নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে অন্তত ৮৩২ বিঘা কৃষিজমি জোর করে দখলের পর বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলেছে ভূমিদস্যুরা। কুতুবপুর, মোচারতালুক, তারাইলসহ আশপাশের বিভিন্ন মৌজার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে গড়ে উঠছে আবাসন প্রকল্প। কয়েক বছর আগেও যেখানে চলাচল করত নৌযান, মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত জেলেরা, হতো নানা জাতের ফসলের আবাদ। সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে সেখানে ‘রিমঝিম টাউন’ নামে একটি আবাসন প্রকল্পের সাইনবোর্ড দেখা গেছে। আর শুধু তা-ই নয়, ইট-পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে রিমঝিম টাউনের অফিস।
এলাকাবাসী বলছেন, জোর করে জমি দখল করে এই আবাসন প্রকল্পটি গড়ে তোলা হচ্ছে। কৃষিজমির পাশাপাশি অনেকে ভিটেবাড়িও হারিয়েছেন। তারা এখন উদ্বাস্তুর মতো অসহায় জীবনযাপন করছেন। একই সঙ্গে পরিবেশ বিপর্যয়ের চিত্রও দেখা গেছে। শুরুর দিকে কেউ কেউ প্রতিবাদ করে উল্টো হামলা-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাই এখন ভয়ে কেউ আর মুখ খোলার সাহস করেন না।
নথিপত্র ঘেঁটে ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করাটিয়া মৌজায় ৪৯৫ শতাংশ, কুতুবপুর (১ নম্বর সিট) মৌজায় ৬৬০০, কুতুবপুর (২ নম্বর সিট) মৌজায় ৫৬০০, তারাইল (২ নম্বর সিট) মৌজায় ৪৪৮৮, মোচারতালুক (১ নম্বর সিট) মৌজায় ২৯৩৭, মোচারতালুক (২ নম্বর সিট) মৌজায় ৩০৫০, আদলা মৌজায় ৫৪৬ এবং ভোলাব মৌজায় ৩৮০০ শতাংশ কৃষিজমি এরই মধ্যে বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এ নিয়ে ২০১৭ সালে জমির মালিকরা মামলা করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে রিমঝিম টাউনকে কৃষিজমিগুলোর দখল না নিতে ও ভরাট করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন না করতে ২০১৮ সালে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা দেয়। কিন্তু উচ্চ আদালতের সেই নির্দেশ মানেনি রিমঝিম টাউন।
নেপথ্যে মন্ত্রীর এপিএস এমদাদ : হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করা এই চক্রটির নেপথ্যে কে তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে নামটি সামনে আসে তিনি হলেন রূপগঞ্জের সংসদ সদস্য মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর এপিএস ইমদাদ। ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই ইমদাদই ভূমিদস্যু চক্রটির হোতা। রূপগঞ্জে তার রয়েছে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। অন্যের কৃষিজমি দখল করে ভরাটের ক্ষেত্রে রিমঝিম টাউন কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হলে ইমদাদ তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে তা মোকাবিলা করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইমদাদের ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ভোলাব ইউনিয়নের ছাদেকের ছেলে কাওসার, অস্ত্র মামলার আসামি মুরাদ, আরাফ, জাহিদ খন্দকার ও হাসান আসকারী। এ ছাড়া চাঁদপুর এন্টারপ্রাইজ, আল-হাবিব এন্টারপ্রাইজ, ঘোড়াশাল এন্টারপ্রাইজ, আড়িয়াল এন্টারপ্রাইজ, সায়েম এন্টারপ্রাইজ এবং একতা এন্টারপ্রাইজের ড্রেজার দিয়ে জোর করে কৃষিজমি ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে রিমঝিম আবাসন প্রকল্প।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাদশা মিয়াসহ ভুক্তভোগী ৪৫ জনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে কুতুবপুর মৌজায় জমি ভরাটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল হাইকোর্ট। শুধু তা-ই নয়, জোর করে ভরাট করা ওইসব জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্টের ওই আদেশকে যেন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আরও বেপরোয়া গতিতে জমি ভরাট কার্যক্রম চালিয়ে গেছে ভূমিদস্যু চক্রটি।
ভুক্তভোগী বাদশা মিয়া বলেন, ‘রিমঝিম টাউন মাত্র তিন বিঘা জমি কিনেছিল এখানে। তিন বিঘা জমি ভরাট করতে গিয়ে তারা আশপাশে থাকা এলাকাবাসীর কৃষিজমিও জোর করে ভরাট করা শুরু করে। তখন আমরা আদালতে মামলা করি। হাইকোর্ট আমাদের জমি ফিরিয়ে দিতে ও জমিতে বালি না ফেলতে আদেশ দিলেও সেটি মানা হয়নি। বরং এরপর থেকে শত শত বিঘা কৃষিজমি ভরাট করে ফেলেছে। জমি নিজেদের দখলে নিয়ে নামমাত্র মূল্যে এলাকার জমির মালিকদের জমি লিখে দিতে বাধ্য করছে। তিনি (রিমঝিম টাউনের এমডি) টাকা দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা ও প্রশাসনকে কিনে রেখেছেন। এজন্য আদালতের নির্দেশনা না মানলেও স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
এ বিষয়ে আদালতে দেওয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনের মতামত ও পর্যালোচনায় বলা হয়, রিমঝিম টাউন কর্র্তৃপক্ষ করাটিয়া মৌজায় প্রায় ৪৯৫ শতাংশ, কুতুবপুর মৌজায় ৬৬০০ শতাংশ জমি বালি দিয়ে ভরাট করেছে। এর বাইরেও উল্লিখিত মৌজা দুটিতে ব্যাপক হারে কৃষিজমি ভরাট করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের নথিপত্র অনুযায়ী, রিমঝিম টাউন কর্র্তৃপক্ষ প্রায় ১২ হাজার ৯৬৯ শতাংশ কৃষিজমি বালু দিয়ে ভরাট করেছে। সম্প্রতি সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রিমঝিম টাউনের ভরাট আর দখলদারিত্বের পরিসীমা বাড়ছেই। আদালত কৃষিজমি দখল ও ভরাটে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর বেপরোয়া গতিতে করা হয়েছে দখল ও ভরাট। এলাকাবাসী জানান, এভাবে রিমঝিম টাউন প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার শতাংশ বা প্রায় ৮৩২ বিঘা কৃষিজমি ভরাট করে দখলে নিয়েছে।
হাইকোর্টের ওই আদেশের পর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর। আদালতের আদেশ তো মানেইনি বরং যত দিন যাচ্ছে ততই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আবাসন প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এই হাউজিং প্রতিষ্ঠানটি আরও বেপরোয়া হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষিজমি, ভিটেবাড়ি, পুকুরসহ সরকারি খাল-বিল সবই গিলে খাচ্ছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার শতাংশ জমি বালু ফেলে ভরাট করছে। ভরাট করা দখলি জমিতে স্থায়ী স্থাপনাও নির্মাণ করা হচ্ছে।
পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি : বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে বলা আছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো এলাকায় কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। আইনে প্রকল্প চালু করতে হলে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত-২০১০)-এর ৬ ধারার বলা আছে, আইনে যাই থাকুক না কেন, জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার অন্য কোনোভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না।
রিমঝিমের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষিত : জোর করে কৃষিজমি দখল ও ভরাটের বিষয়ে রিমঝিম টাউনের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর হাইকোর্টে রিট পিটিশন করা হয়। একই বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে অভিযোগ করা হয় ২০১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। পরিবেশ অধিদপ্তর প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, পিটিশনার, রেসপনডেন্ট ও স্থানীয়দের সাক্ষ্যগ্রহণ এবং নোটিস ও দলিলাদি পর্যালোচনা শেষে বিস্তারিত বর্ণনা করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রূপগঞ্জ থানার চারিতালুক এলাকায় কাজলা বিল ও এর সঙ্গে লাগানো সরকারি খাল, পাশের কৃষিজমি অবৈধভাবে বালি দিয়ে ভরাট করেছে রিমঝিম টাউন কর্র্তৃপক্ষ।
আদালতে দেওয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সিনিয়র কেমিস্ট মো. নয়ন মিয়া ও পরিদর্শক মো. মইমুন হক ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এলাকাটিতে অবৈধভাবে বালু ভরাটের বিষয়টি সরেজমিনে প্রমাণিত হলে ২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রিমঝিম পুলিশ টাউনকে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। নোটিসে প্রকল্পের জমির মালিকানার সপক্ষে দলিল/পর্চা, দাগ খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, রাজউকের অনুমোদনপত্র ৭ কার্যদিবসের মধ্যে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ওই বছরেরই ২৭ সেপ্টেম্বর রিমঝিম ল্যান্ড ডেভেলপার অ্যান্ড হাউজিং লিমিটেডের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মো. ওয়ালিউর রহমান পরিবেশ অধিদপ্তরে জবাব দাখিল করেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, কাজলা বিলসংলগ্ন সরকারি খাল ও পার্শ্ববর্তী কৃষিজমিতে রিমঝিম টাউনের কোনো ধরনের আবাসন প্রকল্প নেই এবং রিমঝিম টাউন কর্র্তৃপক্ষ কোনো ভরাট কাজ করেনি। জায়গাটিতে তাদের হাউজিং কোম্পানি নেই বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের চাওয়া কাগজপত্র সরবরাহে অপারগতা প্রকাশ করেন ওয়ালিউর রহমান। এরপর ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর বাদশা মিয়া গং বাদী হয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন। ওইদিনই আদালত করাটিয়া, মোচারতালুক, তারাইল ও কুতুবপুর মৌজায় ভূমি ভরাটের বিষয়ে পরিদর্শন করতে আবার পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়। এরপর ওই বছরের ৩০ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর রিমঝিম টাউনের মনোনীত কর্র্তৃপক্ষকে নিয়ে গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে আবার সরেজমিনে পরিদর্শন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে।
আদালতে দেওয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় রিমঝিম টাউনের পক্ষে মো. সুমন মিয়া নামের একজন প্রতিনিধি ও বাদী বাদশা মিয়াসহ কয়েকশ গ্রামবাসী, সার্ভেয়ার মাস্টার শহীদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় গ্রামবাসী অভিযোগ করেন তাদের কৃষিজমি না কিনেই জোর করে রিমঝিম পুলিশ টাউন কর্র্তৃপক্ষ ভরাট করেছে। গ্রামবাসীর তোপের মুখে পড়ে একপর্যায়ে রিমঝিমের মনোনীত প্রতিনিধি সুমন মিয়াও স্বীকার করেন দখল করে জমি ভরাটের কথা। ওই সময় তিনি জানান, রিমঝিম করটিয়া মৌজায় ৯০০ শতাংশ, কুতুবপুর ও করাটিয়া মৌজায় ৩০০০, কুতুবপুর ও মোচারতালুক মৌজায় ৩৩০ শতাংশ জমি ভরাট করেছে। এ সময় জমি ভরাটের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে কোম্পানির প্রতিনিধি সুমন মিয়া জানান, জমি ভরাটের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়নি রিমঝিম টাউন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরেজমিনে তদন্তেও করাটিয়া, তারাইল, কুতুবপুর ও মোচারতালুক মৌজায় তিনটি জায়গায় বালি দিয়ে জমি ভরাটের প্রমাণ পাওয়া গেছে। উল্লিখিত এলাকাগুলোতে রিমঝিম ড্রেজার দিয়ে বালি ভরাট করেছে। ভরাট করা জায়গায় রিমঝিম পুলিশ টাউন নামে সাইনবোর্ডও স্থাপন করেছে। পরে রিমঝিম টাউনের মনোনীত প্রতিনিধি লিখিতভাবেও দখল ও বালি ভরাটের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানের নামের সাইনবোর্ড থেকে পুলিশ শব্দটি বাদ দিয়ে এখন শুধু রিমঝিম টাউন লেখা হচ্ছে।
এরপর তদন্ত প্রতিনিধিদল করাটিয়া মৌজাতেই প্রায় ৪১টি পরিবারের ৩০০০ হাজার শতাংশ জমি জোর করে দখল ও ভরাটের তথ্য উদ্ঘাটন করে। এ সময় সবাই জানান, জমি না কিনেই জোর করে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের জমি ভরাট করে দখলে নিয়েছে রিমঝিম পুলিশ টাউন।
জমি দখলের বিষয়ে রিমঝিম টাউনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়ালিউর রহমান তদন্তকারী দলকে সে সময় বলেন, রিমঝিম টাউন প্রকল্পের আওতায় করাটিয়া ও কুতুবপুর মৌজায় জমি বালি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। কোনো জমি জোর করে ভরাট করা হয়নি। আর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নেওয়াকে ভুল হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
