যাবতীয় কল্যাণ, হেদায়েত ও সঠিক পথ রয়েছে কোরআন মাজিদের অনুসরণে। যেখানে মিথ্যা অনুপ্রবেশ করতে পারে না, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। কল্যাণময় এই কিতাবে আমাদের রব মুত্তাকিদের একটি বিশেষ গুণের কথা জানিয়েছেন যারা তার ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও সম্মানের অধিকারী। গুণটি ইমানদারদের আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য, সব জ্ঞানের সারকথা, ইমানের প্রমাণ বাহক এবং আল্লাহর সন্তষ্টি পাওয়ার সোপান।
দয়াময় আল্লাহর ভয় হলো মহান আল্লাহকে সম্মান প্রদর্শন ও তার সম্পর্কে জেনে তাকে ভয় করা। এ ভয় তার সুন্দর সুন্দর নাম ও উন্নত গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞানীদের ভয়, যারা আল্লাহর প্রশংসাযোগ্য হেকমতপূর্ণ কর্ম ও বিধান সম্পর্কে জানে। ‘না দেখেও আল্লাহকে ভয় করা’ বলতে, বান্দা কর্র্তৃক তার রবকে ভয় করে চলা এমন সময়ে, যখন সে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকে, যখন আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাকে দেখতে পায় না। এটাই আসল বাস্তবসম্মত ভয়, এটাই পরিপূর্ণ ভয় যার অধিকারীদের মহান আল্লাহ প্রশংসা করে বলেছেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই কেবল তাকে ভয় করে।’ সুরা ফাতির : ২৮
স্বীয় রব সম্পর্কে বান্দার জ্ঞান যত বাড়বে, তার প্রতি ভয় বেশি তৈরি হবে; ফলে সে এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন সে তাকে দেখছে। জান্নাতকে এমন ব্যক্তির নিকটবর্তী করা হবে এবং তাকেই ক্ষমার প্রতিশ্রুতিমূলক সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। এ মর্মে মহাসত্যবাদী আল্লাহ বলেন, ‘জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে মুত্তাকিদের, কোনো দূরত্বে থাকবে না। এরই প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল প্রত্যেক আল্লাহ অভিমুখী (অনুরাগী, ঈমানদার), হেফাজতকারীর (জিকিরকারী) জন্য, যারা গায়েব অবস্থায় দয়াময় আল্লাহকে ভয় করেছে এবং বিনীত চিত্তে উপস্থিত হয়েছে।’ সুরা কাফ : ৩১-৩৩
আল্লাহকে ভয়কারী বান্দারা সতর্কবাণী থেকে উপকৃত হয়। কেননা তাদের ভয় সত্য, যাতে কোনো লৌকিকতা নেই। ভয়ের অধিকারীদেরই কিয়ামতের দিন বিশ্বপ্রভুর সামনে দ-ায়মান হওয়ার সময়ে সম্মানজনক বিশেষ প্রতিশ্রুতির ওয়াদা দেওয়া হয়েছে। সেটা হবে জান্নাতে প্রবেশের আগে কিয়ামতের ময়দানে। নবী কারিম (সা.) তাদের সুসংবাদ প্রদান করে বলেন, ‘যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া অন্যকোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তার আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। তাদের একজন হলো, ওই ব্যক্তি যাকে কোনো উচ্চ বংশীয় রূপসী নারী আহ্বান জানায়, কিন্তু সে এই বলে তা প্রত্যাখ্যান করে যে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। আরেকজন ওই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, ফলে তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়।’ সহিহ বোখারি
পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর দলিল প্রমাণ করে যে, আল্লাহর ভয় দুই রকমের, যা পরস্পর সঙ্গতিপূর্ণ।
এক. স্বীয় রবের ব্যাপারে বান্দার এই ভয়, তিনি তাকে কৃত গোনাহের দায়ে শাস্তি প্রদান করবেন। এই ভয়ের সুফল হলো আল্লাহর সীমা সংরক্ষণ এবং পাপকর্ম ও এর উপকরণসমূহ বর্জন করে চলা। তাবেয়ি হজরত সাঈদ বিন জুবাইর (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহর ভয় বলতে তাকে এমনভাবে ভয় করা, যা তোমার ও পাপকর্মের মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়।’ কাজেই আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচতে ও তার শাস্তির ভয়ে যে পাপ থেকে নিজেকে নিবৃত করল, মূলত সেই না দেখেও আল্লাহকে ভয় করল। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ করল, তারপর তা পরিত্যাগ করে স্বীয় রবের কাছে তওবা করে ফিরে আসল; সেও এ প্রকার ভয়ের অধিকারী।
এই প্রকারের ভয় অর্জনের কিছু উপায় রয়েছে, যা কেবলমাত্র তারাই অবলম্বন করে যারা তাদের রবকে সম্মান প্রদর্শন করে। এগুলোর মধ্য থেকে বান্দার জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী হলো হৃদয়ে ও নির্জনে সর্বদা আল্লাহর নজরদারিকে স্মরণ রাখা। হজরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘তোমাদের আল্লাহকে ভয়ের অসিয়ত করছি, যখন তোমরা নির্জনে থাকো।’ যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে ভয় করে, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুরক্ষিত থাকে এবং আল্লাহ প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কর্মকান্ডে তাকে হেফাজত করবেন ও তাকে সব বিষয়ের সীমার মধ্যে রাখবেন।
আল্লাহর ভয় অর্জনের আরেকটি উপায় হলো আল্লাহর সুন্দর নাম ও উচ্চ গুণাবলীর মর্ম অনুধাবন করে তার ইবাদত করা। অনুরূপভাবে আল্লাহর প্রকাশ্য ক্ষমতা, শক্তি, কর্র্তৃত্ব ও রাজত্বকে স্মরণ এবং তার জাগতিক ও শরিয়তে নিদর্শনাবলীকে গভীরভাবে দর্শন করা। যা পাপীদের থেকে তার প্রতিশোধ গ্রহণ, যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান, কঠিনভাবে পাকড়াও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেই সঙ্গে যারা তার সীমা অতিক্রম করে তাদের পরিণাম ও শাস্তির হুমকি সংবলিত দলিলগুলো নিয়ে চিন্তা করা। কাজেই এসব ঐশ্বিক গুণাবলী এবং রবের হেকমত ও ইনসাফপূর্ণ কর্মের বিষয়ে যে ব্যক্তি গভীরভাবে চিন্তা করবে, তার মধ্যে এমন ভয় তৈরি হবে যা তাকে কবিরা গোনাহ থেকে বিরত রাখবে, সগিরা গোনাহে লিপ্ত থাকা থেকে সতর্ক করবে এবং শরিয়তের বিধান ও আদেশ-নিষেধ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করবে।
দুই. আল্লাহর ভয়ের অপর প্রকার হলো বান্দা রবের জন্য যেসব ইবাদত করছে তা তার কাছে কবুল না হওয়ার আশঙ্কা করা। এ প্রকার ভয়ের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা থেকে আল্লাহর অলি-মুত্তাকিদের কতিপয় অবস্থা জানা যায়। আল্লাহতায়ালা এ সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন এবং নবী কারিম (সা.) তা বর্ণনা করেছেন। ‘নিঃসন্দেহে যারা তাদের প্রতিপালকের ভয়ে সন্ত্রস্ত, যারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলিতে বিশ্বাসী, যারা তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে শরিক করে না। আর যারা তাদের প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, বিশ্বাসে তাদের যা দান করবার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে। তারাই দ্রুত সম্পাদন করে কল্যাণকর কাজ এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়।’ সুরা আল মুমিনুন : ৫৭-৬১
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘মুমিন বান্দা খরচ করে ও দান করে। কিন্তু তার হৃদয় আশঙ্কায় থাকে যে, এটা তার রবের কাছে পৌঁছবে কি না।’
হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! তারা যাবতীয় সৎকর্ম পালন করেছেন, এজন্য তারা সাধনা করেছেন। এতদসত্ত্বেও তারা এগুলো পরিত্যাজ্য হওয়ার আশঙ্কা করেছেন।’
মুমিন একনিষ্ঠতার সঙ্গে সুন্নত পদ্ধতিতে সওয়াবের আশায় আল্লাহর ইবাদত করে, কিন্তু সে আল্লাহর উদ্দেশ সম্পর্কে নিশ্চিত নয়, সে সৎআমল কবুলের শর্ত পূরণের বিষয়ে ত্রুটি হওয়ার আশঙ্কা করে। সে আল্লাহর আনুগত্যমূলক আমল করে আর তার ওপর তার অনুগ্রহ প্রত্যক্ষ করে, যেহেতু তিনিই তাকে এগুলো পালনের তওফিক দিয়েছেন ও এগুলোর প্রতি নির্দেশ করেছেন। এখানে তার কোনো কিছু নেই, তার রব ছাড়া কোনো শক্তি ও উপায় নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমাদের কাছে যেসব নিয়ামত রয়েছে তা তো আল্লাহরই কাছ থেকে।’সুরা আন নাহাল : ৫৩
ফলে সে রবের প্রতি সুধারণার কারণে এগুলোর জন্য সওয়াবের প্রত্যাশা এবং নিজের আমলের ব্যাপারে এমন নেতিবাচক ধারণার কারণে তা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে অবস্থান করে। এমন ব্যক্তিই প্রকৃত মুমিন; কোনো সৎআমল তাকে প্রতারিত করতে পারে না, নিজে কোনো আমল করে আত্মতৃপ্তিতে ভুগে না এবং আল্লাহর কৌশল থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বস্তুত ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর কৌশলকে নিরাপদ মনে করে না।’ সুরা আরাফ : ৯৯
আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর কৌশলের দাবি হলো, তিনি নানাবিধ হারাম, লোভ-লালসা ও প্রবৃত্তির বিষয় দ্বারা স্বীয় বান্দাদের পরীক্ষা করবেন। এগুলো তাদের নাগালে থাকবে, এর উপকরণগুলোও তাদের জন্য প্রস্তুত রাখা হবে; যাতে এটা সুস্পষ্ট হয়, তাদের মধ্যে কে তার রবকে প্রকৃতপক্ষে ভয় করে। পরিণতিতে সে এর বিশেষ সম্মান লাভ করবে। আর এ জাতীয় ভয়ের অধিকারীদের প্রতিদান সর্বোত্তম হবে।
১৯ মে শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান
