বাংলা সাহিত্যে সেলিনা হোসেন এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। প্রায় ষাট বছরের সাহিত্যিক জীবনে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের জন্ম ও সামাজিক বিষয় নিয়ে যেমন লিখেছেন অগণিত আখ্যান, তেমনি শিশুদের জন্যও লিখেছেন দুহাতে। তার লেখা হাঙর নদী গ্রেনেড উপন্যাস তার জীবদ্দশায়ই পেয়েছে চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা। দেশ-বিদেশের কুড়িটিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়েছে তার সাহিত্যকর্ম। লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক ও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার। বাংলা একাডেমির প্রথম নারী সভাপতি হিসেবে গড়েছেন নতুন ইতিহাস। ১৪ জুন ছিল তার জন্মদিন। সাতাত্তরতম জন্মদিনের ঠিক আগে খ্যাতিমান এই কথাসাহিত্যিক মুখোমুখি হয়েছিলেন মিঠাইয়ের। সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ মিঠাইবন্ধুদের জন্য প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনাম-উজ-জামান বিপুল
মিঠাই : অগ্রিম জন্মদিনের শুভেচ্ছা!
সেলিনা হোসেন : ধন্যবাদ!
মিঠাই : আপনার শৈশবের গল্পটা জানতে চাই।
সেলিনা হোসেন : আমার শৈশব কেটেছে বগুড়ায়। ১৯৪৭ সালের পরে আমার বাবা চাকরিসূত্রে বগুড়ায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে করতোয়া নদীর পাড়ে একটি গ্রামে ছিল তার অফিস, সেখানেই আবাস। সেখানে আমি আমার শৈশব কাটিয়েছি। খুব সুন্দর ছিল সেই শৈশব।
মিঠাই : গ্রামের অবাধ স্বাধীনতার দুরন্ত শৈশব?
সেলিনা হোসেন : ঠিক তাই। আব্বার অফিসের কর্মচারী যারা ছিলেন তাদের ছেলেমেয়েরা মিলে আট-দশজনের একটা দল ছিল আমাদের। আমরা সবাই মিলে নদীর পাড়ে দৌড়ে, খেলা করে, পেয়ারা গাছে লাফিয়ে ওঠে, লাফ দিয়ে নেমে খুব আনন্দের মধ্যে আমরা শৈশব কাটিয়েছি।
মিঠাই : দারুণ একটা শৈশব আপনি পেয়েছেন। আপনার স্কুল জীবনের স্মৃতি জানতে চাই।
সেলিনা হোসেন : আমি লতিফপুর প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার বাবার অফিসের কর্মচারীর ছেলেমেয়েরা সবাই একই প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। একটা বিষয় আমার গভীরভাবে মনে আছে, যেটা আমার একটা বড় ধরনের শিক্ষা। আমরা স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে যে জাতীয় সংগীত গাইতাম সেটা ছিল উর্দুতে। পাক সার জমিন সাদ বাদ। ওটা গাওয়ার পরে আমাদের হেডমাস্টার যিনি ছিলেন তিনি আমাদের দুটি লাইন বলতেন, ‘পাখিসব করে রব রাতি পোহাইলো, কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিলো।’ তিনি বলতেন, তোমরা কুসুমকলি হয়ে ফুটবে, অসাধারণ মানুষ হয়ে উঠবে। তোমাদের মানুষ হিসেবে বড় হবে। মানুষকে সাহায্য করবে, মানুষকে ভালোবাসবে। শিক্ষকের এই কথা আমি ভাবতাম। শিক্ষকের এই কথা মাথায় ছিল বলেই আমি পরে প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে আমাদের শিক্ষকদের খুঁজে পেয়েছি। তাদের থেকে অনেক কিছু শিখেছি।
মিঠাই : বিশেষ কোনো ঘটনা আছে?
সেলিনা হোসেন : হ্যাঁ। শৈশবে তো খুব প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়াতাম। করতোয়া নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়াতাম। একজন মাঝি ছিল, বারুয়া মাঝি। আমরা তাকে গিয়ে বলতাম, কাকু আমাদের একটু নদীর ওই পারে নিয়ে যান না! আমরা নদীর ওই পার দেখব। আমরা পেয়ারা গাছে উঠব। পেয়ারা পাড়ব। উনি আমাদের দশ-বারোজন বাচ্চাকে ওপারে নিয়ে যেতেন আবার এপারে পৌঁছে দিতেন। আমাদের নদীর ওপার দেখা হতো এভাবে। তো একদিন সে আমাদের পার করছিল তখন কয়েকজন বড় মানুষ আগে পার হতে চাইল। বারুয়া মাঝি বলল, ওদের আগে পার করে দিই। তারা তাকে খুব বকল এবং বলল, ওরা তোকে পয়সা দিতে পারবে? আমরা পয়সা দেব আমাদের আগে পার করে দে! বারুয়া মাঝি বলল, আমি তো ওদের কাছে পয়সা চাইনে। ওরা ওদের দেশটাকে ভালো দেখবে। প্রকৃতিকে দেখবে। তবেই না এরা বড় (মানুষ) হবে। সেদিনের এই কথা আমার মনে দাগ কেটেছিল। এই লোককে আমি মনে করি শিক্ষক। এই যে শিশুদের জন্য চিন্তা করা, তাদের বড় মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করা, দেশকে দেখতে বুঝতে উদ্বুদ্ধ করাÑ এগুলোর জন্যই বারুয়া মাঝিকে আমার শিক্ষক বলে মনে হয়।
মিঠাই : বাহ! দারুণ তো!
সেলিনা হোসেন : আরেকটা ঘটনা আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। এটার সঙ্গেও বারুয়া মাঝি যুক্ত। একদিন একটা ঘটনা ঘটেছিল। নদীটা তো উঁচু থেকে ক্রমে ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে। নিচের দিকে মাঝিরা এবং আরও অনেকে বাঁশের তৈরি বাড়িতে থাকত। একদিন সেই বাড়িগুলোতে আগুন লেগে গেল। আমরা যখন শুনলাম তখন সবাই দৌড়ে গেলাম কী হয়েছে দেখতে। দেখি আগুন জ¦লছে দাউ দাউ করে। এর মধ্যে বারুয়া মাঝির বউ দেখি জ্বলন্ত আগুনের মধ্য থেকে একটা চালের বস্তা টেনে আনছে। পরে সে বলল, এই চাল দিয়ে ভাত রান্না হলে সবাই খেতে পাবে। শুধু যে আমি, আমার স্বামী, ছেলেমেয়েরা খাই তা তো না। অনেক অনাহারি, খেতে পায় না তারা আসে, আমার যতটুকু সাধ্য সেখান থেকে আমি তাদের সাহায্য করি। কিন্তু এই চাল যদি আগুনে পুড়ে যায় তাহলে তাদের কী হবে? এই যে ভয়াবহ আগুনের মধ্যেও অন্যদের কথা ভাবা, তাদের জন্য কিছু করতে চাওয়া এবং এর জন্য জীবন বিপন্ন করা এটা আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছিল। এ ঘটনা আমি সারা জীবনেও ভুলব না। আমি এখনো চোখ বুঝলেই সেই দৃশ্য দেখতে পাই। সেই যে শিক্ষক বলেছিলেন, মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করো। এই তো সেটা। এর থেকে বড় আর কী হতে পারে। এটা মানুষের কাছ থেকে শেখা একটা বড় জায়গা ছিল। সবসময় বই পড়েই যে শিখতে হবে তা না। পরিবেশ থেকে, মানুষের কাছ থেকেও শেখার অনেক কিছু আছে। যারা ভাত খেতে পায় না তাদের জন্য এই চালের বস্তাটা প্রয়োজন হবে, এই ভাবনাটা তো একটা গভীর ভাবনা।
মিঠাই : আপনার লেখালেখির শুরুর গল্পটা আমাদের বলেন?
সেলিনা হোসেন : ১৯৬৪ সালে আমি যখন মহিলা কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি তখন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার রাজশাহী বিভাগের অধীনে যত কলেজ আছে সব কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। আমার শিক্ষক বললেন, এ রকম একটা প্রতিযোগিতা হবে, সাতটি আইটেম হবে তুমি সবগুলোতে অংশ নেবে। আমি বললাম, স্যার, আমি তো গল্প লিখতে জানি না। স্যার দিলেন বকা। বললেন, আমি তো তোমাকে ফার্স্ট সেকেন্ড হতে বলছি না। অংশ নেবে। তারপর যা হওয়ার তাই হবে। তারপর অনেক ভেবেচিন্তে একটা গল্প লিখলাম, জমা দিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি কলেজের শিক্ষক তারা ছিলেন বিচারক। দেখা গেল আমি ফার্স্ট হয়েছি। শুধু তাই না। সাতটি বিষয়ের মধ্যে আমি ছয়টিতে প্রথম হয়েছিলাম। একটিতে তৃতীয় হয়েছিলাম। এভাবে লেখালেখির শুরু হলো।
মিঠাই : শিশুদের জন্য লেখার সময় কোন বিষয় মাথায় রাখা উচিত বলে মনে করেন?
সেলিনা হোসেন : শিশুদের চিন্তা, শিশুদের বিকাশ, এদের খেলাধুলা, এরা কী ভাবে, কীভাবে বড় হতে চায়, কীভাবে স্বপ্ন দেখেÑ এসব কিছু মাথায় রাখা উচিত বলে আমার মনে হয়। আমার অবশ্য এগুলো ভেতর থেকে আসত। তা ছাড়া শৈশবের স্মৃতিগুলো শিশুদের মনকে অনুভব করতে সাহায্য করত।
মিঠাই : শিশুদের জন্য আপনার লেখা বইগুলোর বিষয় নানা রকমের। বর্ণমালা নিয়ে গল্প আছে, একটা বই আছে ফুলকলি প্রধানমন্ত্রী হতে চায়। এই বইগুলোর বিষয় কীভাবে পেলেন? বাস্তবে কি কোনো ফুলকলির সঙ্গে আপনার কখনো দেখা হয়েছিল?
সেলিনা হোসেন : শিশুরা নিজেদের সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে পারে, সচেতনতা কীভাবে আসতে পারে সেগুলো এই বইটাতে এসেছে। আমি একবার কুয়াকাটা গেলাম, সেখানে একটা মেয়েকে পেয়েছিলাম। কত বয়স হবে দশ-এগারো বছর। কিন্তু ওর সাহসিকতা সচেতনতা খুব ভালো লেগেছিল। তাই বলেছিলাম এসব ভাবনা নিয়ে চিন্তা নিয়ে বড় হলে ফুলকলি একদিন প্রধানমন্ত্রী হবে। এভাবেই হলো ফুলকলি একদিন প্রধানমন্ত্রী হবে।
মিঠাই : আপনার প্রিয় লেখক কে?
সেলিনা হোসেন : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম।
মিঠাই : শিশুদের জন্য আপনার লেখা বইগুলোর মধ্যে প্রিয় কোনটি?
সেলিনা হোসেন : সবগুলোই। কোন সন্তানকে রেখে কোন সন্তানকে প্রিয় বলব!
মিঠাই : অবসর কাটে কীভাবে?
সেলিনা হোসেন : লেখালেখি করে।
মিঠাই : মিঠাই বন্ধুরা যারা লেখক হতে চায় তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
সেলিনা হোসেন : তারা চারপাশের জগৎকে গভীরভাবে দেখবে, মানুষকে গভীরভাবে দেখবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে কোথাও গেলে সেখানকার মানুষ ও প্রকৃতিকে দেখবে। কীভাবে মানুষ বেঁচে আছে, কীভাবে নদীটা বয়ে যাচ্ছে, কীভাবে জেলে মাছ ধরছে, কীভাবে কৃষক ফসল ফলাচ্ছে সবকিছু গভীরভাবে দেখা তাদের দায়িত্ব।
ছবি : আবুল কালাম আজাদ
