আগামী অর্থবছরের বাজেটে চলমান বৈশি^ক মন্দা মোকাবিলার কৌশল হিসেবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে জোর দিতে এবং দেশি শিল্পের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী বাজেট শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট হিসেবে দেখতে চান বলেও জানিয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন ঋণদানকারী সংস্থার সংস্কার প্রস্তাবগুলো অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হলে তা বিবেচনা করে দেখতে বলেছেন। তবে এসব সংস্কার করতে গিয়ে যেন সাধারণ জনগণ চাপে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে আওতা বাড়াতে মনোযোগী হতে বলেছেন। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের রূপরেখা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী এ রূপরেখা নিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম, এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব ফাতিমা ইয়াসমিনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে টানা তিন ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠক করেন। আলোচনাকালে করমুক্ত আয় সীমা, করপোরেট কর হার, মহার্ঘ্য ভাতাসহ কিছু জনসম্পৃক্ত বিষয়ে কী পরিমাণ অর্থের সম্পৃক্তা আছে, তা নিয়ে আগামী রবিবার স্পষ্ট হিসাব কষে প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন।
বৈঠকের শুরুতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীকে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলিত বাজেটের আকার, সুদব্যয়, ভর্তুকি, জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, ঘাটতি, ঋণের পরিমাণ, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাসহ বিভিন্ন হিসাব জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী ভর্তুকি কোন খাতে কত তা জানতে চান। সারের দাম বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। আগামী বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপের কারণে দেশের কৃষি উৎপাদনে কোনো ধরনের সমস্যা যেন না হয়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেন। তিনি বলেন, বৈশি^ক মন্দার কারণে দেশের বাজারে অনেক খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। এজন্য আগামী বাজেটে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নিতে বলেন। বিশেষভাবে খাদ্য উৎপাদন, মাছ চাষ, পোলট্রি খাতে সব ধরনের রাজস্ব সুবিধা বহাল রাখতে বলেন। প্রধানমন্ত্রীকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমানো হয়নি বলে জানানো হয়। এমপিওভুক্তিতে বাজেটে বরাদ্দ রাখার কথাও বলা হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রণীত রূপরেখায় সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও এ খাতে বরাদ্দ না রেখেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া হয়। গতকালের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়, মহার্ঘভাতা ১০ শতাংশ দেওয়া হলে ৪ হাজার কোটি, ১৫ শতাংশ দেওয়া হলে ৬ হাজার কোটি এবং ২০ শতাংশ দেওয়া হলে ৮ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় যোগ হবে। বৈঠকে উপস্থিত অন্যরা দেশের মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক হিসাব উল্লেখ করে মহার্ঘভাতার পক্ষেই কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী মহার্ঘভাতার বিষয়ে নেতিবাচক কোনো মন্তব্য করেননি। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত যোগ-বিয়োগ করে একটি হিসাব দাঁড় করাতে বলেন। যা নিয়ে অর্থমন্ত্রীকে গণভবনে রবিবারে বাজেটবিষয়ক বৈঠকে আলোচনা করতে বলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈঠকে মহার্ঘভাতার বিষয়ে কেউ বিপক্ষে কোনো কথা বলেননি।
প্রধানমন্ত্রী বাজেটের অর্থায়নের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান। এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্ব বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে কত ঘাটতি তা জানতে চান। এর কারণ কী তা নিয়ে প্রশ্ন করেন। আগামী অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের কৌশলগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেন। দ্রুত এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশ দেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ কিছুদিন থেকেই অস্থিরতা চলছে। ডলার সংকটে এ দেশের ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা করতে পারছেন না। এসব কারণে রাজস্ব আদায়ে গতি কিছুটা কম হলেও আরেক খাতে আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি আছে। আগামী অর্থবছরে এনবিআরে সংস্কার করা হচ্ছে। ভ্যাট আদায়ে ইএফডি যন্ত্র সরবরাহ করা হবে। দেশি শিল্পকে সুবিধা দিতে পরিচালনার ব্যয় কমানোর জন্য আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়করের (এআইটি) হার ৫ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা যেতে পারে। আগামী অর্থবছরে এনবিআর মোবাইল, সিগারেট এবং ফার্মাসিউটিক্যাল (ওষুধ) খাতের ওপর নির্ভর করেছে। বড় অঙ্কের করফাঁকি উদঘাটনে জোর দিয়েছে। অডিটে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বন্ধে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করছে। করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সম্পদশালীদের ওপর সারচার্জ এবং সুপার ট্যাক্স গ্রুপের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ে কঠোরতা রাখা হয়েছে। দেশি মোটরসাইকেল, প্লাস্টিক, টেলিভিশন, মোবাইল শিল্পে কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অনেক খাতে কর অবকাশ সুবিধা কমানো হলেও প্রয়োজনীয় খাতে বহাল রাখা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে অগ্রিম কর ও উৎসে করে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
চেয়ারম্যান কোন কোন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে তা প্রধানমন্ত্রীকে জানান। প্রধানমন্ত্রী দ্রুত সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে রাজস্ব ঘাটতি কমাতে রাজস্বের আওতা বাড়াতে বলেন।
বৈঠকে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর কথা বলা হলে এনবিআর চেয়ারম্যান এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, এতে রাজস্ব আদায় ও করদাতা হারাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী পরিমাণ রাজস্ব এবং কতজন করদাতা হারাবে তার হিসাব করে তাকে দেখাতে বলেন। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে করমুক্ত আয় সীমা ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। পরিকল্পনামন্ত্রীও এতে সায় দেন।
গণভবনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই থেকে যেসব সংশোধনে দাবি জানিয়েছে তা নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী এফবিসিসিআইয়ের প্রতিটি দাবি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকালের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন রাজস্বের আওতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন। সাধারণ মানুষের ওপর কোনোভাবে বাজেট যেন চাপ সৃষ্টি না করে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে বাজেট করবেন। বিপক্ষে গিয়ে নয়। তবে বহু পুরনো কিছু পদক্ষেপ নতুনভাবে হালনাগাদ করতে বলেন।
