ধরাবাঁধা কাঠামোর বাইরে তিনি সিনেমা বানিয়েছেন। এ যেন নিয়ম ভাঙার অবাধ স্বাধীনতা। চলচ্চিত্রজীবনে কয়জন পারে সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যেতে। পেরেছিলেন বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম নেওয়া এই চলচ্চিত্রকার। সারা বিশ্বের দর্শকদের সামনে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বৈষম্যের কথা, তাদের দারিদ্র্যর কথা, অস্তিত্ব, শ্রেণিদ্বন্দ্বের কথা অনায়াসে বলে যাওয়ার মতো নির্মাতা ছিলেন মৃণাল সেন। উপমহাদেশে চিন্তাশীল চলচ্চিত্রের অন্যতম পথিকৃৎ প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্মশতবার্ষিকী ছিল গতকাল। বিশেষ এই দিন ঘিরে প্রিয় নির্মাতাকে স্মরণ করছে চলচ্চিত্রম ফিল্ম সোসাইটি ও শিল্পকলা একাডেমি। দিনটি উদ্যাপনে যৌথভাবে আয়োজন করা হয়েছে ‘মৃণাল সেন রেট্রোস্পেক্টিভ’। এ আয়োজনে মৃণাল সেনকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনে পাঁচ দিনব্যাপী প্রদর্শিত হচ্ছে তার নির্মিত চলচ্চিত্র ও মৃণাল সেনের জীবনের গল্প নিয়ে তৈরি হওয়া প্রামাণ্যচিত্রসহ ১২টি ছবি। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় বিনামূল্যে মৃণাল সেনের আলোচিত চলচ্চিত্রগুলো দেখার সুযোগ পাবেন সিনেমাপ্রেমীরা। উদ্বোধনী দিনে সন্ধ্যা ৬টায় দেখানো হয় ‘ভুবন সোম’ সিনেমাটি। আজ বিকেল ৪টায় প্রদর্শিত হবে ‘ক্যালকাটা ৭১’ ও প্রামাণ্যচিত্র ‘সেলিব্রেটিং মৃণাল সেন’-পর্ব-১, পরে দেখানো হবে ‘ইন্টারভিউ’ সিনেমা। তৃতীয় দিনের আয়োজনে, বিকেল ৪টায় সিনেমা ‘পদাতিক’, সন্ধ্যা ৬টায় তথ্যচিত্র ‘সেলিব্রেটিং মৃণাল সেন’-পর্ব-২ ও পরে প্রদর্শিত হবে সিনেমা ‘কোরাস’। বুধবার বিকেল ৪টায় প্রদর্শিত হবে সিনেমা ‘পরশুরাম’, সন্ধ্যা ৬টায় তথ্যচিত্র ‘সেলিব্রেটিং মৃণাল সেন-পর্ব-৩, ও সিনেমা ‘একদিন প্রতিদিন’। ‘অকালের সন্ধানে’ সিনেমাটি দেখানো হবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায়। সন্ধ্যায় দেখানো হবে তথ্যচিত্র ‘সেলিব্রেটিং মৃণাল সেন’-পর্ব-৪ এবং পরে ‘খারিজ’ সিনেমার প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে সেদিনের আয়োজন শেষ হবে। সবশেষ আগামী শুক্রবার বেলা ১১টায় ও বিকেল ৫টায় প্রদর্শিত হবে ‘খ-হর’ ও ‘মহা পৃথিবী’ সিনেমা। বিকেল ৫টায় সেমিনার ও প্রবন্ধ পাঠ। সবশেষ ‘ভুবন সোম’ সিনেমার প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনের আয়োজন শেষ হবে।
ঢাকার পাশাপাশি মৃণাল সেনের জন্মভূমি বাংলাদেশের ফরিদপুরেও আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। মৃণাল সেনের প্রথম সিনেমা ‘রাতভোর’ ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায়। তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি সিনেমাটি। ‘নীল আকাশের নিচে’ দিয়ে আলোচনায় আসেন। ‘বাইশে শ্রাবণ’ সিনেমার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাড়া জাগাতে থাকেন। একে একে ২৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য, ১৪টি স্বল্পদৈর্ঘ্য ও ৫টি তথ্যচিত্র বানিয়েছেন। ১৮টি ছবির জন্য পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পেয়েছিলেন ১২টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ছিলেন কান, ভেনিস, বার্লিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবের বিচারক। বাংলা ছাড়াও হিন্দি, ওডিশি ও তেলেগু ভাষায় ছবি নির্মাণ করেছেন মৃণাল সেন। মৃণাল সেন ভারতের বিনোদন জগতের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারসহ (২০০৫) ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মশ্রী (১৯৮১) পেয়েছেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৯৫ বছর বয়সে মারা যান বাংলা চলচ্চিত্রের এই দিকপাল। তার কলকাতা ট্রিলোজি অর্থাৎ ‘ইন্টারভিউ’(১৯৭১), ‘কলকাতা ৭১’(১৯৭২) এবং ‘পদাতিক’(১৯৭৩) বাংলা চলচ্চিত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ‘খারিজ’ ১৯৮৩ সালের কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছিল। ‘ভুবন সোম’, ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘অন্তরীণ’, ‘আমার ভুবন’ মৃণাল সেনের পরিচালিত ছবি।
