বাংলা চর্চার আন্দোলনটা শুরু করেছিলেন নিজের ঘর থেকে। ঘরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে এ আন্দোলন এখন চলছে তার দপ্তরে। যখন বাংলায় কথা বলছেন তখন বাংলাই বলছেন, মাঝখানে কোনো ইংরেজি শব্দ থাকছে না। দপ্তরের নথিপত্রে বাংলা সন-তারিখ লেখা হচ্ছে। যিনি এ আন্দোলনটি করে যাচ্ছেন তিনি হলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।
নব্বইয়ের দশকের পর থেকে বাংলার সঙ্গে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার অতিমাত্রায় বেড়েছে। বঙ্গাব্দের পরিবর্তে খ্রিস্টাব্দের প্রচলন বেড়েছে। এ বিষয়টি নাড়া দেয় ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে। ২০১৯ সালে সংসদ সদস্য থাকার সময় বাংলা চর্চার আন্দোলন শুরু করেন নিজ ঘরে। ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পর বড় পরিসরে বাংলা চর্চা জোরদার করেছেন। নগর সংস্থাটির ৯৫ ভাগ নথিপত্রে পুরোপুরি বাংলায় ব্যবহার হচ্ছে। বঙ্গাব্দ অনুযায়ী সন, তারিখ ও বার উল্লেখ করা হচ্ছে। দাপ্তরিক আদেশেও কোনো ইংরেজি বা মিশ্র শব্দের ব্যবহার থাকছে না। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তিন বছর ধরে বঙ্গাব্দ বর্ষপঞ্জিকা প্রকাশ করছে। চতুর্থ বঙ্গাব্দ বর্ষপঞ্জিকা প্রকাশের কাজ চলছে। সবাই যখন ইংরেজিমুখী, তখন বাংলা ভাষা চর্চার আন্দোলনের বিষয়ে মেয়র তাপসের কাছে জানতে চেয়েছিলেন এই প্রতিবেদক। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি জানান, স্বাধীনতা-পূর্ব এবং স্বাধীনতা-উত্তর আশির দশক পর্যন্ত সর্বত্র বঙ্গাব্দ ও বাংলা ভাষার প্রচলন ছিল। তবে নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলায় মিশ্র শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছে। বাংলার সঙ্গে ইংরেজির মিশ্রণ এখন মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। একটি বাক্যও পুরোপুরিভাবে বাংলা বলছে না মানুষ। সুন্দর সুন্দর বাংলা শব্দগুলো অচেনা হয়ে যাচ্ছে। বাংলা শব্দ থাকা সত্ত্বেও সেখানে ঢুকে পড়ছে ইংরেজি শব্দ। সরকারি দপ্তরের চিঠিপত্রে বাংলা সন, তারিখও উঠে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সেটা আবার ফিরেছে। তবে বাংলা চর্চা কমছে, মিশ্র ব্যবহার বাড়ছে। সত্তরের দশকে বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়েও নথিপত্রে বাংলা সন, তারিখ, বার এবং বাংলা শব্দেরই ব্যবহার হতো।
মেয়র জানান, সংসদ সদস্য থাকাকালে একুশে ফেব্রুয়ারি বা পহেলা বৈশাখে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। ওই সময়ে তার মনে হলো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করতে হবে। ভাবনা অনুযায়ী, প্রথমে বিষয়টি আলোচনা করেন পরিবারের সদস্যদের কাছে। স্ত্রী ও সন্তানদের সমর্থন নিয়ে পরিবারের সচেতনভাবে বাংলা চর্চা শুরু করেন। যখন বাংলা বলেন, সম্পূর্ণ বাংলায় কথা বলেন। যেখানে অন্য ভাষার উপস্থিতি থাকবে না। তিনি আরও জানান, প্রশাসনিক বা দাপ্তরিকভাবে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এটা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। বঙ্গাব্দের বর্ষপঞ্জির প্রচারের উদ্দেশ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ঢাকা দক্ষিণ নগর সংস্থার পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে প্রতি বছর বিতরণ করা হচ্ছে। ভাষা চর্চারও বিষয়। ভাষাগত বিষয়টি এত অন্তর্নিহিত যে, একটা শব্দ ব্যবহার হতে হতে সেটা এমনভাবে চলে আসে যে, আপনার মস্তিষ্ক ওই শব্দটা আপনাকে এনে দেবে। কম্পিউটারের মতো। এ জন্য চর্চারও প্রয়োজন রয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনির সন্তান ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। তার জন্ম ১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর।
তিনি ১৯৯৬ সালে যুক্তরাজ্যে আইনবিদ্যায় স্নাতক (এলএলবি) সম্পন্ন করেন। আর ১৯৯৭ সালে বারিস্টার-এট-ল অর্জন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি খুনিরা তাপসের বাবা শেখ ফজলুল হক মনি ও মা শামসুন্নেসা আরজু মনিকেও হত্যা করে। তারা দুই ভাই। অন্যজন শেখ ফজলে শামস পরশ। বর্তমানে তিনি যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
নিজের দাদির স্মৃতিচারণ করে তাপস বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর বড় বোন, আমার দাদি। ছোট বেলায় দেখেছি দাদি বঙ্গাব্দে সবকিছু চিহ্নিত করতেন। যখন কিছু বলতে হতো তিনি বাংলা তারিখের ব্যবহার করতেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আসলে যতই ঢাকঢোল পিটিয়ে বাংলা চর্চার কথা বলা হোক না কেন, বাস্তবে মানুষের মাঝে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় তেমন কোনো আন্তরিকতা দেখা যায় না।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জানায়, মেয়রের পক্ষ থেকে অনুশাসন দেওয়া হয়েছে নথিপত্রে পুরোপুরি বাংলা শব্দের ব্যবহার করার। কথা বলার সময় অন্য ভাষা ব্যবহার করলেও লেখনীতে অন্য শব্দের ব্যবহার করা যাবে না। অফিস আদেশ না বলে দপ্তর আদেশ। ফাইলপত্র না লিখে নথিপত্র। ওয়ার্ক অর্ডার না লিখে কার্যাদেশ, মার্কেট শব্দ না লিখে বিপণিবিতান, টার্মিনাল না লিখে প্রান্ত, কমিউনিটি সেন্টার না লিখে সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র, সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন না বলে অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু এই শব্দগুলো নয়, বাংলায় আছে এমন শব্দগুলোর ইংরেজি বা অন্য ভাষার শব্দের ব্যবহার পুরোপুরিভাবে বন্ধ করা হয়েছে। তবে আইনগতভাবে যেসব বিদেশি শব্দ স্বীকৃতি পেয়েছে, সেগুলো ব্যবহার বন্ধ করা হয়নি। যেমন সিটি করপোরেশন শব্দটি ইংরেজি শব্দ। কিন্তু আইনে এ শব্দটি ব্যবহার করায় সেটি ‘ঢাদসিক’ ব্যবহার করছেন।
ডিএসসিসি আরও জানায়, বাংলা ভাষার পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশেও মেয়র তাপসের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। প্রতি বছর নগর সংস্থার তত্ত্বাবধানে সাকরাইন উৎসব পালন হচ্ছে। যুব সমাজের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের চর্চার জন্য ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু করেছে। অন্যান্য খেলাধুলারও প্রচলন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। পহেলা বৈশাখ উদযাপন অনুষ্ঠানে নিজে উপস্থিত হয়ে দীর্ঘসময় থাকেন। গত বছর পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সামনের সারিতে বসে দীর্ঘসময় অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। সকাল সাড়ে ৬টায় রমনা বটমূলে ছায়ানট আয়োজিত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। আর সকাল ৮টার কিছু সময় পর অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে মেয়র তাপস বলেছিলেন, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাব। রমনা বটমূলের এ বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অন্যতম ও অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্যের সঙ্গে রমনা বটমূলের এ সাংস্কৃতিক মিশেল আমাদের পরিতৃপ্ত করে, বাঙালিত্বে সামগ্রিকতা দান করে। তাই আমাদের এগিয়ে যেতে হলে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’
শেখ ফজলে নূর তাপস ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালে দশম ও ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদে ঢাকা-১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ থেকে পদত্যাগ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হয়ে ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সচিব আকরামুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেয়র মহোদয় দায়িত্ব গ্রহণের পর দাপ্তরিক ভাষা পুরোপুরি বাংলা ব্যবহারের অনুশাসন দিয়েছেন। সেটা বাস্তবায়নের শতভাগ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এখন আমরা বলতে পারি দাপ্তরিক আদেশ, নথিপত্রে প্রায় শতভাগ বাংলা শব্দ ব্যবহার করছি। পাশাপাশি নথিপত্রে বঙ্গাব্দ অনুযায়ী সন, তারিখ ও বার উল্লেখ করা হচ্ছে।’
সংস্থার জনসংযোগ কর্মকর্তা ও মুখপাত্র মো. আবু নাছের বলেন, ‘আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংক্ষিপ্তরূপ ডিএসসিসি লেখা হতো। হওয়ার কথা ঢাদসিক। মেয়রের নির্দেশনা অনুসরণ করে এখন ঢাদসিক লেখা হয়। দাপ্তরিক আদেশ, বিজ্ঞপ্তি এবং অন্যান্য চিঠিপত্রে শতভাগ বাংলা ব্যবহারের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।’
