বাসায় সংবাদ সম্মেলন

১৩ বছরেও নিবন্ধন নবায়নের সময় পাননি ডা. সংযুক্তা

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৩, ০২:১৫ এএম

রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে গত ১৩ বছরেও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন নবায়নের সময় পাননি ডা. সংযুক্তা সাহা। এই দীর্ঘ সময় তিনি নিবন্ধন ছাড়াই চিকিৎসা করেছেন। তবে রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালের এই চিকিৎসক মনে করেন, তার আগেই নবায়ন করা উচিত ছিল, কিন্তু তিনি সময় পাননি।

গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর পরীবাগ এলাকায় নিজের বাসায় সংবাদ সম্মেলনে ডা. সংযুক্তা সাহা এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি সেন্ট্রাল হাসপাতালে মাহবুবা রহমান আঁখি ও তার নবজাতকের চিকিৎসা ও মৃত্যুর বিষয়ে পুনরায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এর আগে গত ২০ জুন প্রথম দফার সংবাদ সম্মেলনেও তিনি মা ও নবজাতকের মৃত্যুর বিষয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং মৃত্যু ও ভুল চিকিৎসার জন্য হাসপাতালকে দায়ী করেন।

এর আগে গত শুক্রবার বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে জানানো হয়, ২০১০ সালের পর ডা. সংযুক্তা সাহা তার নিবন্ধন নবায়ন করেননি। নবায়নের জন্য সম্প্রতি দুই-একদিনের মধ্যে আবেদন করেছেন। তবে সে আবেদন স্থগিত করে রেখেছে বিএমডিসি।

গত ১৩ বছর যাবৎ নিবন্ধন নবায়নের সময় না পাওয়ার কারণ হিসেবে ডা. সংযুক্তা সাহা জানান, তার বিএমডিসির নিবন্ধন নেই, কথাটা ঠিক না। নিবন্ধন আছে, কিন্তু নবায়ন করা হয়নি। নিবন্ধনের সময় পাননি। নিবন্ধনের জন্য একটা ফি দিতে হয় ও গত বছর থেকে সেটা অনলাইন পদ্ধতি করেছে, সেটাও জানতেন না এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘আমি তো আমার বাসায় আসারই সময় পাই না, নিবন্ধনেরও সময় পাইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যখন পর্যন্ত আমি মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে বিভাগীয় প্রধান ছিলাম, তখন ওরাই (কলেজ কর্র্তৃপক্ষ) সব কিছু করে দিত। ২০১০ পর্যন্ত সবার (চিকিৎসকদের) যে কাগজপত্র সেটা ওরাই (কলেজ কর্র্তৃপক্ষ) রিনিউ করিয়ে নিয়ে আসত। আমাদের কিছুই করতে হতো না। তবে নবায়নটা অবশ্যই করা উচিত ছিল, আমি খেয়াল করিনি।’

নিজের ব্যস্ততা তুলে ধরে এই চিকিৎসক বলেন, ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিসের চাপ সামলাতে গিয়ে আমি ২০২০ সালেই যেখানে বিভাগীয় প্রধান ছিলাম, সেখান থেকে অব্যাহতি নিই। কারণ চাপের কারণে মেডিকেল কলেজকে সময় দিতে পারছিলাম না।’

তার বিরুদ্ধে রোগীদের কম সময় দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে ডা. সংযুক্তা সাহা বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে কেউ বলতে পারবে না যে, রোগী দেখাতে কোনো ভুল হয়েছে, ভুলভাবে চিকিৎসা হয়েছে। আমার নামে বিএমডিসিতে কোনো অভিযোগ নেই।’

এই চিকিৎসক বলেন, ‘সবারই একটা প্রশ্ন, তাহলে কেন এত ভিড় হয় আমার চেম্বারে? কারণ দিন শেষে সবাই জানে, এখানেই সঠিক চিকিৎসাটা পাবে।’

রোগীদের অনুমতি ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে নিজের প্রচার-প্রচারণার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো রোগীকে অনুমতি ছাড়া ফেসবুক লাইভে আনিনি, তারা স্বপ্রণোদিত হয়েই এসেছেন।’

তার ফেসবুক পেইজটি মনিটাইজ করা নয় এবং এটাকে কখনো বুস্ট বা প্রমোটও করেননি বলে জানান এই চিকিৎসক। তিনি আরও জানান, তিনি ফেসবুক ব্যবহার করতেন নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসবের তথ্য প্রচার করতে। আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসব হলেও পরে যে নরমাল ডেলিভারি করা যায়, সেই তথ্যটা মানুষকে তিনি দিতে চান।

ফেসবুক লাইভ করা অনৈতিক হলে তা আর করবেন না বলে জানান এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চিকিৎসকদের এ ধরনের প্রচার চালানো যায় না, সেটা আমার জানা নেই। যদি সরকার মনে করে যে এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে, এটা অন্যায় করা হচ্ছে, তাহলে এটা নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে। এতদিন এটা নিয়ে আমাকে কেউ নোটিস করেনি, এখন করা হলো, এখন হয়তো আর হবে না।’

তাকে পাঠানো হাসপাতালের আইনি নোটিসের বিষয়ে ডা. সংযুক্তা সাহা বলেন, এ ব্যাপারে আমি ইতিমধ্যে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিয়েছি। ব্যাপারটা তো আইনিভাবে হবে। সেদিনের বক্তব্য প্রত্যাহার করব কি না, সেটা আমার আইনজীবী বলবেন।’

প্রসব ব্যথা উঠলে গত ৯ জুন মধ্যরাতে কুমিল্লা থেকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে আঁখিকে নিয়ে আসে তার পরিবার। ভর্তির সময় ডা. সংযুক্তা হাসপাতালেই আছেন বলা হলেও আসলে তিনি ছিলেন না। সেই রাতে ওই চিকিৎসকের সহকারীরা প্রথমে স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা প্রসবের চেষ্টা করেন। সে সময় জটিলতা তৈরি হলে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুটি ওই রাতেই মারা যায়। এরপর ১৮ জুন মারা যান মা।

এ ঘটনায় গত ১৪ জুন বুধবার ধানমন্ডি থানায় মামলা করেন আঁখির স্বামী ইয়াকুব আলী সুমন। মামলায় সেন্ট্রাল হাসপাতালের ডা. শাহজাদী, ডা. মুনা, ডা. মিলি, সহকারী জমির, এহসান ও হাসপাতালের ম্যানেজার পারভেজকে আসামি করা হয়। পরে সে রাতেই ডা. শাহজাদী ও ডা. মুনাকে হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন।

এ ঘটনায় হাসপাতালের সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ডা. সংযুক্তা সাহা ওই হাসপাতালে আপাতত কোনো বিশেষজ্ঞ সেবা দিতে পারবেন না বলেও জানায় অধিদপ্তর।

পরে ১৯ জুন সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘটনার জন্য ডা. সংযুক্তা সাহাকে দায়ী করে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এর পরদিন ২০ জুন রাজধানীর পরীবাগের বাসায় পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘটনায় হাসপাতালকে দায়ী করেন এই চিকিৎসক। পরে ওই সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যকে মিথ্যা উল্লেখ করে গত বুধবার এই চিকিৎসককে আইনি নোটিস পাঠায় হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত