গাজীপুর সিটি করপোরেশন (গাসিক) নির্বাচন সুষ্ঠু করা নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের কথা রাখার চেষ্টা করেছে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলেছিলেন, নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক রেখে ভোটের দিন ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত কঠোর থাকবে ইসি। কেউ অন্যায় করলে ছাড় পাবে না। তাদের সেই বক্তব্যের কিছুটা প্রতিফলন ঘটেছে গতকালের নির্বাচনে।
এ ছাড়া এই নির্বাচনকে ইসি নিজেরও আস্থা অর্জনের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। সে কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোটের দিন সকাল থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে বসানো ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরার মাধ্যমে ঢাকা থেকে সরাসরি পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দিন শেষে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে কমিশন।
জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটের পরিবেশ ভালো ছিল। বলা চলে সন্তোষজনক। তবে ইভিএমের কারণে ভোট গ্রহণের গতি ধীর ছিল।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘রুশ স্বৈরশাসক স্টালিনের একটি উক্তি আছে কীভাবে ভোট হলো, কে ভোট দিল সেটা দেখার বিষয় নয়। কে ভোট গণনা করল সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে যারা ভোট দিয়েছে তাদের বেশিরভাগই বলছেন, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে। কিন্তু ভোট গণনা যারা করছেন, তারা যে ফল উল্টো দিয়ে জায়েদা খাতুনের ভোট আজমত উল্লা খানকে বা আজমত উল্লা খানের ভোট জায়েদা খাতুনকে দিয়ে দেবেন না, সেটি নিশ্চিত কে করবে। আমাদের আপত্তির জায়গাটা সেখানেই।’
সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘পরিবেশ দৃশ্যমান শান্তিপূর্ণ ছিল। অশান্তির কোনো কারণও ছিল না। কেননা, সেখানে বিরোধী কোনো পক্ষ নেই। তারা তারাই ভোট করেছে। আজমত উল্লা খান আর জাহাঙ্গীর আলম দুজনই ক্ষমতাসীনদের পক্ষের। তাই নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে নির্বাচন পর্যন্ত ইসির হস্তক্ষেপ দরকার পড়েনি।’
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, ‘ইসি যে কথা বলেছিল, তা রাখতে তারা সচেষ্ট ছিল। দীর্ঘদিন পর মনে হয়েছে ভোটের পরিবেশ কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে।’
জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা পাঁচ সিটি নির্বাচনের প্রথমটি গাজীপুরে ভোট হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে। নির্বাচনে বিএনপি না থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত সাবেক মেয়রের মাকে নিয়ে শুরু থেকে আলোচনা ছিল। কারণ বিএনপি না থাকায় এই স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুনই আওয়ামী লীগ প্রার্থী আজমত উল্লা খানের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।
সকাল ৮টা থেকেই ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের পাঁচতলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন নির্বাচন কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ৪ হাজার ৪৩৫টি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা হয়। নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবীব খান, মো. আলমগীর, রাশেদা সুলতানা ও আনিছুর রহমান কন্ট্রোল রুমে বসে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন।
সকাল ১০টায় সিটি নির্বাচনের একটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরায় অনিয়ম দেখতে পান নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা। তিনি বলেন, বুথে পাঞ্জাবি পরা এক লোক বসে আছেন ১০১ কেন্দ্রের ৩ নম্বর বুথে। তিনি কারও কথা শুনছেন না। তিনি বেরও হচ্ছেন না। ভোটারদের জোর করে ভোট দেওয়াচ্ছেন। তার কারণে ভোটগ্রহণে সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত অ্যাকশনে যান, প্রয়োজনে তাকে গ্রেপ্তার করুন। একইভাবে ১০৩ নম্বর কেন্দ্রে আরেকজনকে ভোটগ্রহণে সমস্যা তৈরি করতে দেখে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইসি জানায়, গোপন কক্ষে প্রবেশ এবং ভোটদানে প্রভাবিত করায় তাদের আটক করা হয়েছে। ১০১ ও ১০৩ নম্বর কেন্দ্র থেকে আটক করা দুজন হলেন যথাক্রমে রিয়াদুল ইসলাম রিয়াজ ও আবু তাহের।
পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বেশ কয়েকবার নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। যদিও তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।
ভোটগ্রহণ শেষ হলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন চার নির্বাচন কমিশনার। তাদের দৃষ্টিতে ভোট কেমন হয়েছে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আলমগীর বলেন, ‘আপনারাই আগে বলেন, গাজীপুর সিটি নির্বাচন কেমন হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আমাদের নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা এবং গণমাধ্যম ও নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক টিমের কাছ থেকে যে খবর পেয়েছি, সেটি হচ্ছে, গাজীপুর সিটি নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যেসব প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন, তারা সবাই বলেছেন নির্বাচনব্যবস্থায় তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। এই নির্বাচনে যে ফলাফলেই আসুক না কেন, তারা সবাই মেনে নেবেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি ৫০ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে। তবে হিসাব করলে সঠিক তথ্যটা পাওয়া যাবে।’
ভোটার উপস্থিতি নিয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘নির্বাচনী আইনে আছে, নির্বাচনে শেষ সময় পর্যন্ত যদি ভোটার উপস্থিতি থাকে, তাহলে ভোটারের ভোট না নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ব্যালটের ক্ষেত্রে যে নিয়ম, ইভিএমের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম।’
সিসিটিভিতে কোনো অনিয়ম ধরা পড়েছে কি না এমন প্রশ্নে আলমগীর বলেন, ‘অনেক সময় ভোটারদের লাইন ধরা, কারও ভোট আগে নেওয়া, এ ধরনের কিছু জিনিস আমাদের কাছে ধরা পড়েছে, সেগুলোর বিষয়ে আমরা তাৎক্ষণিক ফোন দিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি। এ ছাড়া দুটি কেন্দ্রে আমরা দেখেছিলাম, এজেন্ট ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন আমরা তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া আমাদের এবং পুলিশের নজরে আর কোনো ঘটনা আসেনি।’
তিনি বলেন, ‘প্রায় সাড়ে চার হাজার সিসিটিভি একসঙ্গে দেখা যায়নি। এগুলো পর্যায়ক্রমে দেখতে হয়েছে। একবারে ৩০০-৪০০ সিসিটিভি দেখা গেছে। এজন্য কিছু ঘটনা আমাদের নজরে নাও পড়তে পারে। সিসিটিভির এ উদ্যোগটাই আমাদের সফলতা। সিসিটিভিতে যেগুলো ধরা পড়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি।’
কেন্দ্রে জায়েদা খাতুনের এজেন্ট ছিল না এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘গাজীপুরে অবস্থানরত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে। তারাও আমাদের বলেছে, এরকম কোনো কিছু হয়নি।’
সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা দিলে যুক্তরাষ্ট্র দায়ী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য ভিসা না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে যে ভিসানীতি নিয়েছে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় নির্বাচন কমিশনার আলমগীরকে। এর জবাবে তিনি বলেন, ‘ইসির আইন অনুযায়ী আগামী নির্বাচন হবে। এর সঙ্গে বিদেশিদের কোনো মন্তব্য আমরা নেব না। এটা রাষ্ট্র টু রাষ্ট্র দেখবে।’
