জামালপুরের বকশীগঞ্জে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জেলা প্রতিনিধি গোলাম রাব্বানী নাদিমকে (৪২)। গত বুধবার রাত ১০টার দিকে বকশীগঞ্জ পৌর শহরের পাটহাটি এলাকায় মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয় তাকে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। স্বজনদের অভিযোগ, সংবাদ করাকে কেন্দ্র করে সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুর ইন্ধনে এ খুনের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় আরেক সাংবাদিক আল মুজাহিদ বাবু দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, হামলার সময় চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল আলম ঘটনাস্থলের পাশেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যদিও এ বিষয়ে মাহমুদুল আলমের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল রাতে সহকারী পুলিশ সুপার সুমন কান্তি দাস জানান, নাদিম হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে আটক করা হয়েছে। তারা হলেন গোলাম কিবরিয়া সুমন, মো. তোফাজ্জল, আয়নাল হক ও মো. কফিল উদ্দিন। যদিও বিকেলে বকশীগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ সোহেল রানা তিনজনকে আটক করার কথা জানিয়েছিলেন। তবে তারা কেউই আটক ব্যক্তিদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি। অভিযুক্ত চেয়ারম্যানকে আটকের ব্যাপারে ওসি মোহাম্মদ সোহেল রানাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, মূলত সিসিটিভি ক্যামেরা বিশ্লেষণ করে আমরা যাদের চিহ্নিত করছি, তাদের আটক করছি। আসলে এখনো কোনো অভিযোগও তো আমরা পাইনি। ঘটনাস্থলে যারা যারা ছিল তাদের যদি অভিযোগ পাই, তাহলে শতভাগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত গোলাম রাব্বানী নাদিম উপজেলার নিলাখিয়া ইউনিয়নের গোমের চর গ্রামের আবদুল করিমের ছেলে। বুধবার অফিসের কাজ শেষে রাত ১০টার দিকে সহকর্মী আল মুজাহিদ বাবুকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। পাথহাটি পৌঁছলে সামনে থেকে অতর্কিত আঘাত করে তাদের মোটরসাইকেল থেকে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর দেশীয় অস্ত্রধারী ১০-১২ দুর্বৃত্ত তাকে সড়ক থেকে মারধর করতে করতে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকার গলিতে নিয়ে যায় এবং তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। এ সময় সহকর্মী মুজাহিদ তাদের আটকাতে গেলে তাকেও মারধর করে দুর্বৃত্তরা।
পরে মুমূর্ষু অবস্থায় সহকর্মী আল মুজাহিদ ও স্থানীয়রা নাদিমকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য বুধবার রাত ১২টার দিকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় গতকাল সকালে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই মৃত্যু হয় তার।
নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম বলেন, সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবু অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তিনি এর আগেও নানাভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করেছেন। তার লোকজনই এ হামলা চালিয়েছে।
আল মুজাহিদ বাবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুর অপকর্ম নিয়ে নাদিমসহ আমরা কয়েকজন নিউজ করেছিলাম, তারপর থেকেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন আমাদের ওপর। পরে আমাদের নামে ডিজিটাল আইনে মামলাও করেন। সেই মামলা বুধবার ময়মনসিংহের সাইবার ট্রাইব্যুনাল খারিজ করে দিয়েছেন। এ নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল। এর দুই-তিন ঘণ্টা পর রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে নাদিমের ওপর হামলা হয়।
তিনি বলেন, চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ফেলে নাদিমকে মারতে মারতে পাশের একটি অন্ধকার গলিতে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়। ঘটনার সময় ওই গলিতে অন্ধকারে আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলেন চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবু। সে সময় তার ছেলে ফয়সাল, রিফাত, রেজাউল, মনির, সাইদসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। আমি বাধা দিতে গেলে আমাকেও মারধর করা হয়। এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
জামালপুরের পুলিশ সুপার নাছির উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, হামলাকারীদের সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশের পাঁচটি দল মাঠে কাজ করছে। ওই সাংবাদিকের স্বজনরা ব্যস্ত থাকায় এখনো থানায় মামলা হয়নি।
মানবাধিকার কমিশনের উদ্বেগ : জামালপুরে সাংবাদিক নাদিম হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। গতকাল সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিক নির্যাতন, এমনকি হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। নাদিম হত্যার ঘটনায় যেই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক সাজার দাবি জানান তিনি।
ফখরুলের নিন্দা ও উদ্বেগ : সাংবাদিক নাদিম হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘স্বৈরাচার সরকারের হাতে দেশের মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। তাদের হাত থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। রেহাই পাচ্ছেন না সাংবাদিকরাও। মানুষের জীবন এখন চরম নিরাপত্তাহীন।’
