পুতিন এরদোয়ান সম্পর্ক পশ্চিমাদের অভিমান

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৩, ১০:৪৭ পিএম

ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা জগতের কাছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এখন আর্থ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে রীতিমতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরে পরিণত হয়েছেন। তার বিভিন্ন পদক্ষেপ কিংবা কর্মকাণ্ডের প্রতি আস্থা না রাখা যেমন বিপদের, তেমনি তাকে সম্পূর্ণ মুক্তহস্ত করে ছেড়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত সামলানো যাবে কি না, সেটা নিয়ে তাদের মধ্যে বিভিন্ন দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি তুরস্কের জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে টানা তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি এবার দেশটির প্রায় শতকরা ৫৯ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাকে ঘিরে ক্রমেই বাড়ছে আরব দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা। তুরস্ক এবং প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ব্যাপারে আরব দেশের সরকার ও জনগণের এই বিপরীত অবস্থান উন্মোচিত হয়েছে অতি সম্প্রতি প্রকাশিত আরব জনমতের ওপর একটি ব্যাপক-ভিত্তিক জরিপের ফলাফলে। জানা গেছে, জরিপের ৫৮ শতাংশই মনে করেন, অন্য যেকোনো দেশের নীতির তুলনায় তুরস্কের মধ্যপ্রাচ্য নীতি আরব স্বার্থের পক্ষে। ফিলিস্তিন ইস্যু তো বটেই, এমনকি সিরিয়া এবং লিবিয়ায় তুরস্কের বিতর্কিত সামরিক হস্তক্ষেপও সিংহভাগ আরব জনগণ সমর্থন করছে। এশিয়া ও আফ্রিকায় আরব বিশ্বের ১৩টি আরব রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সাধারণ আরব জনগণের মনোভাব জানতে এই জরিপটি করেছে দোহা এবং বৈরুত-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজ’। গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারেস্টের প্রধান এবং মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির বিশ্লেষক সামি হামদি মনে করেন, তুরস্ক রাষ্ট্রের চেয়ে ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যে সাধারণ আরব জনগণের বিরাট একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছেন, তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তিনি বলেন, সন্দেহ নেই তুরস্কের গ্রহণযোগ্যতা, বিশেষ করে সাধারণ প্রান্তিক আরব জনগোষ্ঠীর কাছে, বাড়ছে এবং গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার পেছনে তুরস্ক রাষ্ট্রের চেয়ে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ভাবমূর্তি প্রধান ভূমিকা রাখছে। এর মধ্য দিয়ে তুরস্কের বৈশ্বিক কৌশলগত তাৎপর্য কী, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তবে এই বিশ্বনেতাদের বাইরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন হচ্ছেন আলাদা। তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে উজ্জীবিত করতে এতটাই আগ্রহী ছিলেন যে, ভোটের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই এরদোয়ানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তুরস্কের যে নীতি রাশিয়ার বিশেষভাবে পছন্দ, তা হচ্ছে ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর ক্রেমলিনকে একঘরে করে দিতে এরদোয়ানের অস্বীকৃতি। এমনকি ন্যাটোতে তুরস্কের মিত্ররা রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পরও এরদোয়ান সেই পথ ধরেননি। দেখা যাচ্ছে, ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর পাঠানো বার্তাও বেশ উষ্ণ ছিল। ক্রেমলিনের প্রতি এরদোয়ানের সহানুভূতিশীল হওয়া এবং ক্ষমতার দুই দশকে ঘরের ভেতরে বাক্স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মনোভাব টেনে ধরার বিষয়টি পশ্চিমা এই নেতাদের অপছন্দ হলেও দিন শেষে তুরস্ক তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। এরদোয়ান হচ্ছেন এমন এক নেতা, যিনি একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন, আবার ইউক্রেনেও সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকেন। তিনি দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা ঘটিয়ে গম সরবরাহব্যবস্থা সচল করে সুনাম কুড়িয়েছেন, যে গমের ওপর বিশ্বের বড় একটি অংশ নির্ভরশীল।

পশ্চিমারা মনে করে, তুরস্কে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে এরদোয়ানকে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। সে কারণে সুইডেনের ন্যাটোতে যোগদানের ব্যাপারে তুরস্কের নমনীয় হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে পশ্চিমারা। একমাত্র তুরস্ক আর হাঙ্গেরির কারণেই বিষয়টি আটকে আছে। এদিকে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ব্যাপারে এরদোয়ানের কাছ থেকে আশ্বাস পেতে আগ্রহী। ২০১৫ সালে সৃষ্ট হওয়া এ সমস্যার ফলে ১০ লাখের বেশি শরণার্থী ও অভিবাসী মানবপাচারকারীদের সহায়তায় অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইইউ দেশগুলোতে ঢুকে পড়েন। মূলত বেশির ভাগই সিরীয় নাগরিক। এ নিয়ে ব্রাসেলস তুরস্কের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। সেই চুক্তি অনুসারে, তুরস্ক অর্থ সহায়তা পাবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে তুর্কি জনগণ ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগ পাবে, তার বিনিময়ে এসব অবৈধ শরণার্থী ও অভিবাসীকে আটকাতে হবে। এ ব্যাপারে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্রাসেলস আশা করে। কিন্তু এরদোয়ান তার সমালোচক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জেলে পাঠালে ইইউ তাতে আপত্তি প্রকাশ করে। ফলে সেই চুক্তি পুরোপুরি কাজে আসেনি। 

পশ্চিমারা তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্বকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সেতু হিসেবে বর্ণনা করত। কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন তুরস্কের সেই মর্যাদা পাল্টে দিয়েছে। ক্ষমতার তৃতীয় মেয়াদে পদার্পণ করার মধ্য দিয়ে এরদোয়ানের কাছ থেকে পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের চমক আশা করছেন অনেকেই।

সম্প্রতি তুরস্কের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হলেও সার্বিকভাবে এরদোয়ানের আমলে বেকারত্ব কমেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে তুর্কি বংশোদ্ভূত প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এরদোয়ানের আমলে শিক্ষার হার বেড়েছে। বেড়েছে মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও। এ ছাড়া সম্প্রতি কৃষ্ণসাগরে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। গ্যাসের সব ধরনের এক মাসের বিল মওকুফ করা হয়েছে ।

প্রশ্ন হচ্ছে, সামনের দিনগুলো কেমন যাবে? তুরস্কবাসীকে মুক্ত শ্বাস নেওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন দরকার, কেননা তুর্কি সমাজে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বদ্ধাবস্থায় পড়ে ধুঁকছে। এরদোয়ান অঙ্গীকার করেছিলেন, নতুন তুরস্ক প্রতিষ্ঠার শততম বর্ষে, অর্থাৎ ২০২৩ সালের মধ্যে তিনি তুরস্ককে পাল্টে দেবেন। সবার আশা ছিল, তুরস্ক ২০২৩ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর ১০টির মধ্যে একটি থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশটি এখন সবচেয়ে ধনী দেশের ২০টির মধ্যে ১৯ নম্বরে রয়েছে। গত তিন বছরে তুরস্কের অর্থনীতি ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। লিরা ডলারের বিপরীতে মূল্য হারাচ্ছে। এ অবস্থায় এরদোয়ান তুরস্কের অর্থনীতির গতি ফেরাতে পারবেন কি না এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট কতটা শক্তিশালী করতে পারেন এটাই দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত