পরাধুনিক ম্যাজিক রিয়েল প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান

আপডেট : ৩০ মে ২০২৩, ১১:৫৮ পিএম

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অনেক আগেই বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের ধামাধরা মননে-মস্তিষ্কে যার প্রতিফলন ঘটেনি অনেক দিন পর্যন্ত। তবে এই যুদ্ধের বেশ আগেই পরিবর্তিত বিশ্ব-প্রেক্ষাপটটি দৃশ্যমান হয়েছে অনেকের কাছে যারা দিনদুনিয়ার হালনাগাদ খবর রাখেন অথবা রাখতে বাধ্য হন তাদের কাছে।

প্রথাগত প্রগতিশীল বা বামপন্থি বাতাস ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় দোল খাচ্ছে না। কমিউনিস্টদেরও আর সাচ্চা কমিউনিস্ট বলা সম্ভব হচ্ছে না তাদের অ-কমিউনিস্ট, অ-মার্কসবাদী ক্ষেত্রবিশেষে হাস্যকর এবং গোঁড়া তথা মৌলবাদী বিশ্ববীক্ষার কারণে। হঠাৎ মনে হতে থাকল এবং সঙ্গত কারণেই যে, প্রগতিশীলরা, বামপন্থিরা, মার্কসবাদীরা অগ্রসরতার, প্রতিশীলতার তাবৎ ব্যাকরণ ভুলে গিয়ে সুকুমার রায়ের হাঁসজারুতে পরিণত হয়েছে।

এক সময় যাদের কল্যাণ অর্থনীতির প্রবর্তক-প্রচারক ভাবা হতো (এ কথা অনেক আগে কার্ল মার্কসও ভেবেছিলেন; মার্কসবাদের তিনটি উৎসের একটি ইংল্যান্ডের অর্থনীতির বিংশ শতকীয় ভার্সন ইংল্যান্ড তথা ব্রিটিশ অর্থনীতির কল্যাণ-দর্শন), যাদের গণতন্ত্রের সহি খিদমতগার ভাবা হতো তাদের বাহ্য রূপ ইরাক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কী করে যে এত বদলে গেল (সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ভূমিকা স্মর্তব্য) তা ভাবা যায় না। গণতন্ত্র তথা ডেমোক্র্যাসির আরেক সোল এজেন্ট আমেরিকার চেহারাও উইপনস অব মাস ডেস্ট্রাকশনের বুলি আওড়াতে আওড়াতে কী করে যে ডেমনিক ফেস (দানবীয় চেহারা) হয়ে উঠল ভেবে কুল পাওয়া যায় না। দুনিয়ার প্রচল রাজনীতির চেহারাও তখন বদলে গেল। সে কথা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অনেক আগের কথা।

তুরস্কে এরদোয়ানের উত্থান এবং হালের তুর্কি রাজনীতিকে তথাকথিত উদার প্রগতিশীল বামপন্থি রাজনীতির ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে এবং মার্কিন রাজনীতির আল কায়দা, দায়েশ, তাকফিরি, আল নুসরা, ফাতাহ আল শাম, ফ্রি সিরিয়ান আর্মি, আইএস বা আইএসআইএস এবং তার পূর্ববর্তী রূপ আইএসআইএল (ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড লেবান্ত) তথা আইসিল তোষণের এবং পরিপোষণের দেউলিয়া ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে বুঝে নেওয়া বা বুঝে নিতে পারা দরকার। আল কায়দা বা আইএসআইএস বা আল নুসরা বা ফাতাহ আল শামের সঙ্গে হালের তুরস্কের এরদোয়ান-গুলেনের গভীর সুসম্পর্ক ছিল; এরদোয়ানের এখনো আছে। অটোমান সাম্রাজ্যের গর্ব পুনরুদ্ধারেরও একটা সম্পর্ক আছে এসবের সঙ্গে।

তথাকথিত উদার, ধর্মনিরপেক্ষ এবং প্রগতিশীল (বিশেষ করে ইউরোপে এবং মার্কিন মুল্লুকে) রাজনীতির চেহারায় এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে, তুরস্কের মেকি ধর্মনিরপেক্ষতার আবহে এরদোয়ান হেরে যাবেন। ইউরোপে জাতীয়তাবাদীরা এবং আপাত ধর্মের হুক্কাবরদাররা জিতে যাচ্ছে বা ক্ষমতাসীনদের চ্যালেঞ্জে ফেলছে, যেমন ফ্রান্সে মারিঁ ল পেন, জার্মানিতে এএফডি, আর ইতালিতে সরাসরি তারা ক্ষমতায় গেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে তথাকথিত লেফটদের, অ্যান্টিফা (অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট) মুভমেন্টের ভাত উঠে গেছে বলা যায়। রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাটদের পার্থক্য ঘুচে গেছে, মুছে না গেলেও।

নিওকনরা রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট দুই শিবিরেই আছে। নিওকন মানে নিওকনজারভেটিভ মতান্ধ এক যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীর নাম। কার্যত অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের আমলে ফিরে গেছে আমেরিকা, যখন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ছিল রক্ষণশীল এবং প্রতিক্রিয়াশীল আর রিপাবলিকান পার্টি ছিল উদার এবং প্রগতিশীল। আমেরিকা পাল্টে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চেহারার বদল ঘটেছে ’৭৩ সালে নিওলিবারেল আর্থিক নীতির আমদানির পর। এর জেরে ইউরোপও পাল্টে গেছে। বদলে যাওয়া বিশ্বে এরদোয়ানের সমস্যা তাহলে কোথায়? 

এরদোয়ানের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সমস্যা নেই। নেই বলেই ৫২ দশমিক ১৪ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি দ্বিতীয় দফায় জিতে গেছেন। ৫০.০১ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় তিনি প্রথম দফায় বিজয়ী ঘোষিত হতে পারেননি। দ্বিতীয় দফায় সেই শর্তটি পূরণ করলেন।

এবার রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হলেন। এর আগে তিনি ২০০৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট হন। পরিবর্তমান বিশে^র প্রথম তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলা চলে তাকে। আর আমাদের অর্থাৎ দাস্য মনোবৃত্তির লোকেদের মননে এরদোয়ান একজন হাঁসজারু প্রেসিডেন্ট তিনি ন্যাটোতেও আছেন, আবার ন্যাটোর ঘোর প্রতিপক্ষ রাশিয়ার অর্থাৎ পুতিনের সঙ্গেও আছেন। তিনি বেহেস্তেও আছেন, আবার দোজখেও আছেন। তিনি গণতন্ত্রে আছেন, তিনি অটোমান সাম্রাজ্য তথা উসমানীয় খেলাফতেও আছেন। প্রকারান্তরে আইএস নামের দায়েশ খেলাফত তথা আল নুসরা-ফাতাহ আল শামের সঙ্গেও আছেন। সত্যি কথা বলতে, তিনি পরাধুনিক বা উত্তরাধুনিক জমানার ম্যাজিক রিয়েল প্রেসিডেন্ট। অশ্বে পাড়া ডিম্ব।

পার্লামেন্টে এরদোয়ানের একে পার্টির জোট পিপলস অ্যালায়েন্স সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে প্রথম দফা নির্বাচনেই। পার্লামেন্ট এরদোয়ানের হাতেই থাকছে। এরদোয়ানের বিরোধী জোটের প্রচারণার মূল বিষয় ছিল রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার। তারা প্রেসিডেনশিয়াল ব্যবস্থা বদলে পার্লামেন্টকে আরও শক্তিশালী করতে চেয়েছিল। এই ইস্যুতেই তারা জোটবদ্ধ হয়েছিল। তবে পরিবর্তনের জন্য তাদের পার্লামেন্টে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার ছিল তা হয়নি। কেমাল কিলিচদারুগলু বা তার দল বা জোট সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরতে দরকারি সংস্কার আনতে পারবেন না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তার অনেক উদ্যোগে পার্লামেন্টের সমর্থন মিলবে না।

এক দশক আগেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে এরদোয়ান সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের টানাপড়েন ছিল। গত চার-পাঁচ বছরে প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক অনেক ভালো হয়েছে। তুরস্ক থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চার নম্বরে রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্কও অনেক এগিয়েছে। সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক যোগাযোগ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে। এরদোয়ান সরকার রোহিঙ্গাদের সহায়তা দিচ্ছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিসি) গাম্বিয়ার অভিযোগে তুরস্কের প্রকাশ্য সমর্থন আছে। যখন বাংলাদেশের বড় প্রতিবেশী দেশগুলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে এত সরব ছিল না তখন তুরস্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

তুরস্কের নির্বাচন নিয়ে বাইরের আগ্রহ সব সময় থাকে। এবার বিশেষ আগ্রহের বড় কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ন্যাটোর অংশ হয়েও বিভিন্ন ইস্যুতে স্বতন্ত্র অবস্থানে ছিল এবং রয়েছে দেশটি। তুরস্কের যুদ্ধাস্ত্র, ড্রোন ইউক্রেনে ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার ন্যাটো জোটের রাশিয়ামুখী সম্প্রসারণে আপত্তি জানিয়েছিল তুরস্ক। এ নিয়ে পশ্চিমারা হতাশ এবং নাখোশ। ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে খাদ্যশস্য রপ্তানি বিষয়ক সমঝোতা তৈরির ক্ষেত্রে দেশটি বড় ভূমিকা রেখেছে।

‘কিংমেকার’ সিনান ওগান দ্বিতীয় দফা ভোটে এরদোয়ানকে সমর্থন দিয়েছিলেন। অর্থাৎ এরদোয়ানের ফের প্রেসিডেন্ট হওয়ায় সিনান ওগানের একটা নিয়ামক ভূমিকা আছে। তিনি সমর্থন দেওয়ার সময় কিছু শর্ত দিয়েছিলেন। যেমন তুরস্কে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এবং সিরিয়ার শরণার্থীদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে ধর্মনিরপেক্ষ নীতিগুলো নিশ্চিত করতে হবে, এ কথাও তিনি বলেছিলেন। তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা কামাল আতাতুর্কের আদর্শ অনুসরণের শর্ত দেন তিনি। সিনান ওগান এরদোগানের মতোই ডানপন্থি রাজনীতিতে বিশ্বাসী লোক। এরদোয়ান ও তার সমর্থকদের মধ্যে অনেক ইস্যুতে মিল রয়েছে।

এরদোয়ান যখন তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন তখন তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের ১০০ বছর পূর্ণ হবে। নির্বাচনের ফল ঘোষিত হয়েছে যদিও এখনো চার লাখ ভোট গোনা বাকি। অবশ্য তাতে নির্বাচনের সার্বিক ফলে কোনো প্রভাব পড়বে না। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা ১ জুন চূড়ান্ত ফল দাপ্তরিকভাবে ঘোষণা করার। এরদোয়ানের বয়স এখন ৬৯ বছর। তিনি তিনবার জিতলেন। তার আগে প্রথম তিনজন প্রেসিডেন্ট মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক চারবার, মোস্তফা ইসমেত ইনোনো চারবার এবং মাহমুদ সেলাদিন ‘সেলাল’ বায়ার তিনবার জয়ী হয়েছিলেন।  এরদোয়ানের বাবা-মা জর্জিয়া থেকে তুরস্কে অভিবাসন করেছিলেন। সেই সূত্রের কথা যদিও এখন তিনি স্বীকার করেন না। ২০১৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থান প্রয়াস তিনি রাশিয়ার ইন্টেলিজেন্স সহায়তায় বানচাল করেছিলেন। জড়িত সন্দেহে তিনি ১৩ হাজার সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিকে আটক করেছিলেন। সামরিক বাহিনীর ওপরও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেন। তখন মাত্র আলেপ্পো-যুদ্ধ (সিরিয়া) শেষ হয়েছে। অভ্যুত্থানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক জেনারেল এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (ন্যাটো জোটের সমর্থনে) জড়িত ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে তখনই। সিরিয়ায় রাশিয়ার একটি এস-২৪ বিমান মার্কিন-ন্যাটো উস্কানিতে ভূপাতিত করার দায়ে রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছিল। অভ্যুত্থান-সূত্রে তার উন্নতি হয়, তারপর রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা কেনে তুরস্ক। তারপরও টানাপোড়েন ছিল রাশিয়ার সঙ্গে। তবে ইন্টেলিজেন্স সহায়তার জন্য পুতিনের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা বোধ রয়েছে এরদোয়ানের।

এবার বিজয়ী হয়ে এরদোয়ান বলেছেন, তিনি পুতিনের ইচ্ছা পূরণ করবেন। তার আকাক্সক্ষা অনুযায়ী তুরস্কের থ্রেসে গ্যাস হাব তৈরি করবেন। সেখান থেকে রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে সরবরাহ করা হবে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে (নর্ড স্ট্রিম ১ ও ২) ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এটা করলে তুরস্ক হবে ইউরোপের গ্যাসকেন্দ্র। তাতে অবশ্য রাশিয়ার সহায়তা থাকবে।

গ্যাস-হাবের উদ্যোগ বন্ধ করার জন্য ন্যাটোর গোপন সহায়তায় কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার গোয়েন্দা জাহাজে হামলা চালানো হয়েছিল। খাদ্য রপ্তানির রুট ব্যবহার করে ইউক্রেন এ কাজটি করেছিল, অবশ্য তাতে সফল হয়নি তারা। গ্যাস হাব স্থাপনের কথা বললেও রাশিয়া-তুরস্ক সম্পর্ক এখনো মসৃণ নয়। এরদোয়ানে রাশিয়ার সন্দেহ পুরোপুরি নিরসিত হয়নি। স্মরণ করা যেতে পারে, তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়ার ১২টি যুদ্ধ হয়েছে। প্রত্যেকবারই রাশিয়া বিজয়ী। পরিবর্তমান বিশে^ পরিবর্তিত এরদোয়ানের ভূরাজনৈতিক খেলা দেখার আগ্রহ আছে সবার মধ্যেই। তুরস্ক আরও বেশি ন্যাটোলগ্ন হবে, নাকি রাশিয়া-চীনের সঙ্গে মিলে ইউরেশীয় তুর্কি-মঙ্গল হবে! কী খেল দেখাবেন পরাধুনিক-উত্তরাধুনিক ম্যাজিক রিয়েল প্রেসিডেন্ট!

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত