বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রতি বছর মারাত্মক হচ্ছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের তাগিদ ধীরে ধীরে বাড়ছে। যদিও আমাদের মতো দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা এটা নিয়ে এখনো হয়তো দ্বিধায় আছেন। তারা ভাবছেন, নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কতটুকু সম্ভব, প্রযুক্তি কোথা থেকে আসবে, বিনিয়োগ কীভাবে হবে ইত্যাদি। আর এসব দ্বিধার প্রকাশ ঘটে তখন, যখন তারা ‘গ্রিন এনার্জি’ ও ‘ক্লিন এনার্জি’কে একই দৃষ্টিতে দেখেন। এসব প্রশ্ন ও দ্বিধার কারণও আছে। প্রচলিত জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যে বহুপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী যুক্ত রয়েছে, তাতে সরকার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক, সরবরাহকারী, ঠিকাদার, যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী ও সরবরাহকারী, বিনিয়োগকারী এবং বিনিয়োগের নিশ্চিত লাভের যে কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে তাকেই বা কে ভাঙতে চাইবে?
তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা অবশেষে নীতিনির্ধারকদের বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও পরিবর্তন নিয়ে আসতে শুরু করেছে। কারণ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি যেভাবে কোম্পানিগুলো যেভাবে মুনফা লুটেছে তা নজিরবিহীন। ২০২২ সালে এক্সন মবিল, শেল, শেভরন, টোটাল এনার্জিস ও ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ম প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার মুনফা করেছে, যেখানে ২০২১ সালে ছিল ৯০ বিলিয়নেরও কম। আমাদের (দরিদ্র দেশগুলোর) কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা এখন এই কোম্পানিগুলোর শেয়ারহোল্ডারদের পকেটে। বিপরীতে আমাদের অবস্থা তথৈবচ, প্রাথমিক জ্বালানির সরবরাহের দিকে অজানা আশঙ্কায় তাকিয়ে থাকতে হয়। কয়লায় জাহাজ এলো কিনা? সরকার এনএলজির জাহাজ কিনছে কিনা? নাকি আবারও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা!
বাংলাদেশে একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি হোম সোলার সিস্টেম স্থাপনের উদাহরণ রয়েছে। যদিও প্রয়োজনীয় নীতিকাঠামোর অভাবে সেই অগ্রগতি ধরে রাখা যায়নি। অন্যদিকে সরকারি নীতিমালার আলোকে বহুতল ভবনগুলো সোলার সিস্টেম স্থাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এগুলোর কতগুলো এখনো কার্যকর আছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আর এসবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ভবিষ্যৎ নেই, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসায়ীরা এমন একটি ‘ন্যারেটিভ’ বেশ ভালোভাবেই ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এই বিশ্বাসে কিছুটা হলেও চির ধরাতে পেরেছে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করার জন্য অবশ্যই ইতিবাচক। আর এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইতিমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। কক্সবাজারের বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতিমধ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, চলতি বছরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে আসবে ৬০ মেগাওয়াট। পাশাপাশি সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরের অফশোরে বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সরকারের পক্ষ থেকে এডিবির সহায়তায় একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অবশ্য সরকার চায় ২০৪০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সংস্থান করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৪১ সালে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর জন্য বাংলাদেশে ৪৫,০০০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকতে হবে। এর মধ্যে যদি ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে করতে হয় তাহলে ১৮০০০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
সময় এসেছে, অতীতকে পেছনে ফেলে দূরদর্শী ও ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ উদ্যোগ গ্রহণ করার। এ ধরনের উদ্যোগ হতে হবে সরকারি নীতি প্রণয়ন ও এর কার্যকরী বাস্তবায়ন সম্পর্কিত। কালক্ষেপণ না করে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সেল প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। যারা বহুপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্টতা ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। যা বাংলাদেশের টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (স্রেডা) এই মুহূর্তে করতে পারছে না। প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। সৌরবিদ্যুতের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ওপর কর তুলে দিয়ে ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানিতে দেওয়া ভর্তুকির একটা অংশ এখানে দেওয়া গেলে তার ফল হবে যুগান্তকারী। উদ্যোক্তারা যাতে দেশেই সৌরবিদ্যুৎ ও এ সম্পর্কিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি উৎপাদনে এগিয়ে আসে তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিতে হবে। এভাবে প্রাইভেট সেক্টর নিজেরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত হবে এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উৎপাদকের জন্য অবকাঠামো তৈরি হবে।
বিভিন্ন সময়ে বলা হয়, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংস্থান নেই, কিন্তু এটাও সেই ‘সম্ভব না’ ন্যারেটিভের অংশ। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ দেশে এখনো সোলারের জন্য যথেষ্ট ব্যবহার উপযোগী জমি আছে। জানা যায়, বর্তমানে নেট মিটারিং থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ৫০ মেগাওয়াটের কম। নেট মিটারিং ব্যবস্থায় সহায়তা দিলে তার সুফল সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে পড়বে। এর প্রভাবে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। আসছে জাতীয় বাজেটে এ সম্পর্কিত বিশেষ বরাদ্দের দাবি রাখে।
মনে রাখতে হবে, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি সংস্থানের উদ্যোগ শুধু প্রাথমিক জ¦ালানি সংস্থানের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বই প্রতিষ্ঠা করবে না, একই সঙ্গে এর ফলে দেশের যুব সমাজের কর্মসংস্থানের একটি নতুন দ্বার উন্মোচন হতে পারে। প্রচলিত তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জটিল যন্ত্রপাতির প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ যেমন আমাদের নেই, একইভাবে সহসা তা গড়ে ওঠারও সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে এই দৃশ্যপট সহসাই পরিবর্তন করার সুযোগ রয়েছে। উদ্যোগ গ্রহণ করলে এ সম্পর্কিত প্রযুক্তিজ্ঞান দ্রুত অর্জন করা সম্ভব। এর ফলে বেকার, দক্ষ ও অদক্ষ যুব জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র হতে পারে। তবে এসব তো সম্ভাবনার কথা, এই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে দিন শেষে আমরা কতটুকু উদ্যোগী হতে পারছি তার ওপর।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
