আত্মহত্যা করতে চাওয়া জাহ্নবী এখন শক্তির মন্ত্র

আপডেট : ১৯ মে ২০২৩, ০৫:৪১ এএম

‘২০১৯ সাল, রুয়েটের সেকেন্ড ইয়ার। একটা ম্যাথ কোর্সেও পাস করি নাই। নোটিস দিল, ওই ইয়ারেরসহ নাকি তিনটা ব্যাকলগ দেওয়া লাগবে। ক্লাস, ল্যাব। তার ওপর আমার পার্টটাইম খ্যাপ মারা আপওয়ার্কের প্রজেক্টের ডেডলাইন। পদ্মার পাড়ে বইসা ভাবতেছিলাম, সাঁতার জানি না, লাফ দিলে কি মইরা যাব!’

আবেগি গলায় কথাগুলো বলা জাহ্নবী রহমান দীর্ঘ সময় হতাশাগ্রস্ত থেকেছেন, বেশ কয়েকবার আত্মহত্যাও করতে চেয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতাশা কাটিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো সফলতার আকাশে ডানা মেলেছেন এই তরুণী। হতাশাগ্রস্ত অসংখ্য তরুণ-যুবাকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে গড়ে তুলেছেন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রিলাক্সি। নিজের এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এবার ঠাঁই পেয়েছেন সুপরিচিত মার্কিন ম্যাগাজিন ‘ফোর্বস’-এর তৈরি করা এশিয়ার ৩০ বছরের কম বয়সী উদ্যোক্তা ও সমাজ পরিবর্তনকারীদের (চেঞ্জমেকার) তালিকায়।

গতকাল ‘ফোর্বস’-এর তালিকায় নিজের নাম দেখার পর দেশ রূপান্তরকে রিলাক্সির সহ-প্রতিষ্ঠাতা জাহ্নবী শোনান ‘শতভাগ মারা যাওয়ার নিশ্চয়তা’ না পেয়ে আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরে আসা ও পরে যাত্রার গল্প। ফোর্বসের তালিকায় নিজের নাম দেখে কেমন লাগছে এমন প্রশ্নের জবাবে জাহ্নবী রহমান বলেন, ‘সকাল ৫টা ২৪ মিনিটে মেইলটা দেখার পর, এক নিমেষে লাস্ট ৫ ইয়ার ফ্ল্যাশব্যাক হলো চোখের সামনে।’ তিনি বলেন, ‘এই অর্জন শুধু আমার নয়। যারা নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে স্ট্রাগল করছে আমার এই অর্জন তাদের জন্য।’

জাহ্নবী জানান, ২০১৯ সাল থেকে নাইমুল হক জয়, সামিউল ইসলাম স্বপ্নিল ও জাহ্নবী রহমান একসঙ্গে কাজ করছেন। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) থেকে পড়াশোনা করেন স্বপ্নিল ও জাহ্নবী, আর জয় পড়াশোনা করেছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে।

শুরুর দিকে তারা ১৮ বছরের কম বয়সী তরুণ-তরুণীদের নিয়ে গ্যামিফিকেশ (অনূর্ধ্ব ১৮ বয়সীদের সফট স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) শুরু করেন। ২০২১ সালে কুয়েটে কিছু আত্মহত্যার ঘটনা তাদের ভাবনা বদলে দেয়। সে সময় তারা অনুভব করলেন, ১৮-৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি। ফলে তাদের বেশি সহযোগিতা দরকার।

এই চিন্তা থেকে রিলাক্সি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ শুরু করে। ২০২২-এর জুলাইয়ে প্লে স্টোরে তারা রিলাক্সি নামে অ্যাপস চালু করেন। এখন পর্যন্ত অ্যাপসটি ১৮ হাজারের বেশি ডাউনলোড হয়েছে। ৪ হাজারের বেশি ব্যবহারকারী নিয়মিত অ্যাপসটা ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমে মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে ফ্রিতে যোগাযোগ করতে পারে, যেকোনো সমস্যা শেয়ার করলে বিশেষজ্ঞরা তাদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের জন্য ফ্রি থেরাপি ও মেডিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়।

জাহ্নবী একা নয়। তার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ তালিকায় স্থান পেয়েছেন আরও ছয় বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী। ক্ষেত্রগুলো হলো কনজ্যুমার টেকনোলজি, গণমাধ্যম, বিপণন, বিজ্ঞাপন ও সামাজিক প্রভাব।

এ তালিকায় রয়েছেন আরমান আজিজ (প্রতিষ্ঠাতা, যাত্রী, বিভাগ : কনজিউমার টেকনোলজি), রুবাইয়াত ফারহান ও তাসফিয়া তাসবিন (প্রতিষ্ঠাতা, মার্কোপলো, এআই; বিভাগ : মিডিয়া, মার্কেটিং ও বিজ্ঞাপন), দীপ্ত সাহা (সহ-প্রতিষ্ঠাতা, অ্যাগ্রোশিফট টেকনোলজিস; বিভাগ : কনজিউমান টেকনোলজি), আনোয়ার সায়েফ ও সারাবন তহুরা (প্রতিষ্ঠাতা, টার্টল ভেঞ্চার স্টুডিও; বিভাগ : সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট)।

ফোর্বস ম্যাগাজিনে জায়গা পাওয়া নিয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার সায়েফ অনিক ও সারাবন তহুরা তুরিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফোর্বসের তালিকায় স্থান পাওয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। খুবই খুশি লাগছে।

 ২০১৮ সালে টার্টল ভেঞ্চার নামে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। এর আগে ২০১৬-১৭ আমাদের স্টার্টআপের প্ল্যান শুরু করি, এবং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করি। শুরুর দিকে সঠিক গাইড লাইনের অভাবে আমরা স্টার্ট আপগুলোতে ব্যর্থ হই। তারপর আমাদের ব্যবসার পলিসি পরিবর্তন হয়।’

সায়েফ ও তুরিন বলেন, ‘২০২২ সালে আমরা উপলব্ধি করি, বাংলাদেশ সরকারের প্রচুর সাপোর্ট থাকলেও, আমাদের সংস্কৃতি ও সোশ্যাল এক্সপেক্টেশন এবং পর্যাপ্ত ফান্ডিং স্টার্ট আপ ব্যবসার জন্য বড় বাধা।’

এ দুই সফল উদ্যোক্তা জানান, টার্টল ভেঞ্চার স্টুডিওর মাধ্যমে তারা দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের তৈরি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে কাজ করছেন। স্টার্টআপগুলোকে অর্থায়ন, পরামর্শ, কারিগরি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সেগুলোকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরতে সহযোগিতা করছেন।’

নতুনদের জন্য পরামর্শ জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘ফোকাস ধরে রাখতে হবে অর্থাৎ নির্দিষ্ট একটা বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে। আপনি যদি এক সঙ্গে একাধিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে চান তাহলে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ঢাকা শহরের এসি রুমে বসে স্টার্টআপ সম্ভব নয়। আপনি যদি সফল হতে চান তাহলে অবশ্যই মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত