রোজার ঈদের পরই পেঁয়াজের দাম আকাশছোঁয়া। রোজার মাসে কেজিতে ২৫-৩০ টাকার মধ্যে থাকলেও এখন তা ৮০ টাকার বেশি। দাম কমানোর জন্য সরকারের নীতিনির্ধারকরা দাবি করছেন, এখন আমদানিই সমাধান। গতকাল রবিবার দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রী শিগগিরই পেঁয়াজ আমদানির কথা জানিয়েছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমদানির অনুমতি চেয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম নিয়ন্ত্রক শামীমা আক্তার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
একদিকে সরকারের মন্ত্রীরা দাবি করছেন পেঁয়াজের মজুদ যথেষ্ট আছে। এবার ফলনও ভালো হয়েছে। অন্যদিকে বাজার মনিটর করতে না পেরে সরকার ভোক্তাদের অজুহাত দিয়ে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুই মন্ত্রীই দাবি করছেন, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পেঁয়াজের বাজার নিয়ে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমদানি ছাড়া কোনো উপায় নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল রাজধানীর বাড্ডা আলাতুন্নেছা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া ও মেধা পুরস্কার এবং গুণিজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন পর্যাপ্ত হয়েছে। কিন্তু বেশি লাভের আশায় অনেকে পেঁয়াজ মজুদ রেখে সংকট তৈরি করে বাজারকে অস্থিতিশীল করছে। ভোক্তা পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বাজার বিবেচনায় আমরা পেঁয়াজ আমদানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। ইমপোর্ট পারমিট বা আইপি যেহেতু কৃষি মন্ত্রণালয় দিয়ে থাকে তাই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। বাজার পর্যবেক্ষণ করে তারা এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে বলে আমাদের জানিয়েছে।’
টিপু মুনশি আরও বলেন, ‘দেশের কৃষকরা যাতে পেঁয়াজের ন্যায্য দাম পান, সে জন্য মূলত ইমপোর্ট পারমিট বন্ধ রাখা হয়েছে। এখন যেহেতু ভোক্তাদের বাজারে পেঁয়াজ কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, তাই আমদানি করা ছাড়া উপায় নেই। আমদানির পর বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে বলে আশা করছি।’
বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের দিয়ে বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। নির্ধারিত দামে বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে কি না, তাও পর্যবেক্ষণে মনিটরিং করা হচ্ছে।’
একই দিনে সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, পেঁয়াজের দাম ৮০ টাকা কেজি কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে দাম কিছুটা কমতির দিকে থাকায় আরও দুই-তিন দিন বাজার পরিস্থিতি দেখে পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, গত বছর দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ও মজুদ ভাল ছিল। পেঁয়াজের দাম কম ছিল, কৃষকরা কম দাম পেয়েছিলেন। ওই বছর দাম বাড়বে এই আশায় মজুদ করে রাখা পেঁয়াজ পচে গিয়েছিল। কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। সে জন্য এ বছর পেঁয়াজের কী অবস্থা আমরা দেখতে চাচ্ছি। কৃষকের কাছে, গুদামে ও আড়তদারের কাছে কী পরিমাণ পেঁয়াজ আছে, তা দেখতে দুই-তিন দিন মাঠপর্যায়ের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা খোঁজখবর নিয়েছে। মাঠ থেকে তথ্য পেয়েছি যে যথেষ্ট পেঁয়াজ মজুদ আছে। তবে, দাম আরও বাড়বে এই আশায় বাজারে বিক্রি করছে না। এ ছাড়া, মাত্রই পেঁয়াজের মৌসুম শেষ হয়েছে। এই মুহূর্তে দাম বাড়ার কথা না। সিন্ডিকেটের হাত আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম বেশি হওয়ায় মধ্যম ও সীমিত আয়ের মানুষের কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত চাষির স্বার্থটা দেখতে চাচ্ছি। কারণ, গত বছর কৃষকরা দাম কম পাওয়ায় এ বছর পেঁয়াজের উৎপাদন কমেছে প্রায় ২ লাখ টনের মতো। আমরা উচ্চপর্যায়ে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা করছি। গভীরভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ করছি। দুই-তিন দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে পেঁয়াজ আমদানি করা হবে কি না।’
মন্ত্রী বলেন, ‘পেঁয়াজ খুবই পচনশীল ফসল। এটি রাখা কঠিন। পেঁয়াজ রাখা যায় না, শুকিয়ে যায়, পচে যায়। তবে আমরা কিছু প্রযুক্তি নিয়ে এসেছি, কীভাবে গুদামে রাখা যায়। যদি শেলফ লাইফ বাড়ান যেত, তাহলে আমাদের যে উৎপাদন হচ্ছে, তাতে পেঁয়াজ দিয়ে বাজার ভাসিয়ে দেওয়া যেত।’
