চট্টগ্রামে চাঞ্চল্যকর এক পুলিশ সার্জেন্টের অস্ত্র ও গাড়ি লুটের মামলার ধার্য তারিখে রায় ঘোষণা না করে পুনরায় যুক্তিতর্কে ফিরে যাওয়ার আদেশ দিয়েছেন জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. সেলিম মিয়া। এর আগে যুক্তিতর্ক শেষে ৬ জুন মামলাটির রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল।
বিষয়টি নিশ্চিত করে আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামির জবানবন্দিতে নেই এমন দুই “আসামির” নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্তিতে তদন্তকারী কর্মকর্তার ব্যাখ্যা না থাকা, অন্য আসামিদের অস্পষ্ট নাম-ঠিকানা ও তথ্যগত জটিলতা থাকায় মামলাটির রায় ঘোষণা না করে পুনরায় যুক্তিতর্কে ফিরে যাওয়ার আদেশ দিয়েছেন বিচারক।’
কাজী কামরুল ইসলাম নামের ওই পুলিশ সার্জেন্টকে মারধর করে তার অস্ত্র ও মোটরসাইকেল লুট করে নেওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিল ২৩ বছর আগে, ১৯৯৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নগরের আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠ এলাকায়। এ ঘটনায় তিনি ডবলমুরিং থানায় আটজনকে আসামি করে মামলা করেন।
এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন মো. সেলিম, জসিম উদ্দিন, জামাল ওরফে জুলু, মো. ইসমাঈল, দেলোয়ার হোসেন, শিমুল, জাহাঙ্গীর আলম, শহীদসহ অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচজন। আসামিদের প্রত্যেকের বয়স ছিল ২২ থেকে ২৭ বছর। মামলার এক সপ্তাহ পর ২০ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীর আলম নামে এক রিকশাচালককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এতে তিনি সার্জেন্টকে মারধর করে তার অস্ত্র ও গাড়ি লুটের ঘটনার সঙ্গে জড়িতসহ আটজনের নাম উল্লেখ করেন।
মামলাটি পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের পাঁচ কর্মকর্তা তদন্ত করেন। সর্বশেষ মামলাটি তদন্ত করেন মহানগর ডিবি পুলিশের তৎকালীন উপপরিদর্শক (বর্তমানে নোয়াখালী বিশেষ শাখার পরিদর্শক) মোস্তাফিজ ভূঁইয়া। তদন্তে এজাহারভুক্ত আট আসামি ছাড়াও আরও চারজনের সম্পৃক্ততা পান তিনি। ২০০২ সালের ২৮ এপ্রিল ১২ জনকে অভিযুক্ত করে তিনি আদালতে চার্জশিট দেন। তদন্তে পাওয়া বাকি চার আসামি হলেন রমিজ, তাওহীদ, ইকবাল ও তাহের।
আদালত সূত্র জানায়, বিচার চলাকালে মারা যান চার্জশিটভুক্ত আসামি আবু তাহের ও ইকবাল। বাকি ১০ আসামির মধ্যে জামাল ওরফে জুলু জামিনে থাকলেও ৯ আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে পলাতক আছেন।
আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চার্জশিটভুক্ত আসামি ইকবাল ও তাহেরের নাম রিকশাচালকের জবানবন্দিতে আসেনি। এই দুজন কীভাবে চার্জশিটভুক্ত আসামি হলেন, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি তদন্তকারী কর্মকর্তা মোস্তাফিজ ভূঁইয়া। যাদের চার্জশিটভুক্ত আসামি করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশরই নাম-ঠিকানা অসম্পূর্ণ। এ কারণে আদালত চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা না করে পুনরায় যুক্তিতর্কে ফিরে যাওয়ার আদেশ দিয়েছেন।’
জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নোয়াখালী জেলা বিশেষ শাখার পরিদর্শক মোস্তাফিজ ভূঁইয়া বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের পিপি এবং আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আমার আগে পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন। ইকবাল ও তাহেরের নাম মামলার ডকেটের কোথাও না কোথাও আছে। তবে এটা সত্য যে কিছু আসামির নাম-ঠিকানা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। সংশ্লিষ্ট আসামিদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য সব নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। সঠিকভাবে নাম-ঠিকানা না পাওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষের পিপিকে জানিয়েছিলাম।’
জানা গেছে, ২০০৩ সালে এ মামলায় ১২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত। ওই আদালতে চারজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ২০১৬ সালে মামলাটি স্থানান্তর হয় জননিরাপত্তা বিঘœকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে। চলতি বছরের মার্চ মাসে সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্রপক্ষে মোট সাক্ষ্য দিয়েছেন ১০ জন। রায়ের জন্য তারিখ ধার্য ছিল ৬ জুন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ট্রাফিক সার্জেন্ট কামরুল থাকতেন সিডিএ আবাসিক এলাকার ১৯ নম্বর রোডের, ৬০০ নম্বর বাসায়। ঘটনাটি ঘটেছিল চট্টগ্রাম নগরের সিডিএ আবাসিক এলাকার ২৯ নম্বর রোডে। মামলার এজাহারে বাদী ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্ট কাজী কামরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ১৯৯৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মোটরসাইকেলের লুকিং গ্লাস লাগাতে সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় নালাপাড়ার বাসা থেকে বের হন তিনি।
সেদিন ছিল হরতাল। গন্তব্য আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠের পশ্চিম পাশের একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজ। সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৭টায় মোটরসাইকেল নিয়ে তিনি পৌঁছান সিডিএ আবাসিকের ২৯ নম্বর রোডে। এ সময় আসামি সেলিমের নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত তার মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। হরতালে মোটরসাইকেল বের করা হয়েছে কেন বলে সেলিমসহ সাত-আটজন সার্জেন্ট কামরুলকে ঘিরে ধরেন।
এ সময় সার্জেন্ট কামরুল তাদের উদ্দেশে জানান যে তিনি সরকারি লোক। ডিউটি করতে বের হয়েছেন। এ জন্য কারও অনুমতির দরকার নেই। এ কথা বলতেই সেলিমের হেফাজতে থাকা রিভলভার বের করে সার্জেন্ট কামরুলকে বলেন ‘শালা, চুপ থাক।’ এ সময় পেছন থেকে কেউ একজন ভারী বস্তু দিয়ে সার্জেন্ট কামরুলের মাথায় আঘাত করেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মোটরসাইকেলসহ মাটিতে পড়ে যান।
এ সময় সার্জেন্ট কামরুলের কোমরে থাকা ১০ রাউন্ড গুলিসহ সরকারি নাইন এমএম পিস্তল ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। চলে যাওয়ার সময় কামরুলের সরকারি মোটরসাইকেলটিও লুট করে নিয়ে যায় তারা। আশপাশের লোকজনের সহায়তায় সার্জেন্ট কামরুল চিকিৎসা নিতে ভর্তি হন নগরের দামপাড়ায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ হাসপাতালে।
