পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য) এ কয়েক মাস আগেও যুক্তরাষ্ট্রের পরম ভরসার মিত্র ছিল সৌদি আরব। কিন্তু বিগত কয়েক মাসে বিশ্বব্যবস্থা বেশ বদলে গেছে। আর এ বদলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় আভাসটি দিয়েছে সৌদি আরব, মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অন্যরকম আচরণের মাধ্যমে। সম্প্রতি চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসানে পদক্ষেপ নিয়েছে সৌদি আরব। এ ছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রুশ তেলের অভাবে নাকাল পশ্চিমাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তা হাজির করেছে শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটি। সৌদি আরব সম্প্রতি তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দেওয়ায় পশ্চিমা বাজারে দ্রুত বেড়ে গেছে তেলের দাম। এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার পশ্চিমা পদক্ষেপেও কাক্সিক্ষত সাড়া দেয়নি রিয়াদ। সব মিলিয়ে এমন সৌদি আরবকে হয়তো কখনই চায়নি পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। তবে সৌদির এ পথে হাঁটার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নিজেও দায়ী। বিশেষ করে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে জড়ানোয় শীতলতার শুরু হয় দুই দেশের মধ্যে। দিনে দিনে সেই শীতলতা বেড়ে চলেছে। এদিকে বাস্তবতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রও এখন পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য) থেকে কূটনৈতিক-সামরিক নজর সরিয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। অথচ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের জ¦ালানির অন্যতম উৎস সৌদির তেল। এদিকে আগামী জুলাই থেকে সৌদি আরব দৈনিক আরও ১০ লাখ ব্যারেল তেল কম উৎপাদন করবে। সৌদির এমন ঘোষণায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। তাই আর চুপচাপ বসে থাকতে পারল না ওয়াশিংটন। রিয়াদ তেলের উৎপাদন আরও কমানোর ঘোষণা দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মঙ্গলবার রাতে সৌদি আরবে উড়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন।
ব্লিঙ্কেনের এ সফরকে সম্পর্ক উন্নয়নের সফর হিসেবে উপস্থাপন করছে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে বলছে, ‘সম্পর্ক ভালো করতে’ সৌদি সফরে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, গত কয়েক বছর ধরে ইরান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, তেলের দাম নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ সামনে এসেছে। ইরানের সঙ্গে সৌদি আরব কূটনৈতিক সম্পর্ক আবার চালু করার পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশে গেলেন। ডয়চে ভেলে আরও বলছে, ব্লিঙ্কেনের এ সফরের দুটি উদ্দেশ্য আছে। এক, তেল বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও প্রভাব বজায় রাখা। দুই, মধ্যপ্রাচ্যে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব খর্ব করা। তাছাড়া তাদের আশা, সৌদি ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্কও এবার ভালো হবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নাম প্রকাশ না করে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমবিএস নামে পরিচিত সৌদি যুবরাজের সঙ্গে ব্লিঙ্কেন ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের বৈঠক করেন। আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানেন এমন সূত্র রয়টার্সকে জানায়, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিপরীতে নিজেদের বেসামরিক পারমাণবিক প্রকল্প চালু, এর বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ও এ সংক্রান্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পাওয়ার দাবি জানিয়েছে সৌদি আরব।
কিন্তু ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংক ফাউন্ডেশন অব ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের পরামর্শদাতা রিচার্ড গোল্ডবার্গ বলেছেন, ‘ব্লিঙ্কেনের এ সফরের মূল উদ্দেশ্য হলোÑ চীন ও সৌদি আরব যাতে খুব কাছাকাছি না আসে তা নিশ্চিত করা। তিনি সৌদি আরবকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন, চীন কেন সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চাইছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকলে সৌদি আরবের কী লাভ হবে।’
এ সফর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার এক বিবৃতিতে জানান, গতকাল বুধবার সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান ও ব্লিঙ্কেনের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। এ সময় মধ্যপ্রাচ্যসহ সব জায়গায় স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার প্রকাশ করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ব্লিঙ্কেন বলেন, ‘মানবাধিকারের উন্নতির ভিত্তিতে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে সম্পর্ক জোরালো হচ্ছে।’ তাছাড়া সুদান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের উদ্ধারে সহায়তা করায় সৌদি আরবকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন তিনি।।
