালার অস্তিত্ব ধীরে ধীরে কমছে। যে উঠোন ছিল গ্রামীণ মানুষের মূল বিনোদনমঞ্চ, সেই সোনালি ঐশ্বর্যই এখন প্রায়-অতীত। অথচ নয়ের দশকের গোড়া পর্যন্ত কতই না প্রাণবান ছিল হাওরের সংস্কৃতিএকবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসেই মূলত হাওরের চিরচেনা সাংস্কৃতিক ভূগোল বদলে যেতে থাকে। বোরো ধান কর্তনের পর যখন বর্ষার পানিতে থইথই করে চারপাশ, তখন আর আগের মতো অবসরের একঘেয়েমি কাটাতে গ্রামে-গ্রামে ঘাটুগান, মালজোড়া, যাত্রা কিংবা বাউল গান ও কিচ্ছাপাঠের আসর বসে না। পাঁচ-দশ গ্রামজুড়ে প্রচারণা চালিয়ে হয় না নৌকাবাইচও। কিংবা শুষ্ক মৌসুমে কর্মব্যস্ত সময়ের ফাঁকে জমকালো আয়োজনে ষাঁড়ের লড়াই কিংবা লাঠিখেলা অথবা অন্য কোনো লোকক্রীড়ার আয়োজনও সে-অর্থে আর নেই। এমন নেই কত কিছুই। তবে নিয়ম করে ঠিকই ঋতুর বদল ঘটে হাওরে, তিথি-নক্ষত্র-ক্ষণ মেনে চলে মেলা, পদ্মপুরাণ পাঠ, কীর্তন ও মহররমের আয়োজন। বিয়েকে উপলক্ষ করে ঘটা করে হয় ধামাইল কিংবা বিয়ের গীতের আয়োজন। তবে এসবের পরিসর এখন অনেকটাই ছোট হয়ে এসেছে। দাপট কমছে গ্রামীণ শিল্পীদেরও।

এই যে হাওরের শিল্পীদের দাপট কমছে কিংবা গানের আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক পরিসর কমে আসছে, এর নানামুখী কারণও আছে। একে তো জলবায়ু বদলে গেছে ঢের। ছয় মাস পানি আর ছয় মাস শুকনোএমন রীতিরও ঘটেছে পরিবর্তন। বর্ষায় আগের মতো জনপদ-কাঁপানো পানি আর আসে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাওর সমুদ্রের বিশালতা পেলেও আফালের প্রলয়নৃত্যের দেখা খুব একটা মেলে না। এর পরও বর্ষার বাড়ন্ত যৌবনে এখনো বুক চিতিয়েই হাওরের মানুষকে পানির উতরোলের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচেবর্তে থাকতে হয়। শিলাবৃষ্টিতে এখনো যেমন ক্ষেতের পর ক্ষেতের ফসল বিনষ্ট হয়, তেমনই অকালবন্যায় ভাঙে বাঁধ। এখনো অভাব আছে, দুঃখ আছে। এখনো যেকোনো উৎসব-পার্বণে সম্মিলিত আনন্দযজ্ঞে শামিল হন ভাটির মানুষ। তবে এখন মাঝখানে ঢুকে গেছে প্রযুক্তি। ফলে গ্রামগঞ্জ আলোড়িত করা লোকগান, লোকনাট্য কিংবা লোকক্রীড়ার আয়োজনে ভাটা পড়েছে। আগের মতো আর বসে না কিচ্ছা, পুথিপাঠ, যাত্রাগান, গাজির গান, সূর্যব্রতসংগীত, হোরিগান, লাম্বাগীত, হালতিগান ও ভট্টসংগীতের আসর। চৈত্র-বৈশাখের গ্রামীণ মেলায়ও ধীরে ধীরে কমছে মানুষের উপস্থিতি। মেলায় বেত ও কারুশিল্পের বদলে ঠাঁই নিয়েছে প্লাস্টিক পণ্য।

প্রকৃতি, প্রযুক্তি, ব্যস্ততাসবকিছুই এখন যেন পল্লী সংস্কৃতির বিপরীতে ভিলেন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে হাওরের সাত জেলাতেই অর্থাৎ সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনায় হারিয়েছে অনেক গানের ধারা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর বৈচিত্র্য। এর পরও কোনো রকমে যেসব গান, নাট্য আর ক্রীড়ার ধারা-উপধারা টিকে আছে, তাও যদি পৃষ্ঠপোষকতা পেত, তাহলেও গর্ব করার মতো এখনো অনেক কিছু উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। এখনো তো বিয়ের আয়োজনে হিন্দুবাড়িতে গ্রামীণ নারীরা টানা কয়েক দিন বসান ধামাইল গানের আসর। আবার মুসলিম-বাড়িতেও বিয়ে উপলক্ষে আয়োজন করা হয় গীতের। মহররমের সময় এখনো ভাটির অনেক গ্রামে জারি-মার্সিয়া ভেসে বেড়ায় আকাশে-বাতাসে। এখনো প্রতি শ্রাবণে পদ্মপুরাণ পাঠে মুখর হয় হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম। হামদ, নাত আর কীর্তন, ঢপযাত্রা, পাঁচালি, পালাগানের আবেদন এখনো ফুরোয়নি। এখনো উৎসব-পার্বণে চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি বিশেষ রঙে নানা নকশার আলপনায় রাঙিয়ে দেওয়া হয় উঠোনেহাওরের সংস্কৃতি থেকে যেমন কত কিছুই চিরতরে হারিয়ে গেছে, তেমনই প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বিরুদ্ধবাদী পরিবেশ-পরিস্থিতি সত্ত্বেও এখনো বোহিমিয়ান হয়ে ঘুরে বেড়ান কতশত সাধক, শিল্পী ও মহাজন। এখনো তো রাধারমণ, রশিদ উদ্দিন, উকিল মুনশি, মদন সরকার, দীন শরৎ, কামাল উদ্দিন, শাহ আবদুল করিম, দুর্বিন শাহ, জালালউদ্দিন খাঁ, প্রতাপ রঞ্জন তালুকদার, মো. শফিকুন্নুরদের উত্তরসূরি হয়ে হাওরের গীতরীতি, নাট্যরীতি আর নৃত্যধারাকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন জানা-অজানা অনেক পালাকার, সাধক আর শিল্পী। গ্রামে গ্রামে এখনো কৃষিকর্তন উপলক্ষে ঘটা করে আনন্দ-আয়োজন চলে। বর্ষায় ভাসান পানিতে মাছ ধরতে ধরতে কিংবা মাঝি নৌকা বাইতে বাইতে এখনো সুরে-বেসুরে আপন খেয়ালে গেয়ে চলেন ভাটিয়ালি গান। আগের ঐতিহ্য না-থাকলেও এখনো স্বমহিমায় প্রোজ্জ্বল হাওরের গান-নাট্যের অনেক ধারা।

হাওরের গান-নাট্যের ধারা-উপধারার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নিয়ে ঘরোয়া এক আড্ডায় চমৎকার কথা বলেছিলেন পির নজরুল ইসলাম। ফকিরিগানের এই গীতিকারের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের চণ্ডীপুর গ্রামে। তিনি মারা যাবেন অন্তত মাস-ছয়েক পর, এর ঠিক সপ্তাহখানেক আগে নিজ বাড়িতে বসে নজরুল বলেন, ‘মানুষের আকাক্সক্ষা, চাহিদা আর রুচির বদল হয়। দুঃখ-কষ্টের বদল হয় না। দুঃখ যত দিন থাকবে, গানও তত দিন থাকবে।’ গ্রাম-এলাকার হাতে-গোনা কিছু মানুষ ছাড়া নজরুল ইসলাম বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে অখ্যাত, অপরিচিত। অথচ কী সারবান তার কথা! শারীরিকভাবে হারিয়ে যাওয়া এই গীতিকার যে গভীরতম উপলব্ধির নির্যাস কয়েকটি পঙ্ক্তিতেই বলে গিয়েছেন, তাতে আশাবাদী হতেই হয়। নিশ্চয়ই শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও হাওরের বাতাসে সুর আর পদ পাখির মতো নিজস্ব সৌন্দর্যে নিরন্তর উড়বে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত