রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান ২০২১ সালের জানুয়ারিতে যোগ দিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে। বাংলাদেশের বন্দর, ব্লু ইকোনমিসহ সার্বিক মেরিটাইম খাত এবং ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা বঙ্গোপসাগর ও তার নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন
দৈনিক দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা শুনে খুবই আনন্দিত যে আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর অনেকগুলো সাফল্য অর্জন করেছে আপনার নেতৃত্বে। প্রথমেই জানতে চাই, লয়েড’স লিস্টে আমাদের বন্দরের এখনকার অবস্থান কত?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: লয়েড’স লিস্টে আমাদের বর্তমান অবস্থান ৬৪তম। এর মানে পৃথিবীর একশটা ব্যস্ততম বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান এখন চৌষট্টিতম।
বাহ! চোখে পড়বার মতোন উন্নয়ন। আপনি যখন দায়িত্ব নেন, তখন এই বন্দর কততম অবস্থানে ছিল, বা সারা বিশ্বের যে বন্দরগুলো, তার তুলনায় আমাদের বন্দরের ইতিহাস যে রকম পুরনো... তদুপরি, বন্দরটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক কারণে, আপনি দায়িত্ব নেয়ার পর প্রাথমিকভাবে টার্গেটটা কী ছিল?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: আমি চট্টগ্রাম বন্দরের দায়িত্বভার গ্রহণ করি ৩১ জানুয়ারি ২০২১ এ, যখন একদম কোভিডের মাঝপথে আমরা এসে পৌঁছেছি, কোভিড আমাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। তখন চট্টগ্রাম বন্দর মোটামুটি স্থবির হয়ে ছিল, আমরা লয়েডস লিস্টেও ছিলাম না। শুধু চট্টগ্রাম বন্দর না, সারা বিশ্বের সব বন্দরই মোটামুটি বন্ধ অবস্থায় ছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরকে আমরা দ্রুত অনেক বেটার সিচুয়েশনে নিয়ে যাই। আমরা, বন্দরের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী, চট্টগ্রাম বন্দরকে আমরা চব্বিশঘন্টা সচল রেখেছি এবং আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে দর্শন ছিল, যে জীবন এবং জীবিকার সাথে সমন্বয় রেখে আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, আমরা সেভাবে সেই দর্শনটাকে লালন করে, বুকে ধারণ করে কার্যক্রম পরিকল্পনা করেছিলাম এবং আমরা চব্বিশঘন্টাই চট্টগ্রাম বন্দর সচল রেখেছিলাম। এতে আমাদের বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে সচল ছিল এবং সেই পিরিয়ডেও কিন্তু আমাদের ১৩% গ্রোথ হয়ে ছিল। এর বিনিমযয়ে আমাদের ৫৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আমরা হারিয়েছি। আজকে আমি তাঁদের রূহের মাগফেরাত কামনা করি।
১৯৭৭ সালে ৬টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং দিয়ে যাত্রাটি শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরের, যে বন্দর এখন বছরে ৩২ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। সে হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের যাত্রাটি চমৎকপ্রদ। কীভাবে এটা সম্ভব হলো?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস কিন্তু অনেক পুরোনো, প্রায় আড়াই হাজার বছরের। তবে কনটেইনার হ্যান্ডলিং শুরু হয় ১৯৭৭ সালে মাত্র ছয় টিইইউ কনটেইনার দিয়ে। সে সময় অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। ১০ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মাইলফলক স্পর্শ করতে আমাদের ৩১ বছর লেগে গেছে। ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর প্রথমবারের মতো ১০ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে। এর পরের অর্থাৎ ২০০৯ সাল পরবর্তী সাফল্য ঈর্ষণীয়। ২০ লাখ টিইইউর মাইলফলক স্পর্শ করতে সময় লেগেছে মাত্র সাত বছর। ২০১৫ সালেই ২০ লাখ টিইইউর বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে চট্টগ্রাম বন্দর। এর মাত্র চার বছর পর ২০১৯ সালেই ৩০ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে নজির সৃষ্টি করে বন্দর। ২০২১ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ লাখ টিইইউর ঘরে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই সাফল্যে প্রধান ভূমিকা রেখেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুচিন্তিত দিক-নির্দেশনা এবং সেই আলোকে সরকারের গৃহীত বন্দরকেন্দ্রিক নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা। সরকারের ও আমরা যারা বন্দর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছি, তাদের ধারাবাহিকতাও এক্ষেত্রে বড় একটা ভূমিকা রেখেছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর, যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি এইসব পরিসংখ্যানে।
এই পর্যায়ে আসতে বন্দরের দক্ষতা ও সক্ষমতা অনেক বাড়াতে হয়েছে। সেটা কীভাবে হয়েছে?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই দেখবেন চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি। গত পাঁচ বছর গড়ে ১২-১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধিকে সামাল দেওয়ার জন্যই আমাদের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি অর্থাৎ সক্ষমতা প্রতিনিয়ত বাড়াতে হচ্ছে। এখন আমাদের কনটেইনার ধারণক্ষতা ৫৩ হাজার ৫৮০ টিইইউ। আমাদের সক্ষমতাও অনেক বেড়েছে এবং বিশ্বের যেকোনো আধুনিক বন্দরের সাথে একে তুলনা করা যায়।
এ ছাড়া ইকুইপমেন্টও বেড়েছে। আমি যখন চট্টগ্রাম বন্দরে সদস্য (হারবার ও মেরিন) হিসেবে যোগ দেই ২০১০ সালে, তখন সিসিটিতে মাত্র চারটি কিউজিসি (কী গ্যানট্রি ক্রেন) ছিল। বর্তমানে আমাদের কিউজিসি ১৮টি। সেই সময় আমাদের আরটিজি ছিল ৭টার মতো। আরটিজির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এখন ৪৭টি। আরএমজিসি (রেল মাউন্টেড গ্যানট্রি ক্রেন) বন্দরে যুক্ত হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ শেষ করেছি। ফলে আমাদের বন্দরের সক্ষমতা চার মিলিয়ন টিইইউতে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ বা কনটেইনারের কোনো জট নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় ইচ্ছায় এত অল্প সময়ে আমরা এই সক্ষমতা বাড়াতে পেরেছি।
সবমিলিয়ে বলতে পারি বিভিন্ন ধারণক্ষতার বিপুল সংখ্যক যেসব ক্রেন আমাদের বহরে যুক্ত হয়েছে নিঃসন্দেহে সেগুলো বন্দরের সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং অভূতপূর্ব একটা পরিবর্তন এনে দিয়েছে। বন্দরের উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। সরকার ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সব ধরনের নীতি ও বিনিয়োগ দিয়েছেন বলেই চট্টগ্রাম বন্দরকে আজ আমরা একটা আধুনিক বন্দরে উন্নীত করতে পেরেছি। বন্দরের ধারণক্ষমতা ও সক্ষমতা দুটোই বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি।
কর্ণফুলী চ্যানেলকে আমরা প্রশস্ত করেছি। ড্রাফটও বেড়েছে। বন্দরে আগে ১৮৬ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যরে জাহাজ আসতে পারত না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ২০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বন্দরের জেটিতে আনতে পেরেছি।
বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অটোমেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বন্দর এক্ষেত্রে কতটা এগিয়েছে?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: চট্টগ্রাম বন্দরকে এক সময় ম্যানুয়াল বন্দর বলা হতো। সেই পরিস্থিতি থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। বন্দরে আমরা টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টস) চালু করেছি। সবচেয়ে বড় যে কাজটা আমরা করেছি তা হলো ইলেক্ট্রনিক ডেলিভারি সিস্টেম। এটা একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভেহিকল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে ট্রাকের ফি আদায় অটোমেশনের আওতায় এসেছে। পুরোপুরি না হলেও সেমি-অটোমেটিক বন্দরে আমরা উন্নীত হয়েছি।
বহির্নোঙর ও চ্যানেলে চলাচলকারী জাহাজ নজরদারিতে ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ভিটিএমআইএস) চালু রয়েছে। বহির্নোঙরের (পোর্ট লিমিট) আওতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাহাজ পাইলটিংয়ে পাইলট সার্ভিস অটোমেশন চালু করা হয়েছে।
বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে বাস্তবায়ন করা হয়েছে একগুচ্ছ উন্নয়ন পরিকল্পনা। নিরাপদ বন্দর নিশ্চিতে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক সিসিটিভি কন্ট্রোল সেন্টার, রয়েছে পাবলিক এড্রেস সিস্টেম। যান চলাচল নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অটোমেটিক গেট কন্ট্রোল সিস্টেম, আন্ডার ভেহিকল সার্ভিল্যান্স সিস্টেম (ইউভিএসএস) ও স্ক্যানার।
এইসব অর্জন আপনাকে কোথাও কী তৃপ্ত করছে?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: সব সময় আমাদের আমাদের লক্ষ্যই থাকে অংশীজন ও ব্যবহারকারীদের সর্বোৎকৃষ্ট সেবাটি দেওয়া। সেটা নিশ্চিত করতেই বন্দরকেন্দ্রিক এতসব আয়োজন। কাক্সিক্ষত সেবা যে এখন পাওয়া যাচ্ছে, ব্যবহারকারীরাই তা বলছেন। কোভিডকালীন সময়ে সারা বিশ্বের বন্দর যেখানে স্থবির হয়ে গিয়েছিল, তখনও আমরা অংশীজন ও ব্যবহারকারীদের ২৪ ঘণ্টা সেবা দিয়ে গেছি। কোভিডকালেও ৪১ শতাংশ জাহাজ অন-অ্যারাইভাল বার্থিং পেয়েছে। এখন আমরা ৮০ শতাংশ জাহাজকে অন-অ্যারাইভাল বার্থিং দিচ্ছি।
এ ছাড়া অটোমেশনের বৈশ্বিক স্বীকৃতি ও সুফল দুটোই আমরা পাচ্ছি। যুক্তরাজ্যের পোর্টসমাউথের গবেষণা যখন বলে যে, এশিয়া অঞ্চলের ৬৫টি সেমি-অটোমেটিক বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান সবার ওপরে তখন ভালোতো লাগেই। তবে এই অর্জন বন্দরের একার নয়, সকল ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীদেরও।
২০৩১ সালে উচ্চ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার যে অভিষ্ট তা অর্জনেও বড় ভূমিকা রয়েছে বন্দরের। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বর্ধিত চাহিদা পূরণে বন্দরের দক্ষতা ও সক্ষমতা আরও বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। সে ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তুতি কী?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে প্রয়াস তাকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে আমাদের এখানেই থেমে থাকলে হবে না। ধারণক্ষমতা ও সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। সে লক্ষ্যে আমরা কাজও করছি। আমরা ইতিমধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করেছি। আমাদের আরও ইয়ার্ড তৈরির কার্যক্রম চলছে। সেগুলো সম্পন্ন হলে ৫৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার ধারণ করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া আমরা বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ি ডিপ সী টার্মিনাল নির্মাণ করছি। বে টার্মিনালের কাজ শেষ হলে ২৮৫ মিটার দীর্ঘ ও ১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ সেখানে আসতে পারবে। চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে যেখানে ৩ হাজার টিইইউর জাহাজ আসে আর বে টার্মিনালে আসবে ৫-৬ হাজার টিইইউর জাহাজ। মাতারবাড়িতে ড্রাফট ১৮ মিটার। সেখানে ১০-১২ হাজার টিইইউ কনটেইনার ধারণক্ষমতার ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে জাহাজ আসতে পারবে। তখন আমরা বাংলাদেশকে অত্র অঞ্চলের ট্রান্সশিপমেন্ট হাব বানাতে পারবো। আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজ সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় যেতে পারবে।
মাতারবাড়ি ও বে টার্মিনাল কবে নাগাদ কার্যক্রমে আসতে পারে?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র টার্মিনালের মূল চ্যানেলের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা কনটেইনারবাহী জাহাজের বেসিন তৈরি করছি। মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জামবাহী ১১৭টির বেশি জাহাজ এরই মধ্যে সেখানে এসেছে। আমরা টাগবোট ও কন্ট্রোল রুমের ব্যবস্থা করেছি। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র টার্মিনালের কাজ পুরোদমে চলছে এবং আশা করছি ২০২৬ সালের মধ্যে কনটেইনার পরিবহনের সুফল আমরা পাব।
বে টার্মিনালের ডিটেইল ড্রয়িং ও ডিজাইনের জন্য আমরা দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছি এবং এরই মধ্যে তারা তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ব্রেকওয়াটার নির্মাণ ও চ্যানেল খননের জন্যও আন্তর্জাতিক একটি যৌথ কোম্পানিকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্মাণ শেষ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে এটি কার্যক্রমে আসবে বলে আমরা আশা করতে পারি। বে টার্মিনালে মোট তিনটি টার্মিনাল থাকবে; একটি মাল্টিপারপাস এবং দুটি কনটেইনার টার্মিনাল।
বাংলাদেশকে ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে ঘোষণা করা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: আমি শুরু থেকেই এ কথাটি বলে আসছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘পূর্ব এশিয়া, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমে চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যবর্তী হওয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক এবং ভারতের ব্যবসার অন্যতম ক্ষেত্র হতে পারে। আমরা এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক হাব হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারি। আমাদের নিজস্ব ১৭ কোটি জনগণ ছাড়াও প্রায় ৩০০ কোটি মানুষের একটি বিশাল বাজারের যোগাযোগের পথ হতে পারে বাংলাদেশ।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই দর্শনই আমাদের জন্য দিক-নির্দেশনা এবং বন্দরকে ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন।
সাবরিজিয়নাল ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হওয়ার অর্থ হলো অন্যান্য দেশ আমাদের এই বন্দরকে ব্যবহার করবে। সেজন্য আমাদের বন্দরের উন্নত অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, সংযোগ, সেবার প্রাপ্যতা, দক্ষ জনশক্তি সর্বোপরি পর্যাপ্ত নাব্যতা থাকতে হবে। সেই সাথে ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়াটাও জরুরি। সবগুলো সুবিধাই আমাদের আছে।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র টার্মিনাল চালু হলে আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের কলকাতা (বর্তমানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর), হলদিয়া, বিশাখাপত্তনম, কাকিনাদা ও আন্দামান-নিকবরের অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর বেল্টের বন্দরগুলো এটি ব্যবহার করতে পারবে। আমাদের আরেক প্রতিবেশি মিয়ানমারের আকিয়াব, ইয়াঙ্গুন এবং থাইল্যান্ডের ফুকেটসহ আরো দুই-একটি ছোট বন্দরও এটি ব্যবহার করতে পারবে। অর্থাৎ এ বন্দরগুলো হবে মাতারবাড়ি-কেন্দ্রীক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন তারা মাতারবাড়ি ব্যবহার করবে? কারণ এই অঞ্চলের বন্দরগুলোর মধ্যে মাতারবাড়ির ড্রাফট সবচেয়ে বেশি। ১৮ মিটার ড্রাফট হওয়ায় ১০ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে এখানে। এখন একটি জাহাজে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টিইইউ কনটেইনার আনা হয়। এর পরিবর্তে ১০ হাজার টিইইউ কনটেইনার আনলে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ফ্রেইট কমে যাবে। ব্যবসায়ীরা তখন এমনিতেই মাতারবাড়ি বন্দরকে বেছে নেবেন। কারণ, ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি দ্রুত পণ্যের ডেলিভারিও তারা পাবেন। চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর তখন মাতারবাড়িকে ফিডার পোর্ট হিসেবে ব্যবহার করবে।

এ ছাড়া মাতারবাড়ি চালু হলে এখান থেকে জাহাজগুলো সরাসরি পাড়ি দেবে ইউরোপ ও আমেরিকার বন্দরের উদ্দেশ্যে। ফলে সময় অনেক কমে যাবে। বাংলাদেশ থেকে মধ্যবর্তী ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হয়ে ইউরোপীয় গন্তব্যে পণ্য পরিবহনে এখন গড়ে ৬-৭ সপ্তাহ এবং আমেরিকার গন্তব্যে গড়ে ১২-১৬ সপ্তাহ সময় লাগে। আমেরিকার গন্তব্যের সাথে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা গেলে পণ্য পরিবহনে সময় অর্ধেকে নেমে আসবে। ইউরোপের যেসব দেশের সাথে সরাসরি জাহাজ চলাচল চালু হয়েছে সেখানে আমরা ১৬-২০ দিনের মধ্যে জাহাজ পৌঁছাতে পারছি।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে আপনি এরই মধ্যে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু করেছেন। এটা অব্যাহত রাখা কতটা জরুরি?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এরই মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও ইতালির পোর্ট অব র্যাভেনা বন্দরের মধ্য দিয়ে এটি শুরু হয় এবং পরবর্তীতে স্লোভেনিয়ার কোপার বন্দরের সাথেও সেবাটি চালু হয়েছে। এছাড়া ব্রিটেনের পোর্টসমাউথের ফ্লেক্সটো পোর্ট, পর্তুগাল, জার্মানির পোর্ট অব হামবুর্গের সাথেও সরাসরি জাহাজ চলাচল সেবা চালুর প্রস্তুতি রয়েছে। ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ বাঁচাতে সেবাটি অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য প্রয়োজন গভীর সমুদ্রবন্দর। সেই অর্জনের দিকেই যাচ্ছি আমরা।
একটা কথা আপনি প্রায়ই বলে থাকেন এবং তা হলো লায়াবিলিটিজকে আমাদের অ্যাসেটে পরিণত করতে হবে। ট্রান্সশিপমেন্ট হাবের মাধ্যমে লায়াবিলিটিজকে নিশ্চিয় অ্যাসেটে রূপান্তরের একটা সুযোগ তৈরি হবে। সেটা কীভাবে?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: আমাদের নীতিনির্ধারকদের কাজ হলো দায়কে সম্পদে পরিণত করা। এটাই মূল। অর্থাৎ, আমাদের দায়কে যদি আমরা সম্পদে রূপান্তরিত করতে পারি তাহলেই আর কোনো সমস্যা থাকে না। আমাদের বন্দরকে ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে উন্নীত করার মধ্য দিয়েও সেটা সম্ভব। একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিস্কার হবে। এখন কোনো কনটেইনার চারদিনের বেশি বন্দরের অভ্যন্তরে পড়ে থাকলে সেজন্য আমদানিকারককে ডিটেনশন চার্জ পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু যদি বন্দরকে ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে ঘোষণা দেওয়া যায় তখন এমএলওদের খালি কনটেইনার সিঙ্গাপুর বা কলম্বো ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে নিতে হবে না। তারা তখন কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরেই রাখবে। আমাদের স্পেস রেন্ট বাবদ ফি পরিশোধ করবে। তাও আবার বৈদেশিক মুদ্রায়। অর্থাৎ, ব্যবসায়ীদের আর ডিটেনশন বা ড্যামারেজ চার্জ দিতে হবে না এবং স্পেস রেন্ট হিসেবে বন্দর রাজস্ব পাবে এমএলওদের থেকে। একদিকে ব্যবসায়ীদের খরচ বাঁচবে, অন্যদিকে বন্দরের আয় বাড়বে। বন্দরের আয় বৈদেশিক মুদ্রায় হওয়ায় এর একটা বড় প্রভাব পড়বে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।
আপনার মানে বন্দরের দায় আসলে কী কী এখন, একটু বিস্তারিত ব্যখ্যা করবেন?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমরা এর আগে আমাদের সার্ভিসগুলো সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকা, ফার ইস্টার্ণ কান্ট্রি চায়না-জাপানে পাঠাতে পারতাম না। কেন না আমাদের এটা হাব হিসেবে আগে পরিচিত ছিল না। আমাদের বন্দরটা থেকে যদি আমরা সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকা এবং অন্যান্য ডেস্টিনেশনে প্রেরণ করতে পারি তাহলে কিন্তু ট্রানজিট টাইমটা কমে যাবে, আমাদের ট্রানশিপমেন্ট হাবগুলো আমাদের ব্যবহার করতে হবে না, ফলে আমাদের সেখানে ট্রান্সশিপমেন্টের যে ব্যয়, সেটাও কমে যাবে। এবং যে সময় লাগে, এখান থেকে সিঙ্গাপুর অথবা পোর্ট ক্লিয়ং অথবা তিয়ানজিং পোর্ট অথবা কলম্বো হাব আমরা ব্যবহার করি বর্তমানে। সেই হাবগুলো যদি আমাদের ব্যবহার করতে না হয়, আমরা যদি সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকাতে পাঠাতে পারি, তাহলে কিন্তু আমাদের এই যে অতিরিক্ত সময় এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয় হাব-পোর্টে সেটা আমাদের সাশ্রয় হবে। এবং সেই ক্ষেত্রে আমরা যদি এই চট্টগ্রাম বন্দরকে, যেটা আমাদের বে-টার্মিনাল, এবং মাতারবাড়িতে যেই ডিপ-সি টার্মিনাল হচ্ছে, সেইটাকে যদি আমরা ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে রূপান্তরিত করতে পারি, তাহলে এখন বর্তমানে আমাদেরকে যে ডিটেনশন এবং ডেমারেজ চার্জ দিতে হয় পোর্টে, অনেক বেশি ফিক্সড অপারেটিং কস্ট আমাদের পে করতে হয় জাহাজের অবস্থানের জন্য, সেই সব কস্ট আর আমাদের বহন করতে হবে না। তখন এই যে কন্টেইনারগুলো আসে আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরে, যখন আসে, প্রথম চার দিন এমএলও-রা আমাদের ফ্রি টাইম দিয়ে থাকে, এবং ওই চারদিনের পর থেকে তারা কিন্তু কন্টেইনারের উপরে ডিটেনশন চার্জ ও ডেমারেজ চার্জ আরোপ করে ফেলে। এইটা থেকে আমরা মুক্তি পাই তখনই, যখন আমরা ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে আবার খালি কন্টেইনারটাকে ফেরত পাঠাতে পারি অথবা লোডেড কন্টেইনারটাকে ফেরত পাঠাতে পারি। এই যে ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে তারা যখন যায়, সেখানে কিন্তু ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে এমএলও-রা ট্রান্সশিপমেন্ট স্পেস রেন্ট দেয়। কিন্তু আমাদের এখানে যতক্ষণ পর্যন্ত থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু আমাদের তাদের কন্টেইনারের ভাড়াই দিতে হয়, যে তার একটা কন্টেইনার আমার এখানে পড়ে আছে, সেজন্য। আমি যদি এটাকে হাবে পরিণত করতে পারি, তাহলে আমাকে ওই কন্টেইনারটা এম্পটি হওয়ার পরে আর এটার জন্য কোন ডিটেনশন বা ডেমারেজ চার্জ দিতে হবে না, বরং আমার যে স্পেসের ভেতর তার কন্টেইনারটাকে স্টোর করে রাখা হবে, এবং এখান থেকে অন্যান্য জায়গায় পরবর্তীতে সে খালি কন্টেইনারটা রপ্তানি করবে, সেজন্য উল্টা আমাকে চার্জ পরিশোধ করতে হবে। আমাদের দেশে সাধারণত প্রতিবছর যে কন্টেইনারগুলো আমরা এখানে ইউজ করে থাকি, আমাদের এখানে আসা-যাওয়া করে যে কন্টেইনার, সেটার পরিমাণ ৩.২ মিলিয়ন ছিল গতবছর, গড়ে। প্রতি কনটেইনারে ১০০০ ডলারও যদি ডিটেনশন এবং ডেমারেজ চার্জ আসে, সেখানে কিন্তু বিশাল বড় অংক। আমি অত্যন্ত নগণ্য একটা এমাউন্ট বললাম, হিসাবের সুবিধার জন্য। ৩.২ ইনটু ১০০০ হলো ৩.২ বিলিয়ন ইউএস ডলার। তো ৩.২ বিলিয়ন ইউএস ডলার যদি ফরেন ক্যাশের সাশ্রয় হয়, ডেমারেজ এবং ডিটেনশন চার্জ বাবদ দিতে না হয়, তাহলে এটা রিজার্ভে আরও বড় অবদান রাখবে। এটা তো একটা সেগমেন্ট। এরকম আরো পাঁচ-সাতটা সেগমেন্ট আছে- ডিটেনশন, ডেমারেজ, ফিক্সড অপারেটিং কস্ট এগুলার উপরে ভিত্তি করে তখন দেখা যায় যে বিশাল এমাউন্ট। এবং আমাদের এই বর্তমানে যে ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার আমরা ক্রস করেছি, সেটার সাথে যদি আরো ২০/৩০ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়, এটাতো বিশাল একটা এমাউন্ট, আমাদের রিজার্ভ অনেক বৃদ্ধি পাবে। এবং আমাদের বন্দরগুলা যদি রিজিওনাল হাব হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে আমরা কিন্তু নিজেরাই নিজেদের বন্দরটাকে রিজিওনাল হাব হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। আমাদের মাতারবাড়িটা যদি ডিপ-সী টার্মিনাল হিসেবে আমরা ইউজ করি, এই মাতারবাড়িটা হবে আমাদের হাব; এবং চিটাগাং পোর্ট, মংলা পোর্ট, পায়রা পোর্ট-এই তিনটা হবে আমাদের এন্ড ইউজার পোর্ট অথবা আমাদের ফাইনাল ডেস্টিনেশন। আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর এবং মংলা ও পায়রা - এই তিনটা বন্দরের একটা এডভান্টেজ হলো, আমাদের এখানে কারো কার্গোর উপরে আমাদের ডিপেন্ড করতে হয় না। যেমন সিঙ্গাপুর, পোর্ট ক্লাং, কলম্বো এরা কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল হাব। এদেরকে কিন্তু কার্গো এট্রাক্ট করতে হয়। আরেকজনের থেকে কার্গোটা ছিনিয়ে আনতে হয়, কম পয়সা দিয়ে, বা ভালো পারফর্মেন্স দেখিয়ে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেটা নয়। আমাদের কার্গোটাই... ধরেন চায়না থেকে র’ ম্যাটেরিয়াল আসে, সিঙ্গাপুরে ট্রান্সশিপমেন্ট হয়, অথবা সিঙ্গাপুরে না হলেও পোর্ট ক্লাং-এ হয়, অথবা কলম্বোতে হয়। এখন কলম্বো, পোর্ট ক্লাং এবং সিঙ্গাপুর, এরা যখন ইউজারকে ফ্যাসিলিটিস দেয়, তখন তারা তাদের ওখানে যায়। আমাদের এখানে সেই সমস্যা নাই। আমাদের এখানে তাদেরকে কোন সুবিধা দিতে হয় না। ওইখানে দেখা যায় তারা প্রতি কনটেইনারে টু পার্সেন্ট, থ্রি পার্সেন্ট, ফাইভ পার্সেন্ট করে তারা তাদেরকে কন্সেশন দেয়, যেটা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য প্রযোজ্য নয়। চট্টগ্রাম বন্দর হল এন্ড ইউজার পোর্ট, এটা হল ফাইনাল ডেস্টিনেশন। আমরাই ইম্পোর্টার আমরাই এক্সপোর্টার, আমাদের এখানে আসতেই হয়। বরং আমাদের বন্দরে আসতে হলে আমরা তাদেরকে স্পেশাল পারমিশন দিয়ে থাকি। আমরা সব জাহাজকে সমভাবে পারমিশন দেই না। তার কারণ হল, বড় জাহাজগুলাকে আমরা পারমিশন দিয়ে থাকি যেনো আমাদের বন্দরে একটা সিঙ্গেল জাহাজও যদি আনা যায়, দেখা যাবে যে আমাদের ফ্রেট কমে যাবে, আমাদের সময় কমে যাবে, ডিটেনশন এবং ডেমারেজ চার্জগুলো থেকে আমরা অব্যহতি পাবো। এজন্য আমাদের বন্দরের যে সুবিধাগুলা, এইযে লায়াবিলিটিসগুলা, এই লায়াবিলিটিসগুলাকে আমরা যদি এসেটে কনভার্ট করতে পারি, তাহলে কিন্তু আমাদের দেশটাকে উন্নত বিশ্বে নেয়ার আমাদের যে লক্ষ্য, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে স্বপ্ন, ২০৪১ সালের ভেতর উন্নত বাংলাদেশ এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন, আমার মনে হয় সেটা আমরা দ্রুতই বাস্তবায়ন করতে পারবো। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর এই আনওয়ান্টেড এক্সপেন্ডিচারগুলো আমরা যদি রিডিউস করতে পারি, আমাদের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভকে ৯৫ বিলিয়ন ইউএস ডলারে উন্নীত করা বেশি কষ্টের বিষয় নয়, এক বা দুই বছরেই সেটা আয় করা সম্ভব, শুধুমাত্র পোর্টের ফ্যাসিলিটিস এবং পোর্টকে ইউজ করে।
বাহ! বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এত আগ্রহের কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: বাংলাদেশের প্রতি বিনিয়োগাকীরাদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হচ্ছে এর উড়ন্ত প্রবৃদ্ধি। সেই সাথে রয়েছে ১৭ কোটি মানুষের বিশাল বাজার। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেও বঙ্গোপসাগর ঘিরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় জাপানের অর্থায়নে ‘দ্য বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট, বা বিগ-বি কার্যক্রম চলছে। তিনটি স্তম্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই বিগ-বি। প্রথমটি শিল্প ও বাণিজ, যার মূলে আছে গভীর সমুদ্রবন্দর। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে দক্ষিণ তা এশিয়ার সাথে অন্যান্য অংশের বাণিজ্যের দুয়ার হিসেবে কাজ করবে। দ্বিতীয় স্তম্ভটি হলো জ্বালানি। মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিগ-বি আওতাভুক্ত এলাকাই শুধু নয়, পুরো বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যে গতি সঞ্চার করবে। তৃতীয় স্তম্ভটি পরিবহন ব্যবস্থা। দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের স্বার্থে ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পরিবহন’ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী, এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলো পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের মতো বাড়বে।
সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিস্পত্তির পর ব্লু ইকোনমি বিরাট সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে আমরা কোন অবস্থানে আছি?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে আজকের এই যে উচ্ছ্বাস তার ভিত্তি রচনা করে দিয়ে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গোপসাগরের ওপর আমাদের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালেই তিনি ‘টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট ১৯৭৪’ প্রণয়ন করেন। আনক্লজ (ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি) আসে এরও আট বছর পর, ১৯৮২ সালে।
ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিস্তৃত এই সমুদ্র অঞ্চলের সম্পদ আহরণে আগে প্রয়োজন তা নিয়ে জরিপ, অনুসন্ধান ও গবেষণা। সমুদ্র গবেষণার জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বেশ কয়েকটি জাহাজ রয়েছে। বানৌজা অনুসন্ধান নামে নৌবাহিনীর একটি জাহাজ হাইড্রোগ্রাফি সংক্রান্ত জরিপ পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সমুদ্রবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণাকাজে ব্যবহৃত হয় বিএনটি খাদেম নামের বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি ওশান গোয়িং স্যালভেজ শিপ।
সমুদ্রসম্পদ রক্ষায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: বাংলাদেশের অধিকারে আসা বঙ্গোপসাগরের বিপুল সমুদ্রসম্পদ কেবল আহরণ করলেই হবে না। এর সুরক্ষাও দিতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে আমাদের একটি সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে হবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে নাবিক ও জেলেদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। এর মাধ্যমে গভীর সমুদ্রের খনিজ ও মৎসসম্পদ সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একটা ধাপ অর্জন করা সম্ভব হবে। আমাদের নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড বাহিনীর সদস্যরা আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে সমুদ্র এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনীকে একটি ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনীতে রূপ দিয়েছেন। একইসাথে কোস্ট গার্ডকেও আমাদের দীর্ঘ উপকূলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অধিকতর সক্ষম করে তুলছেন। বাহিনী দু’টির উত্তরোত্তর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উন্নয়নে নেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোগ। যা বঙ্গোপসাগর জুড়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি দেশের সমুদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও জোরদার করছে।
প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মেরিন জনশক্তি এই মুহূর্তে আমাদের অনেক বেশি দরকার। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত সেই মেরিন জনশক্তি আমরা কতটা তৈরি করতে পারছি?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: সমুদ্র অর্থনীতির সর্বোচ্চ সুফল কাজে লাগাতে সমুদ্রজ্ঞানসমৃদ্ধ প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই। এজন্য নতুন চারটিসহ আমাদের রয়েছে পাঁচটি সরকারি মেরিন একাডেমি, রয়েছে বেসরকারি আরও কয়েকটি মেরিন একাডেমি। বিশেষায়িত জ্ঞান আহরণের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি। তবে মেরিন একাডেমি থেকে বের হওয়া মেরিনারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে আমাদের নিবন্ধিত জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। এ ছাড়া মার্চেন্ট শিপিং অর্ডিন্যান্স সংশোধন করে চট্টগ্রাম বন্দরেও যাতে জাহাজ নিবন্ধিত হতে পারে সে ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তখন বাধ্যতামূলকভাবে এসব জাহাজকে বাংলাদেশের মেরিনারদের চাকরি দিতে হবে। এর ফলে আরও বেশি মেরিনারের কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটানো যাবে। চূড়ান্ত বিচারে বৈদেশিক আয়ও বাড়বে।
আপনি এর আগে কোস্টগার্ডের দায়িত্ব পালন করেছেন। বন্দর একটা দারুন স্মার্ট অবস্থায় এসেছে আপনার সময়ে। আমরা শুনতে পাচ্ছি দ্রুতই আপনার মেয়াদ শেষ হবে। তো আপনার পরে যিনি দায়িত্ব নেবেন, তাঁর জন্য আপনার বলবার কি থাকবে? পরামর্শ কি থাকবে?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: তাঁর জন্য আমার পরামর্শ থাকবে যে, আমাদের যেসব কার্যকলাপ বা প্রোগ্রাম আমরা গ্রহণ করেছি, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা। ইতিমধ্যে আমাদের কিছু কিছু টার্মিনালকে প্রাইভেটাইজেশন এর জন্য সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সেসব পদক্ষেপগুলাকে আরো দ্রুত এগিয়ে নেয়া। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যাটা ছিল, এই কার্যক্রমের ট্রানজেকশনের অ্যাডভাইজারের রিপোর্টটা আমরা যথাসময়ে পাইনি। তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, কেননা ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার যখন স্টাডি করে, তাদেরও অনেক সময় দিতে হয়, অনেক তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে তাদেরকে বের করতে হয়। কিন্তু আমাদের তো তাড়াতাড়ি দরকার। সেই তাড়াতাড়ির জন্য আমরা তাদেরকে বলেছি এবং তারা সেভাবেই কাজ করছে। আশা করি ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার আমাদেরকে রিপোর্টগুলো দিলে সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে আমরা আমাদের প্রাইভেট টার্মিনালের অপারেটর, ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনালের অপারেটর যারা আছেন তাদেরকে দ্রুত নিয়োগ করতে পারবো। তখন দেখা যাবে আমাদের এখানে আরো কম্পিটিশন বাড়বে এবং আমাদের দক্ষতা এবং তাদের দক্ষতা দুটো মিলে আমাদের বন্দরকে আমরা অন্য একটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবো। এছাড়াও বন্দরের যেসব উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো আছে, বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ি ডিপ-সী টার্মিনাল এগুলা দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করতে পারলেই আমরা আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারবো। ২০৪১ সালের ভেতরে আমাদের যে ডিমান্ড হবে, সেই ডিমান্ড আমরা এড্রেস করতে পারব।
আপনাকে অভিনন্দন। নিশ্চয়ই আপনার পরবর্তী যাত্রাও এরকম সাফল্যমন্ডিত হবে। বন্দর তো নানারকম বাণিজ্যের একটা জায়গা, অর্থ লেনদেনেরও জায়গা, আবার বন্দর ঘিরে নানা রকম অপরাধও ঘটে। আপনার সময়কালে আপনি অপরাধ এবং দুর্নীতি দমনে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরে আমরা ম্যাক্সিমাম জিনিস অটোমেশন করে ফেলেছি। এটা হল ডিজিটালাইজেশনের একটা সুফল, যার ফলে অনেক কম পরিমাণ জনবল সম্পৃক্ত থাকে, তখন দুর্নীতিটা সেখানে হ্রাস পায়। আর আরেকটা জিনিস হল পেমেন্ট সিস্টেমগুলো... এখন কিন্তু আগে যেভাবে ম্যানুয়ালি হাতে হাতে টাকা পয়সা লেনদেন হতো, এখন অটোমেশন সিস্টেমের মাধ্যমে আপনাকে পেমেন্ট করতে হয়। সুতরাং যেখানে অর্থের সরাসরি লেনদেন নাই, সেখানে দুর্নীতির সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। এছাড়াও আমরা বন্দরে কার্যক্রম পরিচালনায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করেছি। এই ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে একই জায়গায় একই রুমের ভেতর থেকে সবার সাথে চেইন সিস্টেমে, পাশাপাশি বসা- সবার সামনে জিনিসগুলো লেনদেন হচ্ছে, সুতরাং স্বচ্ছতা অনেক বেশি। আমাদের যে বার্থিং মিটিংটা হয় প্রতিদিন, সেই বার্থিং মিটিংটা কিন্তু অত্যন্ত স্বচ্ছ একটা প্রক্রিয়া, যেটাতে অনলাইনেও চাইলে যে কেউ যুক্ত হতে পারে। এবং আমাদের জাহাজেও পুরো অটোমেশন বার্থিং সিস্টেম। আমাদের ভিটিএমআইএস আছে, যার মাধ্যমে কোন জাহাজ কখন কার আগে কে আসলো, একদম পুরো রেকর্ড হয়ে থাকে। এখানে কোন জাহাজকে আগে-পিছে করার কোন সুযোগ নাই। আগে পিছে করতে গেলেই তখন তাকে জবাবদিহির ভেতর পরে যেতে হয়, সেই দুর্নীতিটা এখন আর করার কোন সুযোগ নাই। একসময় যখন ছিল ম্যানুয়ালি, তখন হয়তোবা অনেকে অনেক কিছু চিন্তা করতো, কিন্তু এখন টোটালি অটোমেটেড একটা বার্থিং সিস্টেম, সেখানে কারো কোন হাত দেয়ার কিছু নাই। কেউ চাইলেই কোন সিস্টেমে এটা টেম্পারিং করতে পারে না, কারণ কম্পিউটারে কোন জাহাজ কয়টার সময় আসবে, সেই টাইম উল্লেখ করা থাকে - কোন সময় কোন জাহাজ কোন জায়গাতে এসেছে এবং কোথায় নোঙ্গর করেছে। এটা একটা জিনিস, আরেকটা হলো যে পাইরেসের ব্যাপারে, আমাদের এখানে যে জলদস্যুতা এবং বহিনোঙ্গরে যে চুরি ডাকাতি হতো, সেটাও ইনশাল্লাহ আমাদের এখানে কমে গেছে। গত পরপর কয়েক বছর ধরে যে রেকর্ড আপনারা দেখতে পাবেন, সে রেকর্ডে আমরা কিন্তু ‘জিরো পাইরেসি’ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছি। আমাদের বাংলাদেশের কোস্টগার্ড, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং পোর্টের যে সিকিউরিটি, সবাই মিলে আমরা যেভাবে কাজ করি এবং আমাদের টাস্কফোর্সের যে লোকবল, সবাই মিলে যৌথভাবে যে অপারেশন ও কার্যক্রম পরিচালনা করে, তার সুফল আমরা পেয়েছি। এর ফলে আমাদের বন্দরে কোন ধরনের দুর্ঘটনা, কোন ধরনের পাইরেসি, কোন ধরনের জলদস্যুতা বা ছিঁচকে চুরি-ডাকাতির ঘটনা এখন নাই বললেই চলে।
কিন্তু ব্যবসায়ীদের নানা রকমের অভিযোগ শোনা যায় বন্দর নিয়ে। আপনারা কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং নিয়ে এতো দুর্দান্ত উন্নয়ন করেছেন, ঠিক সময় নেমে যাচ্ছে, কিন্তু বন্দর থেকে সেটা ছাড়ানোর জন্য অনেক ব্যবসায়ীকে নাকি স্পিড মানি দিতে হয়। ব্যবসায়ীদের এই অভিযোগটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: স্পিড মানির কথা আপনাকে আমি ঠিক বলতে পারবো না, তবে এই সমস্যাটা চট্টগ্রাম বন্দরে নেই। এই সমস্যাটা হলো কাস্টমসের। লোকজন আমাদের বেশিরভাগ সময় গুলিয়ে ফেলে। আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরের কাজ হল জাহাজ থেকে কার্গোটা নামিয়ে আমাদের ইয়ার্ডে আমরা স্টেক করে রাখি, এর পরে সবকিছু কিন্তু কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এর। আর কাস্টমস থেকে দেখা যায়, অনেক সময় কোন একটা জিনিসকে টেস্ট করতে পাঠায়, কোন একটা জিনিসের এইচএস কোডে সমস্যা থাকে, ডিজি কার্গোর বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকে... তখন তাদের সাথে যখন কাজটা হয়, সেখানে তাদের বিলম্বটা হয়। সেই বিলম্বটার জন্যই কিন্তু আসলে সবাই বলে যে বন্দরে বিলম্ব হচ্ছে, দেরি হচ্ছে, অনেক সমস্যা, কিন্তু আসলে সেটা বন্দরের সমস্যা না। বন্দর অন্যের সমস্যায় জর্জরিত হয়ে বসে আছে। যখনই কাস্টমসের ডকুমেন্টটা আমরা পাই, আমরা কিন্তু দুই-চার ঘন্টার ভেতরেই আমাদের বন্দর থেকে কার্গোটা গেইট দিয়ে আউট করে দেই। কাস্টমস এনবিআর এর আন্ডারে, তাদের সমস্যাটা তাদেরই লুক আফটার করতে হবে। তারাও চেষ্টা করছে, কিছু কিছু অটোমেশন তারাও করেছে। কাস্টমসের তো জনবলের অনেক স্বল্পতা আছে, ইকুইপমেন্টের স্বল্পতা আছে, আর ল্যাবরেটরির সমস্যাটা হলো সবচেয়ে বেশি প্রকট। বিভিন্ন জিনিস টেস্ট করতে হলে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। তারাও চেষ্টা করছে নতুন নতুন ল্যাবরেটরী স্থাপন করার জন্য এবং বাইরে আউটসোর্সিং করেও কিছু দেয়া যায় কিনা সেটাও তারা চেষ্টা করছে। আশা করি এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমাদের বন্দরের বাইরে বিভিন্ন সময়ে আপনারা বিভিন্ন লিটারেচার দেখবেন- চট্টগ্রাম বন্দরে কনজেশন, চট্টগ্রাম বন্দরে ইয়ার্ড স্পেস কম, চট্টগ্রাম বন্দরে ইকুইপমেন্ট কম – এগুলা কিন্তু ওয়ান্স আপন এ টাইম ছিলো। এখন কিন্তু সেটা নাই। এখন চট্টগ্রাম বন্দরে জেটির সংখ্যা পর্যাপ্ত, ইকুইপমেন্ট পর্যাপ্ত। আমি যখন মেম্বার হিসেবে ২০১০ থেকে ২০১৫ সালে এখানে কাজ করি, তখন মাত্র চারটা কি গ্রেনটি ক্রেইন এখানে ছিল। এখন সেখানে ১৮টা, এবং প্রত্যেকটা জাহাজে আমরা তিনটা করে ক্রেনকে একসাথে দিতে পারি। সুতরাং আগে যেখানে জাহাজ কন্টেইনার নিয়ে এসে তিন থেকে পাঁচ দিন লেগে যেতো ডেলিভারি ডিসচার্জ করে যেতে, এখন সেখানে ৩৬ থেকে ৪৮ ঘন্টার ভিতরে তারা ডেলিভারি করে চলে যায়। এক সময় জেটিতে আসার জন্য জাহাজকে বহিনোঙ্গরে করে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, এখন সেটা নেই। এখন জাহাজের জন্য জেটি খালি হয়ে থাকে, আমরা জাহাজ আসার সাথে সাথে ৩৬ থেকে ৪৮ ঘন্টার ভিতরে ডিসচার্জ করে জাহাজকে সেল আউট করে দিচ্ছি। সেই এফিসিয়েন্সি এখন আমাদের অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে। সুতরাং আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে, যে সব লিটারেচারগুলো আছে আমার মনে হয় এখন সময় এসেছে ইন্টারনেটের ওইসব লিটারেচারগুলাকে দূরীভুত করানোর। চট্টগ্রাম বন্দর এখন আর সেই দশ বছর আগের বন্দর নয়। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা আসার পর থেকে আমাদেরকে যেভাবে ইকুইপমেন্ট দিয়েছেন, যেভাবে অর্থ বরাদ্দ করেছেন, যেভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, সেই দিকনির্দেশনার জন্য আজকে চট্টগ্রাম বন্দর এই অবস্থানে আসতে পেরেছে। তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের যতগুলো উন্নয়ন প্রকল্প, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেই সবগুলো করিয়েছেন। আজকে যে আমরা এই জায়গায় এসে পৌঁছেছি, তার কিন্তু কৃতিত্ব আমাদের আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। তিনি বুঝতে পেরেছেন বাংলাদেশের উন্নয়ন করতে হলে বন্দরগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। তিনি বন্দরগুলোকে ঢেলে সাজিয়েছেন, এবং তিনি যেভাবে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি দেশের অন্যান্য সেক্টর যেভাবে ডেভেলপ করছেন, চিটাগাং পোর্টের জন্যও তিনি সেভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। তিনি আমাদের অনুমোদন দিয়েছেন বে-টার্মিনালের, অনুমোদন দিয়েছেন মাতারবাড়ি ডিপ-সী টার্মিনালের, অনুমোদন দিয়েছেন পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালের, এবং রিসেন্টলি ১০৪টা ইকুইপমেন্ট কেনারও তিনি অনুমোদন দিয়েছেন, যে ইকুইপমেন্ট প্রাইসের অর্ধেক অংশ ইতিমধ্যে আমাদের বহরে যুক্ত হয়েছে। সুতরাং আমাদের এখানে এখন কোন ইকুইপমেন্টের সল্পতা নাই। ইয়ার্ড স্পেস সম্বন্ধে বলি, আমাদের এখানে আমি যখন জয়েন করি, তখন ইয়ার্ড স্পেস ছিলো ৩৯ হাজার টিইউস-এর মতো। এখন সেখানে ইয়ার্ড স্পেস হয়ে গিয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার ৫’শো ১৮ টিইউস -এর বেশি। এবং সেটা দিন দিন আমরা বাড়াচ্ছি, এর ভেতর আরো কয়েকটা ইয়ার্ড আমাদের বাড়ছে। সেগুলা হলে আগামী এক মাস/দেড় মাসের ভেতর ৫৫ হাজার টিইউস –এ উন্নীত হবে। সুতরাং আমাদের ইয়ার্ড স্পেস খালি। আগে যেখানে কন্টেইনার স্তুপ স্তুপ হয়ে থাকতো, এখন আমাদের কন্টেইনার ইয়ার্ডে দেখবেন যেখানে কন্টেইনার আগে সিক্স আই হয়ে থাকতো, এখন সেখানে থ্রি আই/ফোর আই -তে নেমে এসেছে। মানে আমাদের ইয়ার্ড স্পেস আমরা এখন অনেক বেশি পাচ্ছি। আমরা ওভারফ্লো ইয়ার্ড তৈরি করেছি। আমাদের এলসিএল যে কার্গোগুলো আছে, সেগুলো আগে জেটির ভেতর থেকেই ডিসচার্জ করতে হতো। এখনো করে, কিন্তু আমরা তার পাশাপাশি এক্স ওয়াই শিপকে বন্দরের বাইরে একটা স্থানে নিয়ে গেছি, সেখানে আগামী অল্পকিছুদিনের মধ্যে সেটাও চালু হবে এবং সেখানে এলসিএল কার্গোগুলো আসলে জেটির ভেতর থেকে যেই কার্গো ডিসচার্জের প্রক্রিয়া, সেটা বাইরে চলে যাচ্ছে। এবং সেটা হলে বন্দরের ভেতর অনেক কম পরিমান ট্রাক ঢুকবে। এভাবেই কিন্তু বন্দরটা কনজেশন ফ্রি হয়। আমাদের বন্দরে এখন কোন কনজেশন নাই, কোন ইয়ার্ড স্পেস শর্টেজ নাই, কোন ইকুইপমেন্টেরও শর্টেজ নাই। এখন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের যেকোন একটা বন্দরের সাথে আমরা আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরকে তুলনা করতে পারি। যে কেউ বন্দরে এসে একবার ভিজিট করে গেলে বুঝবে যে আমরা সিঙ্গাপুর বলেন, কলম্বো বলেন, মালয়েশিয়া বলেন, ইন্দোনেশিয়া বলেন -সব জায়গাতেই যে বন্দরগুলা আছে, আমাদের এশিয়ার যে বন্দরগুলো আছে, প্রত্যেকটা বন্দরের সাথে আমাদের চট্রগ্রাম বন্দরের তুলনা করা যায়। এবং একসময় আমাদের বন্দরের ওপর একটা স্টাডি হয়েছিল লন্ডন ভিত্তিক একটা জায়গা থেকে, তারা বলেছিল যে এশিয়ান রিজনে যে ৬৯টা বন্দর আছে, তার ভেতরে সেমি-অটোমেটিক এবং ম্যানুয়াল মডে যে বন্দরগুলো চলে, তার ভেতরে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান এক নম্বর।
যোগাযোগ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা কতটুকু? কীভাবে এই বিনিয়োগ খাতটিকে আরও এগিয়ে নিতে পারে?
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: পরিবহন এবং লজিস্টিক খাতে দক্ষতা ও গতিশীলতা আনতে বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। অভিজ্ঞ বিদেশী কোম্পানির সাথে যৌথ উদ্যোগ এক্ষেত্রে ভালো একটি বিকল্প হতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এখানকার সড়ক এবং রেলের ফ্রেইট পরিবহন কোম্পানিগুলো অভ্যন্তরীণ শিপিং লাইনগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে। ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মধ্যে নতুন ধরনের ফিডার বার্জ-সার্ভিস চালু করা সম্ভব হলে সড়কপথে ট্রাকযোগে কার্গো পরিবহনের ওপর চাপ কমবে। ফলে নৌপথের ব্যবহার বাড়লে লজিস্টিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে। এ মুহূর্তে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে রয়েছি আমরা। আমাদের বন্দর, রেল, সড়ক ও নৌপরিবহন সেবাসহ প্রতিটি খাতের অব্যাহত উন্নয়ন নিশ্চিত করা আবশ্যক। বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র টার্মিনালেও বিদেশী বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আগামী দিনের ‘এশিয়ান টাইগার’ হয়ে ওঠার পথে দেশকে এগিয়ে নিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে আমরাও প্রস্তুত।
দেশ রূপান্তরকে সময় দিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান: আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে দৈনিক দেশ রূপান্তর এর সবাইকে ধন্যবাদ ও ঈদের শুভেচ্ছা জানাই।
