ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘পাঁচ বছরের জন্য নগরবাসী আমাকে মেয়র নির্বাচিত করেছেন। ৩ বছর পার হয়েছে। এ সময়ে প্রতিশ্রুতির কিছু কাজ করতে পেরেছি; কিছু কাজ চলছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনেক কাজ শুরুই করা যায়নি। তবে নির্বাচনী ইশতেহার ছিল না, এমন অনেক কাজও করেছি। নিয়মিতই আমাকে প্রতিশ্রুতির বাইরের অনেক কাজ করতে হয়। বাসযোগ্য নগর গড়ার কাজ এগিয়ে নিতে হচ্ছে। সব প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা করব।’ গত রবিবার দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপচারিতায় ডিএনসিসি মেয়র এ কথা বলেন।
তিন বছরের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে মেয়র আতিক বলেন, ‘আগে বৃষ্টি হলেই ঢাকার সড়কে হাঁটুপানি জমত। ঢাকার সড়কে নৌকা চলতেও দেখা যেত। জলাবদ্ধ সড়কের খানাখন্দে পড়ে অনেকে হতাহত হতো। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা ওয়াসা থেকে খাল ও নর্দমা বুঝে নিই। সেসব খাল পরিষ্কার, দখলমুক্ত করা হয়েছে; প্রবাহ ঠিক রাখার কাজ শুরু করা হয়েছে। খালের সীমানা চিহ্নিত করার কাজে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা হয়েছে। ডিএনসিসিতে এখন বর্ষায় নগরবাসী আগের সেই জলাবদ্ধতা দেখতে পান না। দুই সিটি মেয়রের পক্ষ থেকেই ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এখন বলা যায়, ঢাকা নগর সংস্থা জলাবদ্ধতা নিরসনে সক্ষম।’
জলাশয় পুনরুদ্ধারের বিষয়ে ডিএনসিসি মেয়র বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে ঢাকা শহর গড়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে জলাশয় রাখা হয়নি। জলাশয় ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে শহরের তাপমাত্রা বাড়ছে। রাজউকের মাস্টারপ্ল্যান ড্যাপে চিহ্নিত জলাশয় রক্ষায় ডিএনসিসি তৎপর। কুড়িল ফ্লাইওভারের পাশের জলাশয় ভরাট করে হোটেল নির্মাণের কাজ বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি। কল্যাণপুরে ওয়াটারপন্ড পুনরুদ্ধারের জন্য নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে লড়ছি। উদ্ধার অভিযান চলছে। সেখানে হাইড্রো ইকোপার্ক বানানো হবে।’
আপনার সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ২২ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে সফল হতে পারছে না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে গরম ও বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে। ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা মূলত জমাট স্বচ্ছ পানিতে বংশ বিস্তার করে। বাসাবাড়িতেও এই মশার প্রজনন ঘটছে। নগরবাসীকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। ডিএনসিসির মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উন্নত বিশে^র প্রযুক্তিও গ্রহণ করা হচ্ছে। মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা চলছে। নগরবাসীকে সচেতন করতে ‘তিন দিনে এক দিন জমা পানি ফেলে দিন’ সেøাগান প্রচারের কার্যক্রম অব্যাহত আছে।’
প্রায়ই বায়ুদূষণে ঢাকা বিশে^ শীর্ষে থাকছে। বাসযোগ্য শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান তলানিতে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজধানীর বায়ুদূষণের বড় কারণ ঢাকার আশপাশের ইটভাটা। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা ৫৮ শতাংশ দায়ী। এ ছাড়া সড়ক ও মাটি থেকে সৃষ্ট ধুলা ১৮ শতাংশ, যানবাহনের ধোঁয়া ১০ শতাংশ, জিনিসপত্র পোড়ানোর ধোঁয়া ৮ শতাংশ ও অন্যান্য কারণে ৬ শতাংশ বায়ু দূষিত হচ্ছে। ঢাকার বায়ুতে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতিও বেড়ে গেছে। এসব কারণে ঢাকার বাসযোগ্যতার মানের অবনমন ঘটছে।’
তিনি বলেন, ‘ধুলাবালি নিবারণে ডিএনসিসি অত্যাধুনিক স্প্রে ক্যানন দিয়ে পানি ছিটাচ্ছে। ডিএনসিসির মহাসড়ক দুই ভাগে ভাগ করে এক দিন অন্তর অত্যাধুনিক দুটি মেশিন দিয়ে পানি ছিটানো হয়। মহাসড়ক ছাড়াও ডিএনসিসির অন্য সড়কগুলোতে ১০টি ওয়াটার ব্রাউজার দিয়ে প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে দুবার পানি ছিটানো হয়। নির্মাণাধীন সড়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পানি ছিটানো হয়। নির্মাণকাজ চলাকালে ঠিকাদাররা যেন মাটি ঢেকে রেখে কাজ করে, সে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্মাণসামগ্রী যত্রতত্র রেখে পরিবেশদূষণ ঘটালে ডিএনসিসির ম্যাজিস্ট্রেট আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন।’
মেয়র বলেন, ‘মেট্রোরেল, বিআরটি, এক্সপ্রেসওয়েসহ চলমান বিভিন্ন প্রকল্প ও যেকোনো ভবন নির্মাণের সময় ধুলাবালির কারণে যাতে বায়ুদূষণ ও পরিবেশের ক্ষতি না হয় তার নির্দেশ দেওয়া আছে। ইটের ব্যবহার বন্ধ করে সিমেন্টের ব্লকের ব্যবহার করতে হবে। প্লাস্টিক বোতলের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সব সংস্থার সমন্বয়ে বায়ুদূষণ কমাতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
আপনার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল সুস্থ, সচল ও আধুনিক ঢাকা গড়া। প্রতিশ্রুতি পূরণে কী উদ্যোগ নিয়েছেন? জবাবে মেয়র বলেন, ‘সিটি করপোরেশন সব ধরনের নাগরিক সেবা নিশ্চিতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে মিরপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক ও ফুটপাত চলাচল উপযোগী করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের তত্ত্বাবধানে মিরপুরে নতুন ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা চলছে।’
তিনি বলেন, ‘মহানগরে সুবজায়নের লক্ষ্যে সড়ক বিভাজকে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। কখনো একটি গাছ কাটা হলে ডিএনসিসি নিজ উদ্যোগে ১০টি গাছ লাগাচ্ছে। কল্যাণপুরে হাইড্রো ইকোপার্কে বনাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ চলছে। করোনাকালীন মহাখালী মার্কেটকে কোভিড-১৯ হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়। ডিএনসিসি রাজস্ব আয় বাড়ানোর চেয়ে মানুষের সেবাপ্রাপ্তিকে গুরুত্ব দেয়। মিরপুরে জাতীয় গৃহায়ণের দুটো জায়গা মাঠ হিসেবে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। একটির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি মিলেছে।’
মেয়র বলেন, ‘ডিএনসিসির নতুন এলাকার উন্নয়নে প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। সেনাবাহিনীকে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। পরিকল্পনাবিদদের নেতৃত্বে ওই সব এলাকার জন্য মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। এর আলোকে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ওই সব এলাকার চেহারা পাল্টে যাবে। ঘিঞ্জি জনপদে শোভা পাবে পরিকল্পিত উন্নয়ন। ওই সব এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে ‘ওয়ার্ড কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলা হবে।’
মেয়র আতিক বলেন, ‘আমার প্রতিশ্রুতির মধ্যে এখতিয়ারবহির্ভূত কোনো প্রতিশ্রুতি আছে কি না, বলতে পারছি না। যদি থাকেও সেগুলো বাস্তবায়নে যাদের এখতিয়ার রয়েছে, তাদের সহযোগিতা করা হবে। সরকারের কাছে সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হবে। শহরের যেকোনো সমস্যার সমাধানে মেয়র ভূমিকা রাখতে পারে।’
