নির্বাচনকালীন সরকার নয় সুষ্ঠু ভোটেই জোর যুক্তরাষ্ট্রের

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৩, ০২:৫৩ এএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে। সংবিধান অনুযায়ী, এ বছরের ডিসেম্বরে অথবা আগামী বছরের শুরুতে এ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচন ঘিরে এক বছর ধরেই রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট, সংসদের বাইরের বড় দল বিএনপি ও তাদের সমমনা জোট, বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ সব কটি রাজনৈতিক দলই এ নিয়ে সরব। আবার এ নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহও কম নয়। পাশের দেশ ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) বিভিন্ন জোট বা সংস্থার প্রতিনিধিরাও বাংলাদেশের আসছে নির্বাচন নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অনুষ্ঠানে কথা বলছেন।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচন ঘিরে এবার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বিদেশিদের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহও লক্ষণীয়। গত কয়েকটি নির্বাচনের আগে থেকেই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের নানা পরামর্শ ও হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। এ জন্য বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বিদেশিদের কাছে নানা অভিযোগ-অনুযোগ নিয়ে যাওয়াই প্রধান কারণ। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার নিয়ে সব সময়ই সোচ্চার ভূমিকা রাখে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব মন্দা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং ভূরাজনৈতিক কারণে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এবারের নির্বাচন এ দেশগুলোর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের সফর এবং দেশটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য থেকে পাওয়া তথ্যমতে, এবারের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার পক্ষে দেশটি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাসও বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্যে বলে আসছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে কে ক্ষমতায় এলো মানে কোন দল বা কোন জোট ক্ষমতায় আসবে, নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে বা কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে, এটি তাদের কাছে কোনো বিষয় নয়। এ ছাড়া নির্বাচনে কারা অংশ নেবে বা নেবে না, সেটিও তাদের বিবেচনার বিষয় না। তবে তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করেন।

সর্বশেষ গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার শুভেচ্ছা বার্তায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঠানো ওই বার্তায় বর্তমান সরকার এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসাও করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনও স্বাধীনতা দিবসের অভিনন্দন বার্তায় বাংলাদেশে সবার জন্য উন্মুক্ত, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনা সর্বশেষ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ এবং গণভবনে বিভিন্ন সময়ে বিদেশি অতিথি ও রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সৌজন্য সাক্ষাতে সরকারের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতির কথা জানান। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তিনি বলে আসছেন যে নির্বাচন কমিশন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করবে।

গত ১৩ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এবং প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করেছেন। তাদের এসব সফরে আগামী নির্বাচন, বিরোধীপক্ষের প্রতি সরকারের আচরণ, মানবাধিকার ইস্যু ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সরকার, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

গত ২০ মার্চ বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ২০২২ কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিসেস শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু  হয়নি। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে, ওই নির্বাচনে জাল ভোট দেওয়া হয়েছে এবং বিরোধীদলীয় পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভয় দেখানোসহ গুরুতর অনিয়ম রয়েছে।  প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত সম্মান ও অংশীদারিত্বের মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে মানবাধিবার বিষয়গুলো উত্থাপন করে। আমরা এটা চালিয়ে যাব।’

বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বলয় বাড়াতে চায় দেশটি। এর মধ্যে দেশটি এশিয়ায় তাদের বন্ধুদেশগুলো নিয়ে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস)’ গঠন করেছে। এর আওতায় ইন্দো-প্যাসিফিক ফোরাম গঠন করা হয়েছে। একই কৌশলের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারত সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে কোয়াড গঠন করেছে। এগুলোর লক্ষ্য হলো চীনের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বলয় গঠন করা। ভারতের পাশাপাশি এ বলয়ে দেশটি বাংলাদেশকেও চায়। বাংলাদেশ যেন কোনোভাবেই চীনের বলয়ে না যেতে পারে, সেই কৌশলের অংশ হিসেবেও আগামী নির্বাচন ঘিরে চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে দেশটি। যদিও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কোনো জোটেই যায়নি। আবার বার্মা অ্যাক্ট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে জাতিসংঘে বিভিন্ন প্রস্তাবে তারা বাংলাদেশকে পাশে চায়। এসব কারণে বাংলাদেশকে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ নানা ইস্যুতে সোচ্চার হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুসহ ঢাকা সফরে আসা দেশটির কর্মকর্তারা আগামী নির্বাচনের পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ক নিয়েও ইতিবাচক কথা বলেন। একই মাসে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের কাউন্সিলর ডেরেক এইচ শোলে ঢাকা সফরে এসে বলেছিলেন, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে অর্থাৎ যারা পরাজিত হবেন, তারাও যেন মনে করেন নির্বাচনটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছেএমনটাই আমরা চাই।

এর আগে গত বছরের নভেম্বরে ঢাকা সফরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আক্তার বলেছিলেন, আসন্ন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে তারা সরকারকে এবং বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবেন। গত বছরের অক্টোবরে ঢাকায় এসেই এক অনুষ্ঠানে দেশটির রাষ্ট্রদূত পিটার হাস সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালী উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেমন বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়, সরকারপক্ষও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথাই বলে আসছে। বিএনপি তাদের কাছে নানা সময়ে অভিযোগ নিয়ে গেছে। এটা একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টই বলেছে, কে ক্ষমতায় এলো এটা তাদের বিষয় নয়। তারা নিজেরা যেহেতু গণতান্ত্রিক চর্চার দেশ, তাই তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশার কথা বলেছে। আবার এ বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছে তারা।

এদিকে টানা তৃতীয়বারের রেকর্ড ভেঙে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসতে চায় আওয়ামী লীগ। সেই লক্ষ্যে দলটি ও তাদের জোট তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত কর্মসূচি নিয়ে মাঠে সরব। আবার সংসদের বাইরে দেশের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি এ সরকারে অধীনে নির্বাচনে যাবে না এমন অনড় অবস্থানের কথা বলে আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে এক বছর ধরে মাঠে রয়েছে। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও রয়েছে মাঠে।   

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৯০ সাল থেকেই বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ বাড়ছে। নির্বাচনের এক বছর আগে থেকেই প্রভাবশালী দেশগুলো দেশের নির্বাচন নিয়ে সবক দিতে থাকে। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি; বরং এবার নির্বাচন ঘিরে নতুন নতুন পরাশক্তির প্রভাব লক্ষণীয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই প্রতিবেশী দেশ এবং বড় দেশ হিসেবে দেশের রাজনীতি ও সরকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য দেখিয়ে আসছিল ভারত। ১৯৯০ সাল থেকে ভারতসহ যুক্ত হয়েছে পশ্চিমা রাজনীতির প্রভাব। আর গত তিন দফা থেকে শুরু হয়েছে বিভিন্ন কূটনৈতিক জোট, আঞ্চলিক জোট এবং সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আগ্রহ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রভাবশালী দেশগুলোর আগ্রহ নির্বাচন নিয়ে যতটাই থাক না কেন, এর মূল কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা। এর সমাধান যদি নিজেরাই না করতে পারি তাহলে বাইরের প্রভাব বাড়তে থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ গত শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নয়, আমরা সবাই চাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত