দেশের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার বরুণ বিকাশ দেওয়ান দূর রাঙ্গামাটি থেকে উঠে এসে নিজেকে শীর্ষ ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিন পার্বত্য জেলার একমাত্র ফুটবলার হিসেবে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত বরুণের কাছ থেকেই পাহাড়ে ফুটবলের দুর্দশার গল্পগুলো তুলে এনেছেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ
অতীতে ঢাকার মাঠে পাহাড়ি অনেক ফুটবলারকে দেখা গেছে। এখন সংখ্যাটা প্রায় শূন্যের কোঠায়। কী কারণে এমনটা হলো?
বরুণ বিকাশ দেওয়ান : পার্বত্য তিন জেলায় ফুটবলের যে জোয়ার অতীতে ছিল সেটা এখন নেই বললেই চলে। এসব অঞ্চল থেকে আমরা সাম্প্রতিক সময় বেশ কিছু ভালো মানের নারী ফুটবলার পেয়েছি ঠিক, তবে পুরুষ ফুটবলের চর্চা অনিয়মিত হয়ে পড়ায় এর প্রভাব আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখতে পাচ্ছি। বড় সমস্যা স্পন্সর সংকট। পার্বত্য জেলাগুলোতে কল-কারখানা একদমই নেই। পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় লিগটা নিয়মিত হচ্ছে না। লিগ না হলে পাহাড়ের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলাররা তো ওপরের স্তরে এগিয়ে যাওয়া সিঁড়ির খোঁজ পাবে না। এসব কারণেই পাহাড়িদেরও ফুটবল নিয়ে আগ্রহ কমে গেছে।
অথচ এখান থেকেই অনেক নারী ফুটবলার উঠে এসেছে সাম্প্রতিক সময়ে?
বরুণ : বর্তমানে পাহাড়ি অঞ্চলে নারী ফুটবলের একটা জাগরণ শুরু হয়েছে। কাউখালি উপজেলায় নিয়মিত অনুশীলন হয়। এছাড় ঘাগড়া স্কুল কর্র্তৃপক্ষ পাহাড়ি মেয়েদের নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ করে দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে নারীরা অগ্রসর হয়ে যাচ্ছে। আমরা পুরুষ ফুটবলটা সেই গতিতে এগিয়ে নিতে পারছি না। এটাই বড় আক্ষেপ।
ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার জন্য তাহলে কি শুধু স্পন্সর না থাকাই দায়ী?
বরুণ : আরও অনেক কারণ আছে। অতীতে রাঙ্গামাটিসহ অন্য তিন পার্বত্য জেলায় নিয়মিত ক্যাম্প হতো। মূলত প্রতিভাবান ফুটবলার খুঁজে নিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হতো। সেখান থেকেই কিন্তু প্রতি বছর অনেক ফুটবলার বের হয়ে আসত এবং তারা ঢাকার বিভিন্ন লিগে বিভিন্ন ক্লাবে প্রতিনিধিত্ব করত। এখন এরকম উদ্যোগ নেওয়া হয় না। আর এখন পাহাড়ি ছেলেদের হাতেও মোবাইল চলে এসেছে, ইন্টারনেটও হাতের নাগালে। এখন তারা এসব ডিভাইস নিয়েই বেশি সময় কাটায়। তাদের মধ্যে বিকেল হলে মাঠে আসার প্রবণতাও কমে গেছে। এ কারণে ছেলেরা এখন আর আগের মতো ফুটবলের প্রতি আগ্রহী হয় না।
দীর্ঘদিন দেশের ফুটবলে কোনো সাফল্য নেই। এই প্রজন্মের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার এটাও নিশ্চয় বড় একটা কারণ?
বরুণ : অতীতের জাতীয় দল আর বর্তমানের জাতীয় দলের মধ্যে বিস্তর ফারাক। মানের দিক থেকে এখনকার ফুটবলাররা অনেক পিছিয়ে গেছে। তাছাড়া জেলায় নিয়মিত খেলা হয় না বলে ভালো মানের ফুটবলারের সংখ্যাও কমে গেছে। অথচ ঘরোয়া ফুটবলে ভালো ক্লাবের সংখ্যা বেড়েছে। আগে কেবল আবাহনী আর মোহামেডান ছিল। এখন পাঁচ থেকে ছয়টা ক্লাব ভালো বাজেটের দল গড়ে। তাদের আছে ভালো মানের ফুটবলারের সংকট। অনেকেই জাতীয় দলের পাঁচজন ফুটবলারের নাম বলতে পারবে না। অথচ আমরা যখন খেলতাম, তখন প্রতিটি পজিশনে অনেক লড়াই হতো। আমার নিজের কথাই বলি। আমি খেলা শুরু করেছিলাম সেন্টারব্যাক হিসেবে। সেখানে কায়সার হামিদ থেকে শুরু করে বড় বড় ফুটবলাররা খেলতেন। জাতীয় দলে ইমতিয়াজ সুলতান জনি ভাই খেলতেন লেফটব্যাক পজিশনে। আমার মধ্যে যোগ্যতার ছাপ দেখতে পেয়ে তিনিই আমাকে লেফটব্যাক পজিশনটা ছেড়ে দিয়ে ওপরে খেলতে শুরু করেন। সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে আমি এক টানা অনেক বছর জাতীয় দলের হয়ে খেলেছি। এখন এ ধরনের সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না বললেই চলে।
পাহাড়ের ফুটবলের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এখানে এসে জানলাম অনেক খেলোয়াড় ফুটবল ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। অনেককে তো দেখলাম সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে...
বরুণ : পাহাড় থেকে ফুটবল খেলে খুব কম সংখ্যক ফুটবলারই প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। আমাদের এখানে সাত থেকে আটজন সাবেক ফুটবলার আছে, যারা ঢাকায় খেলে এসেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। বাধ্য হয়ে তাদের অটো রিকশার ড্রাইভার হতে হয়েছে। বলতে পারেন ফুটবলে আর্থিক নিরাপত্তা নেই বলেই বর্তমান প্রজন্মের অনেকে খেলতে চায় না।
পাশের দেশ ভারতে পাহাড়িদের অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাহাড়ি অঞ্চলে নিয়মিত প্রতিভা অন্বেষণ চলে সেখানে। জাতীয় দলসহ বড় বড় ক্লাবে অনেক পাহাড়ি নিয়মিত খেলছে। এমনটা তো বাংলাদেশেও হতে পারত?
বরুণ : ২০২০ সালের একটা অভিজ্ঞতা বলি। নির্বাচন হয়ে গেছে। সালাউদ্দিন ভাই চতুর্থ মেয়াদে বাফুফের সভাপতি হয়েছেন। তিনি নির্বাচিত হয়েই আমাদের নিয়ে বসে বলেছিলেন জেলার ফুটবলের দায়িত্ব তিনি নেবেন। কথা রাখেননি সালাউদ্দিন ভাই। জেলার ফুটবল এখনো বঞ্চিত। অথচ তৃণমূলে দৃষ্টি না দিলে কখনই ফুটবলে উন্নতি করা সম্ভব নয়। আর এখন তো ফুটবল ফেডারেশন চরম ইমেজ সংকটের মধ্যে পড়ে গেছে। সাধারণ সম্পাদক দুর্নীতির দায়ে নিষিদ্ধ হয়েছেন। বাফুফেতেই যখন ঘুণে ধরেছে, তখন জেলার ফুটবলের কথা বাদ দেওয়াই ভালো। ফুটবলার ছিলাম, এই পরিচয় দিতেই এখন লজ্জা হয়।
আপনার রয়েছে একটা বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। মোহামেডান, আবাহনী, মুক্তিযোদ্ধার মতো বড় দলে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে কী করেছেন?
বরুণ : আমি দীর্ঘদিন ধরেই রাঙ্গামাটি জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সঙ্গে জড়িত আছি। যেহেতু খেলা ছাড়ার পর সেভাবে অন্য কোনো পেশা বেছে নিইনি, আমার জীবন কাটে খেলার মাঠেই। ডায়নামিক ফুটবল অ্যাকাডেমি নামে আমার একটা ফুটবল স্কুল আছে। করোনার আগে শুরু করেছিলাম ১৩৫ জন ছাত্র নিয়ে। এখন কিছুটা কমেছে সংখ্যাটা। অরুণদাসহ আরও কজন সাবেক ফুটবলারকে নিয়ে আমরা চেষ্টা করছি কিছু প্রতিভাবান ফুটবলার গড়ে তুলতে।
অবশেষে গত বছর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেলেন...
বরুণ : তিন পার্বত্য জেলায় আমিই একমাত্র ফুটবলার হিসেবে এই বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছি। এ সময়ের ফুটবলারদের মতো আমরা তো কোটি কোটি টাকার মুখ দেখিনি। এ স্বীকৃতিগুলোই তাই আমাদের কাছে পরম পাওয়া। আমি এই স্বীকৃতি তিন পার্বত্য জেলার সব মানুষকে উৎসর্গ করেছি।