গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আর বাকি ১২ দিন। এই নির্বাচনে তিন মেয়র প্রার্থীর নিশানা বিএনপির ভোট ব্যাংক। তাদের মধ্যে আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনও একজন। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরের মা। অন্য দুজন হলেন জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী সাবেক সচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি পরিবারের সদস্য সরকার শাহনুর ইসলাম রনি।
নির্বাচনে বিএনপির কোনো মেয়র প্রার্থী অংশ না নিলেও কাউন্সিলর প্রার্থী পদে তাদের ৩০ নেতা রয়েছেন। এই নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে বিএনপির ভোট ব্যাংক অন্যতম নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। এই ভোট ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা খানের পক্ষে কোনোভাবেই যাবে না। সে ক্ষেত্রে তিনজনের মধ্যে বিএনপির ভোট নিয়ে কাড়াকাড়ি হবে এটা নিশ্চিত।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুরকে দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ বলা হলেও ভোটের হিসাবে গাজীপুরে বিএনপিকে দূরে ঠেলে দেওয়ার সাহস দেখাবে না কোনো দল ও প্রার্থী। ১৯৯১, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ২০১৩ সালের গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপির ভোটের এক ধরনের হিসাব দিয়ে রেখেছে। এখন দলটির ওই ভোট যে প্রার্থীর দিকে যাবে, তার জয়ের পাল্লাই ভারী হবে।
বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গাজীপুর সিটিতে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন দলের ৩০ নেতা। যদিও তাদের বৃহস্পতিবার দল থেকে শোকজ করা হয়েছে। তারপরও তারা থাকছেন নির্বাচনী মাঠে। এ ছাড়া স্থানীয় নির্বাচন হওয়ায় নানা কারণে বিএনপির সমর্থক নেতাকর্মীরা নির্বাচনে ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবেন। আর গেলে তারা কখনোই নৌকায় ভোট দেবেন না।
ওই নেতারা বলেন, গাজীপুরকে আওয়ামী লীগ তাদের ঘাঁটি মনে করে। প্রকৃত হিসাব করলে গাজীপুর বিএনপির ঘাঁটি। কারণ ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-২ (সদর-টঙ্গী) আসন থেকে বিএনপির ধানের শীষের প্রতীকে অধ্যাপক এম এ মান্নান ৩১ হাজার ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে তিনি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে অধ্যাপক এম এ মান্নান ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে লক্ষাধিক ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। সেই হিসাবে গাজীপুরে যেকোনো নির্বাচনে বিএনপিকে হিসাবে রাখতে হবে যেকোনো প্রার্থীকে।
মেয়র পদে বিএনপির এই ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে তৎপর সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী সাবেক সচিব এম এম নিয়াজ উদ্দিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি পরিবারের সদস্য সরকার শাহনুর ইসলাম রনি।
স্থানীয় লোকজন জানান, জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী লীগের মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায়ও বিএনপির সঙ্গে বিরোধে জড়াননি। তা ছাড়া তিনি মেয়র থাকা অবস্থায়ও বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিল সুসম্পর্ক। সে হিসেবে বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা যদি কেন্দ্রে ভোট দিতে যায়, তবে তাদের অনেকে জাহাঙ্গীর আলমের মায়ের প্রতীক টেবিল ঘড়িতেই ভোট দেবেন বলে তারা মনে করেন।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী নিয়াজ উদ্দিন জানান, তিনি সরকারের সচিব থাকা অবস্থায় গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। অনেককে যোগ্যতা অনুসারে চাকরি দিয়েছেন। বিএনপির সব পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই বিএনপির ভোট লাঙ্গলের বাক্সেই যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
অপরদিকে কারাবন্দি বিএনপি নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম সরকারের ছেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী সরকার শাহনুর ইসলাম রনি হাতি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি বলেন, তার বাবা ছিলেন বিএনপি নেতা। তা ছাড়া সাবেক এমপি, জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসান উদ্দিন সরকার তার আপন জ্যাঠা। তাদের পুরো পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাই দল নির্বাচনী মাঠে না থাকলেও বিএনপি পরিবারের সদস্য হিসেবে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভোট তিনি প্রত্যাশা করতেই পারেন।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে রাজনৈতিক দলের পাঁচজনসহ ৮, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৭৮ এবং সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২৪৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনে ৫৭টি ওয়ার্ডে ৪৮০টি ভোটকেন্দ্রে ৩ হাজার ৪৯৭টি ভোটকক্ষ থাকবে।
মোট ভোটারসংখ্যা ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৭৬, তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৬২ এবং নারী ভোটার ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৯৬ জন। প্রতিটি কেন্দ্রে এবারের ভোট হবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএমএ)।
প্রার্থীদের প্রচার : নৌকা প্রতীকের আজমত উল্লা খান ও টেবিল ঘড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনের প্রচার চলছে সর্বত্র। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন, অংশ নিচ্ছেন সভা-সমাবেশে। বসে নেই এই দুই মেয়র প্রার্থীর পাশাপাশি তাদের কর্মী-সমর্থকরাও। মেয়র প্রার্থী ছাড়াও সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের পোস্টারে ছেয়ে গেছে এলাকার সব রাস্তাঘাট ও অলিগলি।
ক্ষমতাসীন দলের নৌকা প্রতীকের পক্ষে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও দল বেঁধে প্রচার চালাচ্ছেন পুরোদমে। আজমত উল্লা খান বর্তমান সরকারের ব্যাপক উন্নয়নকাজের কথা উল্লেখ করে সেগুলো অব্যাহত রাখতে তাকে নির্বাচিত করার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন তার ছেলে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরকে ১৮ মাস ধরে নানাভাবে হেনস্তার অভিযোগ তুলছেন। সে কারণে তিনি গাজীপুর শহর রক্ষার জন্য মেয়র প্রার্থী হয়েছেন জানিয়ে, তাকে বিজয়ী করার আহ্বান জানানচ্ছেন। বিজয়ী হলে রাস্তাঘাটের অসমাপ্ত উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করে আধুনিক নগরী উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা খান গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। তিনি টঙ্গী বাজার এলাকায় গণসংযোগ শেষে নগরীর ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের টঙ্গীর বাদাম উত্তরপাড়া জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। এ সময় সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। পরে তিনি ওই ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট প্রার্থনা ও প্রচারপত্র বিলি করেন। এ সময় তার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক দলীয় নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
টেবিল ঘড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন তার ছেলে জাহাঙ্গীর আলমকে সঙ্গে নিয়ে জুমার নামাজের পর নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের সালনা এলাকায় গণসংযোগ করেন। তিনি সদর থানার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বাসন থানার চান্দনা চৌরাস্তা ও পরে গাছা থানার বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ করেন। গণসংযোগকালে জাহাঙ্গীর আলম খোলা জিপে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে মায়ের পক্ষে প্রচারপত্র বিলি করেছেন। সামনের সিটে প্রার্থী জায়েদা খাতুন বসে শুভেচ্ছাবিনিমিয় এবং প্রচারপত্র দেন ভোটারদের।
জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী এম এম নিয়াজ উদ্দিন শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ আদায় করেন শহরের সাহাপাড়া জামে মসজিদে। সেখান থেকে তিনি ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে গণসংযোগ করেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী গাজী আতাউর রহমান জুমার নামাজ আদায় করেন গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। নামাজ শেষে তিনি মুসল্লিদের সঙ্গে কুশলবিনিময় ও ভোটপ্রার্থনা করেন। পরে নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকায় গণসংযোগ করেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হাতি প্রতীকের সরকার শাহনুর ইসলাম রনি নগরীর গাছা থানার বোর্ড বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। সেখান থেকে তিনি তার কর্মীদের নিয়ে কাশিমপুর এলাকায় গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করে হাতি প্রতীকে ভোটপ্রার্থনা করেন।
জবাব দিলেন জায়েদা খাতুন : স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনকে রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া আচরণবিধি লঙ্ঘনসংক্রান্ত কারণ দর্শানো নোটিসের জাবাব দিয়েছেন। গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টায় নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে লিখিত জবাব পৌঁছে দেওয়া হয়।
জায়েদা খাতুনের সঙ্গে ছেলে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরের ছবি ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাবে জায়েদা খাতুন বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস পাওয়ার আগ পর্যন্ত জানতেন না। তার নির্বাচনী পোস্টার, লিফলেট হ্যান্ডবিল ছাপাখানায় ছাপা হচ্ছে। তার অজ্ঞাতসারে অতি উৎসাহী ব্যক্তি, কোনো শুভাকাক্সক্ষী, স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি না বুঝে, না জেনে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তার পোস্টার, হ্যান্ডবিল, লিফলেটে মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের ছবি সংযুক্ত করে বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শন করেছেন। তিনি তাদের সেই সব প্রচারসামগ্রী সরিয়ে নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন।
