চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাতরী ইউনিয়ন বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি গঠনে সভাপতি মনোনয়নে গোপনে তালিকা পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। এতে সভাপতি পদে জামায়াতের এক নেতাকে বসাতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগের তীর চট্টগ্রাম-১৩ সংসদীয় আসনের বিএনপির এমপি সরওয়ার জামাল নিজামের বিরুদ্ধে। বিষয়টি খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত গড়িয়েছে।
এ বিষয়ে সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট নুরুল কবির রানা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এছাড়া গত ১৫ জুলাই সংশ্লিষ্ট ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি নোটিশও পাঠানো হয়েছে। নোটিশপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা হলেন-মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রামের মহাপরিচালক,চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা,আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা,উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
এদিকে,বুধবার (২২ জুলাই) বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠিয়েছেন সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট নুরুল কবির রানা। এটির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে বিএনপির মহাসচিব, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব,চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক,চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক এবং সদস্য সচিবকে।
এতে বলা হয়,বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সভাপতি পদের জন্য আবেদন আহ্বান করলে ছয়জন প্রার্থী জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রধান শিক্ষকের তিনজনের নাম সুপারিশ করার কথা থাকলেও গত ১৫ জুলাই স্থানীয় সাংসদ সরওয়ার জামাল নিজামের নির্দেশনায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবু তাহের শহীদুল আলমকে প্রথম,নুরুল আলমকে দ্বিতীয় এবং আহমদ ছফাকে তৃতীয় রেখে তিন সদস্যের একটি তালিকা গোপনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠান। তালিকা পাঠানোর পর এক প্রার্থীকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তায় প্রধান শিক্ষক লেখেন,‘সালাম নিবেন,এমপি মহোদয়ের নির্দেশনা মোতাবেক তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে। ধন্যবাদ।’
ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তাদের দাবি,সভাপতি হিসেবে যাকে সংসদ সদস্য সুপারিশ করেছেন তিনি চাতরী ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
সভাপতি পদপ্রত্যাশীদের অভিযোগ,বিধি অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতা বিবেচনা না করে গোপনে তিন সদস্যের একটি তালিকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একাধিক প্রার্থী প্রতিবাদ জানিয়ে নতুন করে সবার মতামতের ভিত্তিতে তালিকা প্রণয়নের দাবি তুলেছেন।
জানা যায়, শহীদুল আলম ২০১২ সালে চাতরী ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন। পরে স্থানীয় আরেক জামায়াত নেতা কাজী হেলালের সঙ্গে বিরোধের জেরে তিনি সংগঠনের কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তবে তিনি সংগঠন থেকে পদত্যাগ বা দল ছাড়ার কোনো আবেদন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কাছে জমা দেননি। পরে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের ঘনিষ্ট হয়ে ওঠেন।
আনোয়ারা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাষ্টার আবদুল গণি বলেন,শহীদুল আলম ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাতরী ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে এক কর্মীর সঙ্গে বিরোধের পর তিনি সংগঠনের কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তবে তিনি সংগঠন ছাড়ার বিষয়ে দায়িত্বশীলদের কাছে কোনো আবেদন জমা দেননি।
সভাপতি পদপ্রার্থী নুরুল আলম বলেন,আমাকে না জানিয়ে আমার এক জুনিয়রকে প্রথমে রেখে তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে আমি তালিকা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করেছি। সব প্রার্থীর মতামত নিয়ে নতুন তালিকা পাঠানোর দাবি জানাচ্ছি।
আরেক সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট নুরুল কবির রানা অভিযোগ করে বলেন,জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার পর থেকেই একজন প্রার্থী স্থানীয় এমপির প্রভাব খাটিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করে আসছেন। প্রার্থীদের সঙ্গে কোনো বৈঠক না করে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতা উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক তালিকা পাঠিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবু তাহের বলেন,স্থানীয় এমপির মতামত নিয়ে উনার নির্দেশনা মতে ৩ জনের নামের তালিকা জমা দিয়েছি। পাঠানো এ তালিকায় অন্য সভাপতি প্রার্থীও সন্তুষ্ট নয় এবং তালিকার মধ্যে নাম থাকা একজন প্রার্থীও সন্তুষ্ট নয়। তিনি তালিকা থেকে তার নাম প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাধব চন্দ্র বসু বলেন,অ্যাডহক কমিটির তালিকা নিয়ে কয়েকজন প্রার্থী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা করে নতুন তালিকা জমা দেওয়া হবে।
বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো একটি আবেদনের অনুলিপি হাতে পেয়েছি। এটি সাংগঠনিকভাবে দেখা হবে।