দেশের বাজারে মার্কিন মুদ্রা ডলারের সংকট শুরু হয়েছিল গত বছরের প্রথম দিকেই। এই সংকটের প্রভাবে কার্ব মার্কেটে ডলারের বিনিময় হার ১২০ টাকা পর্যন্ত ছুঁয়েছে। কিন্তু আন্তঃব্যাংকে ডলারের দর সব সময়ই নিয়ন্ত্রিত ছিল। হঠাৎ করেই আন্তঃব্যাংকেও টাকার দরপতন শুরু হয়েছে। এতে গতকাল বৃহস্পতিবার ডলার কিনতে ব্যাংকগুলোকে ব্যয় করতে হয়েছে ১০৯ টাকা। দেশের ইতিহাসে ডলারের এই বিনিময় হার এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। এর আগে চলতি বছরের মে মাসে ১০৮ টাকা ৭৫ পয়সায় উঠেছিল।
দেশে চলমান তীব্র ডলার সংকট নিরসনে আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করছে সরকার। তবে জরুরি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার সরবরাহ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় ডলারের দাম বেড়েই চলছে।
এবার আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলারের দাম আবারও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি ডলার বিক্রি করা হচ্ছে ১০৯ টাকায়। সবশেষ গত বুধবার আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলার ১০৯ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এখন পর্যন্ত এটাই ডলারের সর্বোচ্চ রেট। এর আগে যা ১০৮ টাকা ৭৫ পয়সা ছিল। এক বছর আগে এ দাম ছিল ৯২ টাকা ৮০ পয়সা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করায় টান পড়ছে রিজার্ভেও। বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এর ফলে রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তঃব্যাংকে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় লেনদেন ব্যয়ও বাড়বে। ডলারের দাম বেশি হওয়ায় বাড়বে পণ্য আমদানি ব্যয়। স্বাভাবিকভাবেই পণ্য আমদানি ব্যয় বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে। গত ৩১ মে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ডলারের দাম বাড়িয়ে দেয় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে জড়িত ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা)।
ফলে এখন প্রবাসী বাংলাদেশিরা রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতি ডলারে দাম পাবেন ১০৮ টাকা ৫০ পয়সা। আর রপ্তানিকারকরা রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে ডলারপ্রতি দাম পাবেন ১০৭ টাকা। এতদিন প্রবাসী আয়ে ডলারের দাম ছিল ১০৮ টাকা এবং রপ্তানি আয়ে ছিল ১০৬ টাকা। নতুন এ সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার (১ জুন) থেকে কার্যকর করা হয়।
জানা যায়, করোনা মহামারীর ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এতে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যসহ তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। এ সময় করোনার লকডাউন তুলে নেওয়ায় বাংলাদেশে আমদানি বাড়তে থাকে। সে অনুযায়ী রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স না বাড়ায় দেশে বিদেশি মুদ্রার সংকট তৈরি হয়। এতে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করে। ওই সময় খোলা বাজারে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা দরেও ডলার বিক্রি হয়েছে। কিন্তু আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দাম কখনো ১০৮ টাকার ওপরে ওঠেনি। আমদানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিলাসী পণ্যের আমদানিতে ১০০ শতাংশ মার্জিন বসায়। পাশাপাশি আমদানির ক্ষেত্রেও দাম যাচাইসহ নানা কড়াকড়ি আরোপ করলে আমদানি ব্যয় কমতে থাকে। তবুও ডলার সংকটে আমদানি ব্যয় মেটাতে ব্যাংকগুলো হিমশিম খেলে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছর রেকর্ড ১৩ বিলিয়নেরও বেশি ডলার বিক্রি করেছে আর্থিক খাতের এই সংস্থাটি। যদিও এরপরও ডলার সংকট পুরোপুরি কাটেনি। ডলার সংকটের মধ্যেই গত এপ্রিল মাসে আগের মাসের তুলনায় রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে ভাটা পড়েছে। গত এপ্রিলে রেমিট্যান্স এসেছে ১৬৮ কোটি ডলার। আগের মাস মার্চে এসেছিল ২০২ কোটি ডলার। আগের মাসের তুলনায় এপ্রিলে রপ্তানি আয়ও কমেছে। এই মাসে রপ্তানি হয়েছে ৩৯৫ কোটি ডলারের পণ্য। আগের মাস মার্চে যার পরিমাণ ছিল ৪৬৪ কোটি ডলার।
এদিকে, ডলার সংকটের কারণে রপ্তানি আয় মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছে সরকার। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, চলতি বছর তেল আমদানির ৩০ কোটি ডলার পরিশোধে বাংলাদেশ গড়িমসি করায় বিদেশি তেল কোম্পানিগুলো বাংলাদেশকে তেল দেওয়া কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এটি হলে দেশের উৎপাদন খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি তেলের দাম বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
