বৃদ্ধাশ্রমে চোখের জলে বাবা-মায়ের নিঃসঙ্গ ঈদ

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৩, ০৪:১৪ পিএম

জবেদ আলী। বয়স ১০৩ বছর। মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রমে ঈদের দিন কাটছে তার। এক সময় চাকরি করতেন। দুই ছেলে এক মেয়ে। পরিবার নিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কেটেছে তার। সন্তানের বড় করে বিয়ে দিয়েছেন। স্ত্রীর নামে সামান্য জমি ছিল, সেটি দুই ছেলেকে লিখে দেন। এর মাঝে জবেদ আলীর চেহারায় বসয়ের ভাঁজ পড়েছে। ছেলেরা আলাদা হয়ে যায়। শুরু হয় কঠিন জীবনের অধ্যায়। ছেলের অবহেলা আর ছেলের বউদের অত্যাচারে বাড়ি থেকে বের হতে হয় তাকে। স্ত্রী নিয়ে ভবঘুরে জবেদ আলীর ঠাঁই হয় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রমে। কিছুদিন পর স্ত্রীও তাকে রেখে পরপারে চলে যান। নিঃসঙ্গ হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের আড়ালে মুখ লুকিয়ে নীরবে ফেলেন চোখের পানি।

আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জুন) ঈদের দিন সকালে কথা হয় ছোট সোহাগী গ্রামে স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচালিত মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রমের জবেদ আলীর সঙ্গে। স্মৃতিচারণ করে তিনি এসব কথা বলেন। বাড়ি একই উপজেলার কালিডোবা গ্রামে। ছেলে ও বউরা বাড়ি থেকে বের করে দেয়। পরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিভিন্ন জায়গায় থাকেন। অজ্ঞাত ব্যক্তির মাধ্যমে মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রমে আসেন। প্রায় ছয় বছর থেকে এখানেই থাকেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জবেদ আলী বলেন, বেশ ভালোই আছি, সন্তানদের ছাড়া ঈদ, এ কষ্ট সে ছাড়া, কেউ অনুভব করতে পারবে না। এমন সন্তান যেন, আর কারও না হয়। এটুকুই চাওয়া।

গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে ছোট সোহাগী গ্রাম। গ্রামটি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুরবাড়ি ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত।

২০১৭ সালে স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে উঠে মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রম। বিভিন্ন মানুষের অনুদানে চলে এটি। বর্তমানে এখানে বাবা-মা আছেন ৪২ জন। এর মধ্যে বৃদ্ধা মা রয়েছেন ২৬ জন আর বৃদ্ধ বাবা আছেন ১৬ জন। অনেকেই রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা হয়েছে এখানে। তাদের সবারই ঈদ কাটছে পরিবারহীন।

ঈদের এ আনন্দের দিনে বৃদ্ধ বয়সে প্রিয় সন্তানের জন্য মুখ লুকিয়ে নীরবে ফেলছেন চোখের পানি। অতীতে সুখের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে জীবন যাপন করছেন অসহায় মা-বাবা। জীবনের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়েছেন সন্তানদের জন্য। আজ শেষ বয়সে, সেই সন্তানই নেই পাশে। তারা বৃদ্ধাশ্রমে যত্নে থাকলেও ভালো নেই বাবা-মা। সন্তানের জন্য প্রতি মুহূর্তে হৃদয় কাঁদে তাদের।

বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন মেহেরুননেছা। বয়স প্রায় এক শ। স্বামী মারা যাওয়ার পর বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে দুই ছেলে। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। কেউ মায়ের খোঁজ রাখেন না। কয়েক দিন রাস্তায় পড়ে ছিলেন। এরপর ঠাঁই হয় এ বৃদ্ধাশ্রমে। ছেলে-মেয়ে থেকেও তিনি যেন নিঃসন্তান। অন্যজন ভরশী মাহমুদ (১০৮) একই উপজেলার চক বিরাহীমপুর গ্রামে বাড়ি। এক ছেলে, বৃদ্ধা বাবার রাখেন না কোনো খোঁজ। এখানে প্রায় ৪ বছর থেকে আছেন।

তিনি বলেন, এখানে থাকা-খাওয়ার সমস্যা নেই। ঈদের দিনে ভালো পোশাক আর খাবার দেওয়া হয়েছে। কোরবানিও করা হয়েছে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আপেল মাহমুদ বলেন, এটি একটি স্বেচ্ছাশ্রম প্রতিষ্ঠান। এখানে যারা আছেন, তারা সবাই বৃদ্ধ মা-বাবা। আমরা তাদের মা-বাবার মতো আচরণ করি। অনেকই অসুস্থ আছেন। সময় মতো তাদের গোসল করাতে হয়। মাঝেমধ্যে অনেকেই খাইয়ে দিতে হয়। প্রতিষ্ঠানের সদস্য ও অন্যদের অনুদানে চলে এটি।

মানুষের দেওয়া অনুদানে হয় বৃদ্ধ মা-বাবার ঈদের দিনের নতুন পোশাক ও খাবার। তাই সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত