২০২১-২২ অর্থবছরেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিতভাবে নিট মুনাফা হয়েছিল ১ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে লাভে থাকা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান মুনাফা থেকে ছিটকে পড়ায় চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পরিচালনায় সরকারকে লোকসান গুনতে হয়েছে ১৩ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। লোকসানে শীর্ষে রয়েছে জ্বালানি খাতের বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, বিদ্যুৎ বিভাগের বিপিডিবিসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। বিপরীতে যোগাযোগ ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো মুনাফা করেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।
অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরের (২৩ মে পর্যন্ত) হিসেবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা। লোকসানের দিক দিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশন বা টিসিবি। চলতি বছরের ২৩ মে পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।
সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরেও বিপিসির লাভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। এই প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখ দেখা শুরু করে ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে। টানা সাত বছর মুনাফায় থাকার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় ২০২১-২২ অর্থবছরে এসে ফের লোকসানে পড়ে। এ সময় লোকসান হয় ১ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। শুধু লোকসানই নয়, এ মুহূর্তে ডলার সংকটের কারণে বিভিন্ন দেশের বকেয়াও মেটাতে পারছে না সরকারি এ সংস্থাটি।
২০২১-২২ অর্থবছরেও ৮৫৪ কোটি টাকা লাভ করা প্রতিষ্ঠান টিসিবিকে এ বছর লোকসান গুনতে হয়েছে ৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ সংকটের কারণে সরকারি এ প্রতিষ্ঠান বেশ ঘাটতিতে পড়েছিল। তবে সরকারি প্রণোদনা থাকা সত্ত্বেও এ প্রতিষ্ঠানটিকে বিপুল পরিমাণের লোকসান গুনতে হয়েছে।
এ বছর প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা লোকসানে থাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ২০২১-২২ অর্থবছরেও লোকসান গুনেছিল মাত্র ৩ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। এই প্রতিষ্ঠান ২০২০-২১ অর্থবছরে লাভের মুখ দেখেছিল ১৪৫ কোটি টাকা। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ বেড়েছে।
লোকসানে থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিএসএফআইসি ৬৭৮ কোটি টাকা, বিজেএমসি ২৪৮ কোটি টাকা।
তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান লোকসানে থাকলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই অল্প হলেও মুনাফা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে যোগাযোগ বিভাগের প্রতিষ্ঠানগুলো, যাদের মুনাফার অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। তা ছাড়া সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান যেমন বিএসটিআই, ইপিবি বা বিটাকের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের মুনাফা এসেছে ৮৭৪ কোটি টাকা। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাভ করেছে বেজা, ৩৭৫ কোটি টাকা। এই তালিকায় আরও রয়েছে বিআরইবি, বিআইআরসি, বেপজাসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।
অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, বিপিসির ইতিহাসে সর্বোচ্চ লোকসান ছিল ২০১১-১২ অর্থবছরে। ওই বছর সংস্থাটি লোকসান গুনে ১১ হাজার ৩৭১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৯ হাজার ৫৫৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ও ২০১০-১১ অর্থবছর ৮ হাজার ৮৪০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা লোকসান দেয় বিপিসি। তবে ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে লোকসান কমে সংস্থাটির। ওই দুই অর্থবছর বিপিসির লোকসান ছিল যথাক্রমে ৪ হাজার ৮৩২ কোটি ৩৬ লাখ ও ২ হাজার ৩২১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে আসায় এরপর টানা আট বছর মুনাফা করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিপিসি মুনাফা করে ৪ হাজার ১২৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর তা আরও বেড়ে হয় ৯ হাজার ৪০ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছর ৮ হাজার ৬৫৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তবে উচ্চ মুনাফার পরও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম না কমানোয় সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এতে অনেকটা বাধ্য হয়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয় ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল।
এর প্রভাবে পরের অর্থবছর বিপিসির মুনাফা কিছুটা কমে যায়। এতে ২০১৭-১৮ অর্থবছর ৫ হাজার ৬৪৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা মুনাফা করে বিপিসি। ২০১৮-১৯ অর্থবছর তা আরও কিছু কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭৬৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। তবে করোনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করে। এতে ২০১৯-২০ অর্থবছর বিপিসির মুনাফা কিছুটা বেড়ে হয় ৫ হাজার ৬৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আর ২০২০-২১ অর্থবছর তা রেকর্ড ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকায় পৌঁছায়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করলে গত অর্থবছরের শুরু থেকে ডিজেলে লোকসান গুনতে শুরু করে বিপিসি। এতে ২০২১ সালের ৪ নভেম্বর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো হয়। ওই অর্থবছর ফার্নেস অয়েলের দামও ছয়বার বাড়ানো হয়। পাশাপাশি জেট ফুয়েল ও মেরিন ফুয়েলের দাম বাড়ানো হয় বেশ কয়েকবার। এরপরও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে সব ধরনের তেলে লোকসান গুনতে শুরু করে বিপিসি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত আগস্টে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের খুচরা মূল্য দাঁড়ায় ১১৪, পেট্রোল ১৩০ ও অকটেন ১৩৫ টাকা। তবে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক কমানোর কারণে কিছুটা লোকসান কমে বিপিসির। এতে ওই মাসেই সব ধরনের তেলের দাম পাঁচ টাকা হারে কমানো হয়। এরপরও ডিজেলে বড় অঙ্কের লোকসান গুনছে বিপিসি। তবে অকটেনে কিছু মুনাফা করে সংস্থাটি। তবে বিপিসি বিক্রি করা জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেলের পরিমাণই প্রায় ৮০ শতাংশ। এতে সংস্থাটির লোকসান কমানো যায়নি।
